নয়াদিল্লি: সরকারি চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন দেখেন বহু তরুণ-তরুণী। বছরের পর বছর প্রস্তুতি, একের পর এক পরীক্ষা পেরিয়ে সেই চাকরি হাতে এলে অনেকেরই মনে হয়, এ বার বুঝি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত। কিন্তু যে চাকরিকে অন্যেরা সৌভাগ্য বলে মনে করেন, সেটাই যদি নিজের কাছে ক্রমশ অসহ্য হয়ে ওঠে? নিরাপদ জীবনের পরিচিত গণ্ডি ছেড়ে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত কি ভুল, না কি নিজের মনের কথা শোনার সাহস? এই প্রশ্নগুলিই এখন তাড়া করে বেড়াচ্ছে প্রিয়াকে। কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও নিশ্চিত হতে পারছেন না তিনি। বিকল্প কোনও চাকরি হাতে নেই, সামনে কী অপেক্ষা করছে তা-ও অজানা। সমাজমাধ্যমে নিজের দোলাচলের কথা জানিয়ে তাঁর প্রশ্ন, ‘‘জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করে ফেললাম না তো?’’
এক্স-এ প্রিয়া নামে এক ব্যবহারকারী নিজের অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নিয়েছেন। তাঁর পরিচিতি অনুযায়ী, তিনি একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফাপত্র জমা দেওয়ার পর থেকেই ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা সংশয় তাঁকে ঘিরে ধরেছে। এক দিকে নিয়মিত বেতন, আর্থিক স্থিতি এবং নির্দিষ্ট ছন্দে চলা জীবন। অন্য দিকে, সেই একই কাজ আরও পাঁচ বা দশ বছর ধরে করে যাওয়ার কথা ভাবতেই অনীহা। শেষ পর্যন্ত পরিচিত নিরাপত্তা ছেড়ে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। কিন্তু নতুন কোনও গন্তব্য এখনও স্পষ্ট নয়। নিজের পরিস্থিতি বোঝাতে বাসযাত্রার উদাহরণ দিয়েছেন প্রিয়া। তাঁর কথায়, মাঝপথে যদি বোঝা যায় যে বাসটি ভুল দিকে যাচ্ছে, তা হলে নেমে পড়তে ইচ্ছে করলেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় আগের সিদ্ধান্ত। টিকিটের দাম দেওয়া হয়ে গিয়েছে, অন্য যাত্রীরা নিজেদের গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলেছেন, আর তাঁদের চোখে বাস থেকে নেমে যাওয়াটা ভুল সিদ্ধান্ত। অথচ যিনি বুঝতে পেরেছেন যে তিনি ভুল পথে চলেছেন, তাঁর কাছে সামনে এগোনোও কষ্টকর, আবার নেমে নতুন পথ খুঁজে নেওয়াও ভয়ের।
https://x.com/PriyaCeladine/status/2111347832582201639?
প্রিয়ার বক্তব্য, চাকরি তাঁকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট বেতন দিয়েছে, দিয়েছে নিশ্চিন্ত ও পূর্বানুমানযোগ্য জীবন। কিন্তু সেই কাজের মধ্যে নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছিলেন না তিনি। তাই চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখন তাঁর ভয়, সামনে কী হবে তা তিনি জানেন না। কখনও কখনও নিজের সিদ্ধান্তকে বেপরোয়া বলেও মনে হচ্ছে তাঁর। এই দুশ্চিন্তার সঙ্গে জুড়েছে আরও একটি বিষয়। এখনও নিজের সিদ্ধান্তের কথা বাবা-মাকে জানাতে পারেননি প্রিয়া। তাঁর বাবা-মায়ের বয়স ষাটের কোঠার শেষ দিকে। তাঁদের আর্থিক ভাবে নিজের উপর নির্ভর করতে হবে, এমন নয়; আবার বাবা-মাও তাঁর উপর নির্ভরশীল নন বলে জানিয়েছেন তিনি। তবু নিজের সিদ্ধান্তের কথা শুনে তাঁরা দুশ্চিন্তায় পড়বেন, কষ্ট পাবেন—এই ভাবনাই তাঁকে পিছিয়ে দিচ্ছে। ফলে চাকরি ছাড়ার পর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি পরিবারকে জানানোর মানসিক চাপও সামলাতে হচ্ছে তাঁকে।
প্রিয়ার পোস্ট ঘিরে সমাজমাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়া এসেছে। কেউ তাঁর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন, কেউ আবার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ছাড়া চাকরি ছাড়ার ঝুঁকির দিকটি তুলে ধরেছেন। এক ব্যবহারকারী জাপানের একটি প্রচলিত উপমার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, ভুল ট্রেনে উঠে পড়লে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নেমে পড়াই ভাল। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ভয় পান, কারণ পরের ট্রেনটি সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দেবে কি না, তা তাঁদের জানা নেই। সেই ভয়েই অনেকে ভুল পথে চলতে থাকেন।
অন্য এক ব্যবহারকারীর বক্তব্য, নিজের জীবনে কোন সিদ্ধান্ত ভাল বা খারাপ, তা শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই বুঝতে হবে। অন্যের চোখে যে চাকরি স্বপ্নের, তা প্রত্যেকের কাছে সমান ভাবে উপযুক্ত নাও হতে পারে। আবার অনেকেই মনে করিয়ে দিয়েছেন, পছন্দের কাজ খুঁজতে গিয়ে আর্থিক নিরাপত্তা, সঞ্চয় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়গুলিও গুরুত্ব দিয়ে ভাবা প্রয়োজন।
প্রিয়ার ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে চাকরি নিয়ে সমাজের প্রত্যাশা ও ব্যক্তিগত সন্তুষ্টির দ্বন্দ্বকে। ভারতে সরকারি চাকরিকে এখনও আর্থিক স্থিতি, সামাজিক সম্মান এবং নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তাই এমন চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু নিয়মিত বেতন থাকলেই যে প্রত্যেকে নিজের কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবেন, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। কাজের পরিবেশ, ব্যক্তিগত আগ্রহ, মানসিক স্বস্তি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজস্ব ভাবনাও পেশাগত সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। তবে প্রিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে চাকরি ছেড়ে দেওয়াকেই সবার জন্য সঠিক পথ বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা, আর্থিক সঞ্চয়, পরিবারের দায়িত্ব এবং নতুন কাজের সম্ভাবনা—প্রতিটি মানুষের পরিস্থিতি আলাদা। তাই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ঝুঁকি ও সম্ভাবনা দু’দিকই বিবেচনা করা জরুরি।
প্রিয়ার পোস্টের শেষ প্রশ্নটিই যেন গোটা আলোচনার কেন্দ্রে—শুধু অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই বলে, ভুল পথে চলতে থাকা কত দিন সম্ভব? তাঁর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নতুন গন্তব্য খুঁজে পাওয়া এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে তৈরি হওয়া ভয় সামলানো। চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ঠিক না ভুল, তা সময়ই বলবে। আপাতত অনিশ্চয়তার মধ্যেই নিজের পরবর্তী পথ খুঁজছেন তিনি।





