মহীশূর: রাতের আকাশে একের পর এক জ্বলে উঠল হাজার হাজার আলো। মুহূর্তের মধ্যে সেই আলোগুলি মিলে তৈরি হল বিশাল এক ময়ূর। কখনও পেখম মেলে দাঁড়িয়ে থাকা, কখনও আবার নাচের ভঙ্গিতে ছন্দে ছন্দে বদলে যাচ্ছে তার অবয়ব! কোনও শিল্পীর তুলির টান নয়, কোনও বিশাল পর্দার কারসাজিও নয়। নিখুঁত প্রযুক্তি আর হাজার হাজার ড্রোনের সমন্বয়ে ভারতের জাতীয় পাখি ময়ূরকে এ ভাবেই জীবন্ত করে তুলল কর্নাটকের মহীশূর। আর সেই অসাধারণ প্রদর্শনই জায়গা করে নিল গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে।
মহীশূরের বিখ্যাত দশরা উৎসবের অঙ্গ হিসেবে গত ১৮ অক্টোবর বান্নিমন্তপের টর্চলাইট প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত হয়েছিল এই বিশেষ ড্রোন প্রদর্শনী। তাতে ব্যবহার করা হয় মোট ৩,৪৭৩টি ড্রোন। আকাশে একসঙ্গে উড়ে, নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে এবং আলো ও গতির সমন্বয়ে সেগুলি তৈরি করে বিশাল ময়ূরের অবয়ব। ড্রোনের সাহায্যে আকাশে পাখির বৃহত্তম প্রদর্শনী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে এই কীর্তি।
আলোর বিন্দু থেকে বিশাল ময়ূর
দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, রাতের আকাশে যেন কোনও জাদুকর বিশাল ক্যানভাসে ছবি এঁকে চলেছেন। কিন্তু প্রতিটি আলোর বিন্দুর পিছনে রয়েছে একটি করে ড্রোন, নির্দিষ্ট অবস্থান এবং পূর্বপরিকল্পিত উড়ানের পথ। হাজার হাজার ড্রোনকে একই সময়ে নিয়ন্ত্রণ করে তাদের নির্দিষ্ট বিন্যাসে সাজানোই এই প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।
ড্রোনগুলির গায়ে থাকা এলইডি আলো রং বদলে আকাশে তৈরি করে বিভিন্ন ছবি ও নকশা। বিশেষ সফ্টওয়্যারের সাহায্যে প্রতিটি ড্রোনের অবস্থান ও গতিপথ নির্ধারণ করা হয়।
সেই নির্দেশ মেনেই তারা একসঙ্গে উড়ে নির্দিষ্ট আকার তৈরি করে। একটি ড্রোনের সামান্য ভুল অবস্থানও বড় বিন্যাসের চেহারা নষ্ট করতে পারে। তাই এমন প্রদর্শনীর জন্য প্রয়োজন নিখুঁত পরিকল্পনা, সমন্বয় এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা। মহীশূরের আকাশে এ বার সেই প্রযুক্তিরই নজরকাড়া প্রদর্শন দেখা গেল। ময়ূর ছিল অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ। তবে শুধু জাতীয় পাখির ছবিতেই থেমে থাকেননি আয়োজকেরা। ড্রোনের আলোয় ফুটিয়ে তোলা হয় প্রজাপতি, সিংহ, জাতীয় পতাকা হাতে এক সেনা, শিব, নন্দী, দেবী চামুণ্ডেশ্বরী এবং কর্নাটকের মানচিত্রের মতো নানা অবয়বও।
দশরার ঐতিহ্যে প্রযুক্তির ছোঁয়া
মহীশূরের দশরা কর্নাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উৎসব। রাজকীয় শোভাযাত্রা, আলোকসজ্জা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং দেবী চামুণ্ডেশ্বরীর আরাধনাকে ঘিরে প্রতি বছর এই উৎসবে বিপুল মানুষের সমাগম হয়। ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তিকে যুক্ত করে ড্রোন প্রদর্শনী এখন উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। এই প্রদর্শনীর আয়োজন করে চামুণ্ডেশ্বরী ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কর্পোরেশন বা সিইএসসি। ড্রোনের মাধ্যমে আকাশে বিভিন্ন ছবি ফুটিয়ে তোলার কাজ করেছে দিল্লির সংস্থা বটল্যাব ডায়নামিক্স। সংস্থাটি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি, দিল্লির সঙ্গে যুক্ত একটি প্রযুক্তি উদ্যোগ।
