মুম্বই: ভোট পাঁচটি আসনে। কিন্তু সেই নির্বাচন ঘিরেই মহারাষ্ট্রের শাসক জোট মহাযুতির অন্দরে বাড়ছে অশান্তি। আসন ভাগাভাগি নিয়ে অসন্তোষ, প্রার্থী বাছাইয়ে মতবিরোধ এবং জোটেরই সরকারি প্রার্থীর বিরুদ্ধে শরিক দলের নেতাদের অবস্থান—সব মিলিয়ে বিধান পরিষদের ভোটের আগে অস্বস্তিতে বিজেপি, একনাথ শিন্ডের শিবসেনা এবং অজিত পওয়ারের এনসিপি। কোথাও বিজেপির প্রার্থীর বদলে নির্দলকে সমর্থন করছে শিবসেনা, কোথাও আবার জোটের প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিরোধী শিবিরের প্রার্থীর পাশে দাঁড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শিন্ডেকে নিজের দলের নেতাদের নিয়ন্ত্রণে রাখার বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীস।
মহারাষ্ট্র বিধান পরিষদের পাঁচটি আসনে দ্বিবার্ষিক নির্বাচন ঘিরেই এই সংঘাত। তিনটি স্নাতক কেন্দ্র—ছত্রপতি সম্ভাজিনগর, পুণে ও নাগপুর। বাকি দু’টি শিক্ষক কেন্দ্র—অমরাবতী ও পুণে। আসন সমঝোতার সূত্র অনুযায়ী, পাঁচটির মধ্যে তিনটি আসনে বিজেপি, একটি আসনে শিন্ডের শিবসেনা এবং একটি আসনে অজিত পওয়ারের এনসিপির প্রার্থী দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রার্থী বাছাইয়ের পর থেকেই শরিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। পুণে শিক্ষক কেন্দ্র ও ছত্রপতি সম্ভাজিনগরের স্নাতক কেন্দ্রকে ঘিরে সেই বিরোধ এখন প্রকাশ্যে।
পুণে শিক্ষক কেন্দ্রের জন্য বিজেপি প্রার্থী করেছে কৌস্তুভ গাওয়াড়েকে। কিন্তু ওই আসনে প্রথমে নিজেদের প্রার্থী মঙ্গেশ চিভটের নাম ঘোষণা করেছিল শিন্ডের শিবসেনা। শিবসেনার দাবি, আসন সমঝোতায় তাদের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। পরে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর্বে চিভটের বদলে নির্দল প্রার্থী সচিন সানাপকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নেয় শিবসেনা। ফলে একই জোটের দুই শরিকের অবস্থান কার্যত মুখোমুখি। বিজেপির সরকারি প্রার্থীর বিরুদ্ধে শিবসেনার এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করেই জোটের অন্দরে ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
ছত্রপতি সম্ভাজিনগরের স্নাতক কেন্দ্রেও একই রকম টানাপড়েন। সেখানে মহাযুতির প্রার্থী অজিত পওয়ারের এনসিপির সতীশ চহ্বাণ। কিন্তু শিন্ডের শিবসেনার বিধায়ক তথা প্রাক্তন মন্ত্রী আবদুল সাত্তার বিরোধী মহাবিকাশ আঘাড়ির প্রার্থী প্রতাপসিংহ পাটিলকে সমর্থন করছেন বলে খবর। অর্থাৎ, জোটের এক শরিকের প্রার্থীর বদলে অন্য জোটের বিরোধী প্রার্থীর পাশে দাঁড়ানোর অভিযোগ উঠেছে শিবসেনার নেতার বিরুদ্ধে। এই ঘটনা মহাযুতির নেতৃত্বের কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে।
অমরাবতী শিক্ষক কেন্দ্রেও বিদ্রোহের আঁচ। সেখানে শিবসেনা বর্তমান বিধান পরিষদ সদস্য কিরণ সারনায়ককে প্রার্থী করেছে। কিন্তু তাঁর প্রার্থিতা নিয়ে বিজেপির একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। বিজেপির কয়েক জন নেতা নির্দল হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু করেন। তাঁদের মধ্যে সঙ্গীতা শিন্দে-বোন্দে, চন্দ্রশেখর ভুয়র ও সুমিত পাওয়ারের নাম উঠে এসেছে। দলবিরোধী কাজের অভিযোগে বিজেপি তাঁদের বহিষ্কার করেছে। অন্য দিকে, শিবসেনার প্রাক্তন বিধান পরিষদ সদস্য শ্রীকান্ত দেশপাণ্ডের প্রার্থিতা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তিনি শিবসেনার