নয়াদিল্লি, নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: যুদ্ধের ময়দানে কখনও কখনও একটি সিদ্ধান্তের মূল্য কয়েক সেকেন্ডে মাপা যায়। আর কখনও একটি ‘মিথ্যা’ই বদলে দিতে পারে গোটা অভিযানের ফল। অপারেশন ‘সিঁদুর’-এর ভোলারি বিমানঘাঁটিতে হামলার নেপথ্যে তেমনই এক অবিশ্বাস্য ঘটনা সামনে এনেছে ভারতীয় বায়ুসেনার এক শীর্ষ আধিকারিকের বক্তব্য। ঊর্ধ্বতন কর্তাকে পুরো সত্য না জানিয়ে কয়েক মিনিট সময় বার করে নিয়েছিলেন দক্ষিণ-পশ্চিম বায়ুসেনা কমান্ডের তৎকালীন প্রধান এয়ার মার্শাল নাগেশ কাপুর। লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের ভোলারি বিমানঘাঁটির একটি গুরুত্বপূর্ণ হ্যাঙ্গার। ভিতরে থাকার কথা পাকিস্তান বায়ুসেনার শক্তিশালী Saab Erieye Airborne Early Warning and Control বা AEW&C বিমানের।
২০২৫ সালের ১০ মে। ভারত-পাকিস্তান সংঘাত তখন তুঙ্গে। পাকিস্তানের একাধিক সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানছিল ভারত। গুজরাতের গান্ধীনগরে দক্ষিণ-পশ্চিম বায়ুসেনা কমান্ডের সদর দফতর থেকে ভোলারি বিমানঘাঁটির দূরত্ব প্রায় ৫২০ কিলোমিটার। সেই ভোলারিই হয়ে উঠেছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযানের লক্ষ্য। ভারতীয় বায়ুসেনার একাধিক যুদ্ধবিমান তখন প্রস্তুত। পাইলটেরা ককপিটে। অস্ত্র প্রস্তুত। বার বার পরীক্ষা করা হচ্ছে সমস্ত ব্যবস্থা। অপেক্ষা শুধু নির্দেশের। সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়।
ভোলারির একটি হ্যাঙ্গার সম্পর্কে ভারতীয় বায়ুসেনার কাছে আগেই যথেষ্ট তথ্য ছিল। ধারণা ছিল, পাকিস্তানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নজরদারি বিমান Saab Erieye সেখানে রয়েছে। এই ধরনের AEW&C বিমানকে অনেকটা আকাশের ‘চোখ’ বলা যায়। শত্রুপক্ষের বিমান ও অন্যান্য গতিবিধি সম্পর্কে দূর থেকে তথ্য সংগ্রহ করে যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের বাহিনীকে সেই তথ্য পৌঁছে দেওয়াই তার অন্যতম প্রধান কাজ। ফলে এমন একটি বিমানকে নিষ্ক্রিয় করা পাকিস্তানের আকাশযুদ্ধের সক্ষমতার উপর বড় আঘাত হতে পারত।
এর মধ্যেই বেজে ওঠে ফোন। অন্য প্রান্তে বায়ুসেনা প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল এপি সিং। জানতে চাওয়া হয়, লক্ষ্যবস্তুতে থাকা পাকিস্তানি বিমানগুলির অবস্থান কী। তখনই আসে সেই মুহূর্ত, যার কথা পরে প্রকাশ্যে জানিয়েছেন এয়ার মার্শাল কাপুর।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি বায়ুসেনা প্রধানকে বলেছিলেন, বিমানগুলি ‘আকাশে উঠছে’। কিন্তু বাস্তবে তখনও বিমানগুলি আকাশে ওঠেনি। আরও প্রায় ১৫ মিনিট সময় লাগার কথা ছিল। অর্থাৎ, সময়ের হিসাব নিয়ে তিনি পুরো সত্য জানাননি। তাঁর নিজের ভাষায়, তিনি ‘সত্যটা বলেননি’। কারণ, তিনি জানতেন এই সময়টুকু না পেলে প্রস্তুত হয়ে থাকা ভারতীয় যুদ্ধবিমানগুলির অভিযান হয়তো থেমে যেতে পারে।