২০২২ সালে মহীশূরের দশরা উৎসবে প্রথম ড্রোন প্রদর্শনী করে সংস্থাটি। সেই সময় ব্যবহার করা হয়েছিল ২৫০টি ড্রোন। ২০২৪ সালে ড্রোনের সংখ্যা বেড়ে হয় ১,৫০০। ২০২৫ সালে ২,৯৮৩টি ড্রোনের সাহায্যে আকাশে লাফিয়ে ওঠা বাঘের ছবি তৈরি করে বিশ্বরেকর্ড গড়েছিল সিইএসসি। এ বার পাখির অবয়ব তৈরির বিভাগে নতুন নজির গড়ল ময়ূর।
একই উৎসবে দ্বিতীয় বিশ্বরেকর্ড
গত বছরের বাঘের প্রদর্শনী এবং এ বছরের ময়ূর—দুই ক্ষেত্রেই সিইএসসি-র সাফল্য দেখিয়ে দিল, ড্রোন প্রযুক্তিকে শুধু নজরদারি বা শিল্পক্ষেত্রের কাজে সীমাবদ্ধ রাখার দিন ফুরোচ্ছে। পরিকল্পিত ভাবে ব্যবহার করলে এই প্রযুক্তি বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। আয়োজকদের দাবি, এ বছরের প্রদর্শনী দেখতে বিপুল মানুষের সমাগম হয়েছিল।
অনুষ্ঠানস্থলের পাশাপাশি আশপাশের এলাকাতেও দাঁড়িয়ে অনেকে আকাশের এই আলোর খেলা দেখেন। উৎসবের পরিচিত ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রযুক্তির এমন মেলবন্ধন দর্শকদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে। কর্নাটকের উপমুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমারও এই সাফল্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মর্ম, মহীশূরের দশরা দেখিয়ে দিচ্ছে কী ভাবে ঐতিহ্য ও উদ্ভাবন পাশাপাশি চলতে পারে। জাতীয় পাখির এমন বিশাল রূপায়ণ রাজ্যের সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতারও পরিচয়।
শুধু আলোর খেলা নয়, নিখুঁত সমন্বয়ের পরীক্ষা
হাজার হাজার ড্রোনকে একসঙ্গে ওড়ানো মানে শুধু আকাশে ছবি তৈরি করা নয়। প্রতিটি ড্রোনের অবস্থান, উচ্চতা, গতি, ব্যাটারির ক্ষমতা এবং অন্য ড্রোনের সঙ্গে দূরত্বের হিসাব রাখতে হয়। আবহাওয়া, বাতাসের গতিবেগ এবং উড়ানের এলাকার নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই এমন প্রদর্শনীর পিছনে থাকে প্রযুক্তিবিদ, সফ্টওয়্যার বিশেষজ্ঞ এবং উড়ান পরিচালনাকারীদের দীর্ঘ প্রস্তুতি।
মহীশূরের ময়ূর সেই জটিল প্রযুক্তিরই দৃশ্যমান ফল। এক সময় যে কাজের জন্য বিশাল মঞ্চ, পর্দা কিংবা আলোকসজ্জার প্রয়োজন হত, এখন তা সম্ভব হচ্ছে খোলা আকাশেই। কয়েক হাজার ড্রোনের আলো দিয়ে তৈরি হচ্ছে চলমান ছবি, বদলে যাচ্ছে আকার, ফুটে উঠছে সাংস্কৃতিক ও জাতীয় প্রতীক। দশরার আকাশে ৩,৪৭৩টি ড্রোনের ময়ূর তাই নিছক এক ঝলমলে প্রদর্শনী নয়। ভারতের উৎসবের ঐতিহ্যকে আধুনিক প্রযুক্তির ভাষায় তুলে ধরার এক অভিনব উদাহরণ। আর সেই মেলবন্ধনই মহীশূরের রাতকে স্মরণীয় করে রাখল বিশ্বরেকর্ডের পাতায়।




