নিউজ ডেস্ক: ধর্মের বেড়াজাল পার করে উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠা, নাকি নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা? অভিনেত্রী নুসরত জাহানের সিঁদুরখেলা ঘিরে ফের এই প্রশ্নই উঠে এল সমাজমাধ্যমে। সারা বছর সিঁদুর নেই , শাঁখা - পলা নেই অথচ দুর্গাপুজোর দশমীতে সিঁদুরে রাঙা সিঁথি, পরণে লাল পাড় সাদা শাড়ি, হাতে শাঁখা-পলা পরে উমাবরণ করতে দেখা গিয়েছিল টলিউড অভিনেত্রীকে। সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্বামী অর্থাৎ অভিনেতা যশ দাশগুপ্তও। সেই ছবি ও ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই অভিনেত্রীর ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে ফের শুরু হয় চরম বিতর্ক। একাধিক ট্রোলের মুখে পড়েন অভিনেত্রী। তবে এবার সমালোচকদের উদ্দেশে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন নুসরত। জানিয়ে দিলেন, উৎসব কোনও একজনের নয়, উৎসব সকলের। উৎসব ধর্মের কিংবা জাতের নয় , উৎসব আনন্দের।
দশমী মানেই বাঙালির আবেগের এক বিশেষ মুহূর্ত। একদিকে মায়ের বিদায়ের বিষাদ, অন্যদিকে সিঁদুরখেলার আনন্দে মেতে ওঠেন মহিলারা। দেবী দুর্গাকে বরণ করে তাঁর কপালে সিঁদুর ছোঁয়ানোর পর একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে সিঁথি রাঙিয়ে দেন তাঁরা। লাল সিঁদুরে রাঙিয়ে ওঠে মুখ, শাড়ি আর উৎসবের সেই বিশেষ মুহূর্ত। উমার চলে যাওয়ার বিষাদের পরিস্থিতিতেও মুখে ফুটে ওঠে একটুকরো হাঁসি।সেই চেনা বাঙালি আবেগের ছবিতেই দেখা গিয়েছে নুসরত জাহানকে। কিন্তু তাঁর এই উদ্যাপনকে ঘিরেই ফের প্রশ্ন তুলেছেন নেটিজেনদের একাংশ। ট্রোল করছেন ট্রোলাররা।
কেউ প্রশ্ন করেছেন, মুসলিম ধর্মাবলম্বী হয়েও কেন হিন্দুদের ধর্মীয় আচার পালন করছেন অভিনেত্রী? আবার কেউ তাঁর নাম ও পদবি টেনে কটাক্ষ করেছেন। নুসরতের পোশাক, সিঁথির সিঁদুর এবং হাতে শাঁখা-পলা নিয়েও মন্তব্য করেছেন অনেকে। ফলে উৎসবের মুহূর্ত ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে ধর্মীয় পরিচয় এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিতর্ক। তবে এই ধরনের সমালোচনা নুসরতের কাছে নতুন নয়। এর আগেও দুর্গাপুজোয় অংশ নেওয়া, অঞ্জলি দেওয়া কিংবা সিঁদুরখেলায় মেতে ওঠার জন্য একাধিকবার কটাক্ষের মুখে পড়তে হয়েছে অভিনেত্রী কে।
এবার সেই বিতর্কের জবাব দিতে গিয়ে অভিনেত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, উৎসব তো সকলের। তিনি বরাবরই সমস্ত উৎসব পালন করে এসেছেন। তাঁর পদবি উল্লেখ করে যাঁরা প্রশ্ন তোলেন, তাঁদের উদ্দেশেও নিজের বক্তব্য জানিয়েছেন নুসরত। অভিনেত্রীর কথায়, অনেকেই তাঁকে বলেন, তিনি তো ‘জাহান’। কিন্তু এই ধরনের মন্তব্যের জবাব তিনি কোনও দিনই দিতে চাননি। কারণ, তাঁর মতে, অন্য ধর্মের মানুষ হয়েও যাঁরা নিষ্ঠা ও বিশ্বাসের সঙ্গে দেবীর আরাধনা করেন কিংবা সিঁদুরখেলায় অংশ নেন, তাঁদেরও কোনও জবাবদিহি করার প্রয়োজন নেই। এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়।
শুধু তাই নয়, সমাজমাধ্যমে নিজের পোস্টের মন্তব্যের ঘরেও যে নানা ধরনের কটাক্ষ চোখে পড়ে, সে কথাও জানিয়েছেন অভিনেত্রী। নুসরতের বক্তব্য, যাঁরা নিজেদের ধর্ম সম্পর্কে সব কিছু জানেন বলে মনে করেন, তাঁদেরও অন্যের বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে দশ বার ভাবা উচিত। নিজের বিশ্বাস নিজের কাছে রাখা এবং অন্যের ব্যক্তিগত পছন্দকে সম্মান করাই বেশি জরুরি। তিনি নিজের মতো করে ভালো থাকতে চান, অন্যরাও নিজেদের মতো করে ভালো থাকুন—এই বার্তাই দিয়েছেন অভিনেত্রী।
আসলে নুসরত জাহানের সঙ্গে ধর্মীয় বিতর্কের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ২০১৯ সালে ব্যবসায়ী নিখিল জৈনের সঙ্গে বিয়ের পর সংসদে শপথগ্রহণের সময় সিঁদুর ও মঙ্গলসূত্র পরা নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে দুর্গাপুজোয় অংশ নেওয়া, দেবী দুর্গার আরাধনা এবং সিঁদুরখেলায় যোগ দেওয়ার মতো ঘটনাতেও তাঁকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। প্রতিবারই তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। যদিও নুসরত বারবারই সমস্ত ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসার কথা বলে এসেছেন।
এবারও সেই অবস্থান থেকে সরে আসেননি অভিনেত্রী। তাঁর কাছে উৎসব মানে শুধু আচার-অনুষ্ঠান নয়, আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এবং মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে থাকা। বাঙালির দুর্গাপুজো এমনিতেই ধর্মীয় পরিসর ছাড়িয়ে সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। পুজোর দিনগুলিতে জাতি, ধর্ম, ভাষার বিভেদ ভুলে একসঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠেন অসংখ্য মানুষ। সেই আবহেই নুসরতের সিঁদুরখেলা নিয়ে বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে।
তবে প্রশ্ন উঠছে, একজন অভিনেত্রী কী পোশাক পরবেন, কোন উৎসবে যোগ দেবেন কিংবা কীভাবে নিজের বিশ্বাস প্রকাশ করবেন, তা নিয়েও কি তাঁকে বারবার সামাজিক বিচারের মুখে পড়তে হবে? ব্যক্তিগত পছন্দের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্নটি তাই আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে। নুসরতকে নিয়ে সমাজমাধ্যমে যেমন সমালোচনা হয়েছে, তেমনই তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন অনেকে। তাঁদের মতে, উৎসবে যোগ দেওয়া কিংবা অন্য ধর্মের আচারকে সম্মান জানানো মানেই নিজের ধর্মীয় পরিচয় বদলে ফেলা নয়।
নুসরতের বক্তব্যও সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে। তিনি নিজের মতো করে উৎসব পালন করতে চান, আর অন্যের বিশ্বাসের প্রতিও সম্মান বজায় রাখার কথা বলছেন। সমালোচকদের জবাব দিতে গিয়ে তাই তাঁর বার্তা স্পষ্ট—বিশ্বাস ব্যক্তিগত, কিন্তু উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার অধিকার সকলের। আর সেই বার্তাকে ঘিরেই ফের চর্চার কেন্দ্রে টলিউডের এই জনপ্রিয় অভিনেত্রী।