ককপিটে তখন অন্য ছবি। সুখোই-৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমান প্রস্তুত। সঙ্গে ছিল আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র। দ্রুতগতির এই ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে ছিল প্রায় ৩০০ কিলোগ্রাম ওয়ারহেড। পাইলট ও অস্ত্র-ব্যবস্থাপনা দলের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছিল। রাডার শত্রুর গতিবিধি খুঁজছে। ককপিটে সতর্কবার্তা শোনার জন্য প্রস্তুত রাডার ওয়ার্নিং সিস্টেম। তারপর রানওয়ে ছেড়ে আকাশে উঠল যুদ্ধবিমানগুলি।
বায়ুসেনা প্রধান আবার জানতে চেয়েছিলেন ‘ওরা এখন কোথায়?’ উত্তর এসেছিল, অস্ত্র ছোড়ার এখনও প্রায় আধ ঘণ্টা বাকি। অথচ বাস্তবে সেই সময়টিও পুরোপুরি মেলেনি। শেষ পর্যন্ত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। তারপরই আসে বার্তা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হয়েছে, বিমানগুলি ফিরে আসছে।
ভোলারির হ্যাঙ্গারে আঘাতটি ছিল অত্যন্ত নির্দিষ্ট। পরে প্রকাশিত উপগ্রহচিত্রে দেখা যায়, হ্যাঙ্গারের ছাদে বড়, অনিয়মিত গর্ত। ভিতরের কাঠামো ভেঙে পড়েছে। হ্যাঙ্গারের বাইরে ছড়িয়ে রয়েছে ধ্বংসাবশেষ। ছবিতে আঘাতটি একটি নির্দিষ্ট কাঠামোয় কেন্দ্রীভূত বলেই মনে হয়। অপারেশন ‘সিঁদুর’-এর অন্যতম আলোচিত ছবি হয়ে ওঠে সেটিই।
কিন্তু গল্পের সবচেয়ে নাটকীয় অংশটি তখনও বাকি। অভিযানের অনেক পরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে বসেছিলেন এয়ার মার্শাল কাপুর। একই টেবিলে ছিলেন এয়ার চিফ মার্শাল এপি সিংও। তখনই কাপুর নাকি সরাসরি বলেছিলেন, ‘স্যর, আমি আপনাকে মিথ্যা বলেছিলাম।’ জবাব এসেছিল আরও সংক্ষিপ্ত ‘আমি জানি।’ অর্থাৎ, যাঁকে কয়েক মিনিটের জন্য ‘অন্ধকারে’ রাখা হয়েছিল, তিনিও সম্ভবত পুরো ঘটনাটি বুঝেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে সেই কয়েক মিনিটই হয়ে উঠেছিল গুরুত্বপূর্ণ।
ভোলারি-কাণ্ডের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত উপগ্রহচিত্রে দেখা যায়, হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হ্যাঙ্গারের মেরামত বা পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালের ১০ মে-র আঘাতে হ্যাঙ্গারটির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। ভারতীয় বায়ুসেনার মতে, সেখানে থাকা পাকিস্তানের একটি AEW&C বিমান ধ্বংস হয়েছিল বলে বিশ্বাস করা হয়; অন্যদিকে পাকিস্তানি সূত্রে বিমানটির ক্ষয়ক্ষতি ও পরে মেরামত নিয়ে ভিন্ন দাবি রয়েছে। ফলে বিমানটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছিল না গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এই প্রশ্নে এখনও মতভেদ রয়েছে।
তবে একটি বিষয় নিয়ে ছবিই সবচেয়ে বেশি কথা বলে ভোলারির সেই হ্যাঙ্গার। যুদ্ধক্ষেত্রে যেখানে কয়েক মিনিটের সিদ্ধান্ত, গোয়েন্দা তথ্য এবং নির্ভুল অস্ত্র একসঙ্গে কাজ করে, সেখানে ‘সাদা মিথ্যা’ বলেও যদি কেউ সময় কিনে নিতে পারেন, সেই সময়ই কখনও হয়ে ওঠে অভিযানের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
অপারেশন ‘সিঁদুর’-এর বহু মাস পরে প্রকাশ্যে আসা সেই ঘটনার সবচেয়ে নাটকীয় সংলাপ তাই হয়তো কোনও ক্ষেপণাস্ত্রের নয় ‘বিমানগুলি আকাশে উঠছে।’ যখন বাস্তবে তখনও ওঠেনি। আর সেই অতিরিক্ত কয়েক মিনিটেই শুরু হয়েছিল ভোলারির দিকে যাত্রা।