মুলতান: ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসা তাঁকে এক দিন ঘর ছাড়তে বাধ্য করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাবার কথায় নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হয়েছিল কাশিফ মিনহাসকে। ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি তাঁর। তবে সেই স্বপ্নই নতুন করে বেঁচে উঠেছে তাঁর দুই ছেলে আরাফত মিনহাস ও সামির মিনহাসের মধ্যে। আজ তাঁরা পাকিস্তানের ক্রিকেটে নিজেদের পরিচিতি তৈরি করছেন। আর মাঠের ধারে ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে তাঁদের উত্থান, সাফল্য, ব্যর্থতা—সব মুহূর্ত ফ্রেমবন্দি করছেন বাবা কাশিফ। এক সময় যে ক্রিকেট থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি, সেই ক্রিকেটই এখন তাঁর পরিবারের সবচেয়ে বড় আনন্দের উৎস। ছেলেদের খেলা দেখতে গিয়ে কখনও আবেগ ধরে রাখতে পারেন না তিনি। পেশাদার আলোকচিত্রী হিসেবে হাজার হাজার ক্রিকেটারের ছবি তুললেও নিজের ছেলেদের ক্ষেত্রে আবেগের সঙ্গে লড়াই করতে হয় তাঁকে।
চলতি বছরের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে একটি এক দিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে খেলছিলেন আরাফত। জীবনের তৃতীয় এক দিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নেমেছিলেন পাকিস্তানের এই অলরাউন্ডার। লাহৌরের গদ্দাফি স্টেডিয়ামে সীমানার ধারে ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়েছিলেন কাশিফ। ছেলের ব্যাটিংয়ের ছবি তুলছিলেন তিনি। কিন্তু আরাফত আউট হতেই মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় তাঁর মুখের অভিব্যক্তি। ক্যামেরা নামিয়ে মাথা নিচু করে ফেলেন তিনি। সম্প্রচারকারী সংস্থার ক্যামেরায় ধরা পড়ে সেই দৃশ্য। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সেই ছবি। কাশিফ বলেন, ‘আমি ওর ছবি তুলছিলাম। ও আউট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরার উপর হাত রেখে মাথা নিচু করে ফেলেছিলাম। টেলিভিশনের ক্যামেরায় সেই প্রতিক্রিয়া ধরা পড়ে যায়। তার পরেই ছবিটা ভাইরাল হয়ে যায়।’
পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, সম্প্রচারকারীরা তাঁকে প্রায়ই ক্যামেরায় দেখাতে শুরু করেন। কাশিফ জানিয়েছেন, তিনি চাননি জনসমক্ষে বার বার তাঁকে দেখানো হোক। তিনি বলেন, ‘ওরা জানে আমি ওর বাবা। তাই প্রায়ই আমার দিকে ক্যামেরা ঘুরিয়ে দেয়। আমি পরিচালকের কাছে অনুরোধও করেছিলাম, যেন আমাকে দেখানো না হয়। সবার সামনে আসতে চাইনি।’
কাশিফের এই প্রতিক্রিয়া ক্রিকেটপ্রেমীদের মন ছুঁয়ে গেলেও, তার পরে তাঁকে ঘিরে কিছু ভুল ধারণাও তৈরি হয়েছিল। অনেকে মনে করেছিলেন, আর্থিক সমস্যার কারণে ছেলেদের ক্রিকেটের খরচ জোগাতে তিনি ছবি তোলার কাজ শুরু করেছেন। সেই দাবি একেবারে উড়িয়ে দিয়েছেন কাশিফ। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আমাদের ১৯৮০ সাল থেকে গাড়ির ব্যবসা রয়েছে। মুলতানে আমার বড় গাড়ির শোরুম আছে। জাপান থেকে গাড়ি আমদানি করি। ছেলেদের ক্রিকেটের খরচ চালানোর জন্য আমাকে কখনও ছবি তোলার কাজ করতে হয়নি। ছবি তোলা আমার শখ।’
কাশিফ নিজেও এক সময় ক্রিকেট খেলতেন। মুলতানে নিজের আঞ্চলিক দলের হয়ে খেলেছেন তিনি। কিন্তু তাঁর বাবা চেয়েছিলেন, ছেলে ক্রিকেট ছেড়ে পরিবারের ব্যবসায় মন দিক। সেই সময় কাশিফকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘আমার বাবা আমাকে ক্রিকেট ছেড়ে পরিবারের ব্যবসায় মন দিতে বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ক্রিকেট ছাড়তে হবে, নয়তো বাড়ি ছাড়তে হবে। আমি দু’-তিন দিনের জন্য বাড়ি ছেড়েও চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু তার পরে মা আমাকে ফিরে আসতে এবং ক্রিকেট ছেড়ে দিতে বলেন। মায়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে কিছুই ছিল না। তাই ক্রিকেট ছেড়ে দিই।’
নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে না পারার আক্ষেপ থাকলেও, ছেলেদের ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটতে দিতে চাননি তিনি। সেই সিদ্ধান্তের সূত্রপাত একটি সাধারণ ঘটনা থেকে। বাড়ির গাড়ি রাখার জায়গায় টেনিস বলে ক্রিকেট খেলছিল আরাফত ও সামির। তখন আরাফতের বয়স ন’ বছর, সামিরের সাত। দুই ভাইয়ের ব্যাটিং দেখে অবাক হয়ে যান বাবা। কাশিফের কথায়, ‘ওদের খেলতে দেখে আমি সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পেরেছিলাম, ওদের মধ্যে বিশেষ কিছু রয়েছে। আমার সঙ্গে যা ঘটেছিল, তা ওদের সঙ্গে ঘটুক, সেটা চাইনি। আমি চেয়েছিলাম, ওরা যেন ক্রিকেট খেলার সুযোগ পায়।’