প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্দল হিসেবে লড়ছেন। ফলে শুধু শরিকদের মধ্যে নয়, দলের অভ্যন্তরেও বিদ্রোহ সামলানো কঠিন হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যেই অসন্তোষ জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী ফড়নবীস। তাঁর বক্তব্য, জোটের শরিকেরা যখন নির্দিষ্ট প্রার্থীকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তখন কোনও নেতা ব্যক্তিগত ভাবে অন্য প্রার্থীর পাশে দাঁড়ালে তা জোটের ঐক্যকে দুর্বল করে। শিন্ডেকে নিজের দলের নেতাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখে জোটের শৃঙ্খলা বজায় রাখার বার্তাও দিয়েছেন তিনি। তবে একই সঙ্গে ফড়নবীসের দাবি, মহাযুতি ঐক্যবদ্ধ রয়েছে এবং বিরোধী মহাবিকাশ আঘাড়ির তুলনায় শাসক জোটের মধ্যে সমন্বয় বেশি।
শিন্ডের শিবসেনার একাংশের বক্তব্য, বিজেপি বড় শরিক হওয়ার কারণে জোটের অন্য দলগুলিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। তাদের অভিযোগ, পুণে শিক্ষক কেন্দ্র এবং ছত্রপতি সম্ভাজিনগরের স্নাতক কেন্দ্রের মতো আসনে লড়ার আগ্রহ থাকলেও শিবসেনাকে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ এই বিদ্রোহ। শিবসেনার এক নেতার বক্তব্য, নিজেদের রাজনৈতিক জায়গা ও সংগঠনের স্বার্থ রক্ষা করতে হলে দলের আপত্তি প্রকাশ করা জরুরি। যদিও প্রকাশ্যে শিন্ডে জোটের ঐক্য নিয়ে আশাবাদী বলেই জানিয়েছেন।
আসন সমঝোতা নিয়ে অসন্তোষ অবশ্য শুধু মহাযুতির সমস্যা নয়। বিরোধী মহাবিকাশ আঘাড়ির মধ্যেও বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রার্থী বাছাই ও আসন ভাগাভাগি নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। কংগ্রেস, শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে) এবং শরদ পওয়ারের এনসিপির মধ্যে কয়েকটি আসনে ঐকমত্যে পৌঁছনো কঠিন হয়েছে। ফলে মহারাষ্ট্রের বিধান পরিষদের এই নির্বাচন রাজ্যের দুই প্রধান জোটের সাংগঠনিক সমন্বয়ের ছবিও সামনে আনছে।
স্নাতক ও শিক্ষক কেন্দ্রের ভোটের চরিত্রও সাধারণ বিধানসভা নির্বাচনের থেকে আলাদা। এখানে নির্দিষ্ট কেন্দ্রের নথিভুক্ত স্নাতক ও শিক্ষক ভোটাররা প্রতিনিধি বেছে নেন। তাই প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগাযোগ, স্থানীয় সংগঠনের প্রভাব এবং ভোটারদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্রোহী প্রার্থী বা শরিক দলের অসন্তুষ্ট নেতা ভোট ভাগ করে দিতে পারেন। ফলে দলীয় সমর্থনের অঙ্ক থাকলেও শেষ পর্যন্ত ভোটের ফল নির্ভর করবে স্থানীয় সমীকরণ ও ভোটারদের সিদ্ধান্তের উপর।
মহাযুতির সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ, জোটের সরকারি প্রার্থীদের পক্ষে শরিকদের সমর্থন নিশ্চিত করা এবং বিদ্রোহের জেরে ভোট ভাগ হওয়া আটকানো। ফড়নবীসের বার্তা কতটা কার্যকর হয়, শিন্ডে নিজের দলের অসন্তুষ্ট নেতাদের কতটা সামলাতে পারেন, আর অজিত পওয়ারের এনসিপি এই টানাপড়েনের মধ্যে নিজেদের প্রার্থীর পাশে জোটের সমর্থন কতটা ধরে রাখতে পারে—তা-ই এখন দেখার।
পাঁচটি আসনের এই নির্বাচন তাই শুধু বিধান পরিষদের সদস্য বেছে নেওয়ার লড়াই নয়। মহাযুতির নেতৃত্ব, আসন সমঝোতার গ্রহণযোগ্যতা এবং শরিকদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য—সব কিছুরই পরীক্ষা। ভোটের ফল প্রকাশের আগেই যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা হল, ক্ষমতায় একসঙ্গে থাকলেও নির্বাচনী স্বার্থের প্রশ্নে মহাযুতি কতটা একজোট?





