কাঠমান্ডু: মাটির নীচে চলে যাবে দেহ। হয়তো পাশে থাকবে না কোনও নাম, থাকবে না পরিবারের কেউ। থাকবে শুধু একটি নম্বর, কয়েকটি ছবি, আঙুলের ছাপ—আর সংরক্ষিত ডিএনএ। আজ যাঁকে চেনার উপায় নেই, কাল তাঁর স্বজন যদি এসে বলেন, ‘ওঁকে খুঁজছি’, তখন যাতে উত্তর দেওয়া যায়—সেই পথটাই খোলা রাখছে নেপাল।ভয়াবহ বন্যা ও হড়পা বানের পরে পরিচয়হীন মৃতদেহের চাপ সামলাতে এমনই সিদ্ধান্ত নিয়েছে নেপাল সরকার।
শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি এমন প্রতিটি দেহ সমাধিস্থ করার আগে ডিএনএ নমুনা এবং অন্যান্য ফরেন্সিক তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। দেওয়া হবে পৃথক পরিচয় নম্বর। কোথায় কাকে সমাধিস্থ করা হল, সেই তথ্যও নথিভুক্ত থাকবে। ভবিষ্যতে নিখোঁজ কোনও মানুষের পরিবারের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে সেই দেহের পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে। কারণ, এই মুহূর্তে নেপালে শোকের সঙ্গে মিশে রয়েছে এক ভয়ঙ্কর অনিশ্চয়তা। মৃত বলে জানেন না পরিবার। জীবিত বলেও জানেন না। শুধু জানেন—মানুষটি নিখোঁজ।
বুধবারের ভয়াবহ বিপর্যয়ের পরে নদীর স্রোতে ভেসে গিয়েছে বহু মানুষ। পাহাড়ধস, কাদা আর পাথরের প্রবল স্রোত জনপদের পর জনপদকে ছিন্নভিন্ন করেছে। রসুয়া থেকে নুয়াকোট হয়ে মৃতদেহ ভেসে পৌঁছেছে বহু দূরের জেলাতেও। চিতওয়ান, তানাহুন, নওয়ালপরাসি-সহ একাধিক জায়গায় একের পর এক দেহ উদ্ধার হয়েছে। স্থানীয় মর্গগুলিতে জায়গা ফুরিয়ে আসায় প্রশাসনের সামনে তৈরি হয়েছে আরও একটি ভয়াবহ সমস্যা—এই দেহগুলিকে রাখা হবে কোথায়?
শুধু চিতওয়ানেই উদ্ধার হওয়া দেহের সংখ্যা হাসপাতালের মর্গের ধারণক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। ফলে অস্থায়ী সংরক্ষণকেন্দ্র তৈরির পাশাপাশি পরিচয়হীন দেহগুলিকে দ্রুত সমাধিস্থ করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। স্বাস্থ্যঝুঁকিও রয়েছে। দীর্ঘ সময় দেহ সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। তাই প্রশাসনের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত—দেহকে অনির্দিষ্টকাল মর্গে রাখা যাবে না, আবার পরিচয় না জেনেই শেষ করে দেওয়া যাবে না মানুষের পরিচয়ের শেষ সূত্রটুকুও। সেই জায়গাতেই ডিএনএ।
প্রশাসনের পরিকল্পনা, সমাধিস্থ করার আগে দেহের ছবি তোলা হবে, আঙুলের ছাপ নেওয়া হবে, প্রয়োজনীয় ময়নাতদন্ত করা হবে এবং ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে। মুখ দেখে শনাক্ত করার সম্ভাবনা থাকলে সেই ছবিও প্রকাশ করা হচ্ছে, যাতে নিখোঁজ মানুষের পরিবার মিল খুঁজে পান। প্রতিটি দেহের সঙ্গে থাকবে একটি নির্দিষ্ট ট্যাগ বা পরিচয় নম্বর। সমাধির অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট তথ্যও নথিতে রাখা হবে। অর্থাৎ, দেহ মাটির নীচে যাবে, কিন্তু তদন্তের দরজা বন্ধ হবে না।
