নয়াদিল্লি: গাড়ি নিয়ে দিল্লির ব্যস্ততম এলাকায় ঢুকতে গেলে এ বার কি দিতে হবে অতিরিক্ত টাকা? এখনই নয়। তবে ভবিষ্যতের দিল্লির জন্য এমনই এক বড় পরিবর্তনের দরজা খুলে দিল মাস্টার প্ল্যান দিল্লি ২০৪৭ (MPD-2047)। ২০ অগস্ট কেন্দ্রের আবাসন ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রকের অনুমোদনের পরে সামনে এসেছে পরিকল্পনার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব—শহরের অতিরিক্ত যানজটপূর্ণ এলাকায় ‘কনজেশন প্রাইসিং’ বা যানজট-কর চালু করা যেতে পারে।
অর্থাৎ, যে এলাকায় যানবাহনের চাপ অত্যন্ত বেশি, সেখানে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ঢোকার জন্য নির্দিষ্ট ফি নেওয়ার ব্যবস্থা করা হতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—এটি এখনও চালু হয়নি এবং এখনই চালু করার কোনও সরকারি সিদ্ধান্তও নেই। কেন্দ্রীয় আবাসন ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী মনোহর লাল খট্টরও জানিয়েছেন, বর্তমানে দিল্লিতে কনজেশন চার্জ বসানোর কোনও তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা নেই।
তাহলে প্রস্তাবটি কী?
MPD-2047-তে তিন ধরনের এলাকা নিয়ে ভাবা হয়েছে। প্রথমত, মেট্রো বা গণপরিবহণকেন্দ্রিক Transit-Oriented Development (TOD) এলাকার ক্যাচমেন্ট। দ্বিতীয়ত, পুরনো দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে তৈরি Walled City Heritage Zone—যার মধ্যে চাঁদনি চক, সদর বাজার, জামা মসজিদ, চাওরি বাজারের মতো ব্যস্ত এলাকা পড়ছে। তৃতীয়ত, Metropolitan City Centre (MCC)—যার মধ্যে রয়েছে কনট প্লেস, জনপথ এবং করোলবাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা।
এখানেই শেষ নয়। পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, এই ধরনের এলাকায় গাড়ির প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে ভবিষ্যতে RFID ট্যাগ ব্যবহারের কথাও বিবেচনা করা যেতে পারে। কোন এলাকায়, দিনের কোন সময়ে এবং কী ধরনের যানবাহন ঢুকছে—তার ভিত্তিতে পার্কিংয়ের দামও পরিবর্তন করার কথা রয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের দিল্লিতে শুধু রাস্তা ব্যবহার নয়, কখন কোথায় গাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন, সেটিও খরচের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
কেন এমন ভাবনা?
দিল্লির জনসংখ্যা ২০৪৭ সালের মধ্যে প্রায় ৩.২ কোটি হতে পারে বলে মাস্টার প্ল্যানে অনুমান করা হয়েছে। ফলে শুধু রাস্তা চওড়া করে বা নতুন উড়ালপুল বানিয়ে যানজট সামলানো কঠিন হবে। পরিকল্পনার বড় লক্ষ্যই হল ব্যক্তিগত গাড়ির উপর নির্ভরতা কমিয়ে গণপরিবহণ, হাঁটা এবং সাইকেল ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ানো।
এই মডেল অবশ্য দিল্লির নিজস্ব আবিষ্কার নয়। বিশ্বের একাধিক বড় শহর যানজট কমাতে একই ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। সিঙ্গাপুর ১৯৭৫ সালে কেন্দ্রীয় ব্যবসায়িক এলাকায় পিক আওয়ারে প্রবেশের জন্য ফি নেওয়া শুরু করে। ১৯৯৮ সালে সেটি সম্পূর্ণ ইলেকট্রনিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়। এখন সেখানে সময়, জায়গা, গাড়ির ধরন এবং রাস্তার গতির ভিত্তিতে চার্জ পরিবর্তিত হয়।
লন্ডন ২০০৩ সালে কেন্দ্রীয় এলাকায় Congestion Charge চালু করে। সেখানে নির্দিষ্ট এলাকায় গাড়ি চালানোর জন্য দৈনিক ফি দিতে হয়। এর সঙ্গে রয়েছে দূষণ কমানোর জন্য Ultra Low Emission Zone বা ULEZ। মিলান-ও Area C-এর মাধ্যমে শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করেছে।
আর নিউ ইয়র্ক ২০২৫ সালে ম্যানহাটনের নির্দিষ্ট অংশে congestion pricing চালু করেছে। উদ্দেশ্য—ব্যক্তিগত গাড়ির প্রবেশ কমানো, গণপরিবহণে মানুষকে উৎসাহিত করা এবং সংগৃহীত অর্থ পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়নে ব্যবহার করা।
তবে দিল্লির ক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন অন্য জায়গায়। চার্জ বসালেই কি যানজট কমবে? নাকি সাধারণ মানুষের উপর বাড়বে আরও একটি আর্থিক বোঝা? বিশেষ করে যাঁদের কাজের প্রয়োজনে পুরনো দিল্লি, কনট প্লেস বা অন্য ব্যস্ত এলাকায় গাড়ি নিয়ে যেতেই হয়, তাঁদের জন্য এই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে চার্জের পরিমাণ, সময়, ছাড়ের নিয়ম এবং বিকল্প গণপরিবহণ কতটা উন্নত করা যাচ্ছে তার উপর।
এই কারণেই MPD-2047-এর আসল লক্ষ্য শুধু ‘গাড়ি থেকে টাকা নেওয়া’ নয়। লক্ষ্য হল দিল্লির রাস্তার জায়গাকে আরও দক্ষ ভাবে ব্যবহার করা এবং মানুষকে ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে মেট্রো, বাস, হাঁটা বা সাইকেলের দিকে ঠেলে দেওয়া। একই সঙ্গে তিনটি বড় মাল্টিমোডাল পরিবহণ হাব—আনন্দ বিহার-কর্করদুমা, কাশ্মীরি গেট এবং নিজামুদ্দিন-সarai Kale Khan—তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
অর্থাৎ ২০৪৭-এর দিল্লির বার্তা স্পষ্ট—রাস্তা শুধু গাড়ির জন্য নয়, মানুষের জন্যও। কিন্তু সেই পরিবর্তনের মূল্য কে দেবেন, কত দেবেন এবং কোন গাড়ি কতটা ছাড় পাবে—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও ভবিষ্যতের হাতে। আপাতত ‘কনজেশন চার্জ’ একটি প্রস্তাব মাত্র; দিল্লিবাসীর পকেট থেকে টাকা নেওয়ার সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।