এই সিদ্ধান্তের মধ্যে তাই প্রশাসনিক প্রয়োজনের পাশাপাশি রয়েছে গভীর মানবিকতা। প্রশাসনের এক কর্তার কথায়, ভাবুন, কয়েক মাস পরে কোনও পরিবার হয়তো এখনও খুঁজছে তাঁদের প্রিয়জনকে। পুরনো ছবি হাতে নিয়ে থানায় ঘুরছেন। হাসপাতালের তালিকা দেখছেন। নিখোঁজের পোস্টার ছড়াচ্ছেন। সেই পরিবার যদি কোনও দিন জানতে পারে, তাঁদের মানুষটি আসলে এই বিপর্যয়ের মৃতদের মধ্যেই ছিলেন—তখন অন্তত একটি নিশ্চিত উত্তর মিলবে। হয়তো সেই উত্তর আনন্দের হবে না। কিন্তু অনিশ্চয়তার থেকেও কখনও কখনও নিশ্চিত শোক সহজ। ‘ফিরে আসবে কি?’—এই প্রশ্নের বদলে অন্তত বলা যাবে, ‘কোথায় আছে, আমরা জানি।’
এখনও উদ্ধারকাজ চলছে। ধ্বংসস্তূপের নীচে, নদীর ধারে, ভেসে যাওয়া বসতির আশপাশে তল্লাশি চালাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। খারাপ আবহাওয়া, ধসে যাওয়া রাস্তা এবং অস্থিতিশীল পাহাড়ি ভূখণ্ড কাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে। নেপালের পাশাপাশি চিনের তিব্বতেও চলছে উদ্ধার ও নিখোঁজদের সন্ধান। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দুই অঞ্চল মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ৭৫০-এর কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং নিখোঁজের সংখ্যা কয়েক হাজার।
আর সেই সংখ্যার আড়ালে রয়েছে হাজার হাজার আলাদা গল্প।
কেউ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। কেউ বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন কাজে। কেউ সীমান্তের পথে ছিলেন। কেউ হয়তো নদীর ধারে নিজের ছোট্ট দোকানেই ছিলেন। দুর্যোগ তাঁদের নাম মুছে দিয়েছে, মুখ মুছে দিয়েছে, পরিচিত ঠিকানাটুকুও মুছে দিয়েছে। কিন্তু নেপাল চাইছে অন্তত পরিচয়ের শেষ সুতোটি যেন না ছিঁড়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়া মৃতদেহগুলির ডিএনএ এবং অন্যান্য পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অর্থাৎ এখনই পরিচয় জানা না গেলেও ভবিষ্যতে সেই তথ্য কাজে লাগানো যাবে।এই বিপর্যয়ে তাই আর একটি লড়াই চলছে—জীবিতদের উদ্ধারের পাশাপাশি মৃতদের পরিচয় ফিরিয়ে দেওয়ার লড়াই। রসুয়ার পাহাড়ে হয়তো আবার রাস্তা তৈরি হবে। ভাঙা সেতুর জায়গায় নতুন সেতু উঠবে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির জায়গায় আবার উঠবে ঘর। বাজার খুলবে। নদীর জল শান্ত হবে। কিন্তু যে মানুষগুলি আর ফিরবেন না, তাঁদের পরিবারগুলির অপেক্ষা শেষ হবে কী ভাবে?
হয়তো কোনও এক দিন একটি ডিএনএ রিপোর্ট সেই উত্তর দেবে। তখন একটি নম্বরের পিছন থেকে ফিরে আসবে একটি নাম। একটি অচেনা দেহ ফিরে পাবে তার পরিচয়। আর কোনও এক বাড়িতে, কান্নার মধ্যেও হয়তো কেউ বলতে পারবেন, ‘অন্তত জানলাম, ও কোথায় আছে।’ সেই সম্ভাবনাটুকুই মাটির নীচে রেখে দিচ্ছে নেপাল!