এর পরেই দুই ছেলেকে স্থানীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করান তিনি। সেখানে পেস বোলিংয়ের বিরুদ্ধে তাঁদের ব্যাটিং দেখে আরও উৎসাহিত হন। আরাফত প্রথমে অনূর্ধ্ব-১৩ প্রতিযোগিতায় নজর কাড়েন। তার পরে অনূর্ধ্ব-১৬ এবং অনূর্ধ্ব-১৯ স্তর পেরিয়ে পাকিস্তানের জাতীয় দলে জায়গা করে নেন। তাঁর পথ অনুসরণ করে এগিয়ে যান সামির।
আরাফত ইতিমধ্যেই পাকিস্তানের হয়ে পাঁচটি এক দিনের আন্তর্জাতিক এবং সাতটি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। অলরাউন্ডার হিসেবে তাঁর প্রতিভার পরিচয় মিলেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও। অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একটি করে ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়ার নজির রয়েছে তাঁর।
অন্য দিকে, বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে সামিরের ব্যাটিং নজর কেড়েছে ক্রিকেটবিশ্বের। ২০২৫ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপের ফাইনালে ভারতের বিরুদ্ধে ১১৩ বলে ১৭২ রানের অসাধারণ ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। সেই ইনিংস পাকিস্তানের তরুণ ক্রিকেটার হিসেবে তাঁর প্রতিভাকে আরও বড় মঞ্চে তুলে ধরে। তবে কাশিফের কাছে শুধু এই দুই ছেলেই সব নয়। তাঁর তৃতীয় ছেলে আবদুল্লা মিনহাসও ক্রিকেটে নিজের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করছেন। বাঁহাতি টপ অর্ডার ব্যাটার হওয়ার পাশাপাশি তিনি ডানহাতি লেগ স্পিনও করেন। অনূর্ধ্ব-১৭ স্তরে সুযোগ পেয়েছেন আবদুল্লা।
কাশিফ বলেন, ‘বিশ্ব এখনও আমার তৃতীয় ছেলে আবদুল্লাকে চেনে না। ওর মধ্যেও প্রচুর প্রতিভা রয়েছে। বাঁহাতি টপ অর্ডার ব্যাটার এবং ডানহাতি লেগ স্পিনার হিসেবে ও খেলছে। অনূর্ধ্ব-১৭ স্তরে নির্বাচিত হয়েছে। কঠোর পরিশ্রম করছে।’
ছেলেদের ক্রিকেটজীবন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাশিফকে বহু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। কখনও অনুশীলনের জন্য তাঁদের সঙ্গে অন্যত্র থাকতে হয়েছে, কখনও আবার ব্যবসার কাজ সামলাতে হয়েছে। এক বার ছেলেদের অনুশীলনের জন্য বাইরে থাকার সময়ই নিজের বাবার মৃত্যুসংবাদ পেয়েছিলেন তিনি। তবু ক্রিকেটের প্রতি ছেলেদের আগ্রহ কমতে দেননি। তিনি বলেন, ‘ক্রিকেটে সফল হতে গেলে প্রচুর নিষ্ঠা দরকার। অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। ছেলেদের অনুশীলনের জন্য বাইরে ছিলাম, তখন বাবার মৃত্যুর খবর পাই। তাঁর মৃত্যুর পরে আমাকে অফিসের কাজে অনেকটা সময় দিতে হয়েছিল। কিন্তু মুলতানের বাইরে ওদের ম্যাচ থাকলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠে বসে থাকতাম।’
ছেলেদের উপর কখনও অযথা চাপ তৈরি করেননি কাশিফ। খারাপ খেললে তাঁদের উৎসাহ দিয়েছেন, বুঝিয়েছেন যে একটা দিন খারাপ যেতেই পারে। তাঁর কাছে ক্রিকেট শুধু ফলাফল বা রানের হিসাব নয়, বরং দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও ধৈর্যের পরীক্ষা। তিনি আরও বলেন, ‘আমি কখনও ওদের উপর কঠোর হইনি। ওরা ভালো খেলতে না পারলে বলতাম, আজ হয়ত দিনটা তোমাদের ছিল না। তোমাদের সময়ও আসবে। পরের সুযোগের জন্য তৈরি থাকতে হবে। আমি কখনও চাইনি, ওদের উপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি হোক।’ তবে বাবার একটি বড় স্বপ্ন এখনও অপূর্ণ। তিনি চান, তাঁর ছেলেরা এক দিন পাকিস্তানের হয়ে আইসিসির কোনও ট্রফি জিতুক। কাশিফের কথায়, ‘আমার ছেলেরা যখন দেশের হয়ে আইসিসির ট্রফি জিতবে, তখন আমি আরও বেশি খুশি হব।’
পাকিস্তানের হয়ে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক স্তরে পরিবারের একাধিক সদস্যের প্রতিনিধিত্ব করার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে মিনহাস পরিবারে। তবে পাকিস্তান ভেটেরান্স ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের হয়ে ওভার-৫০ দলের সদস্য হিসেবে ভারতে আয়োজিত আন্তর্জাতিক মাস্টার্স ক্রিকেট বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাননি কাশিফ। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড দলকে ভারতে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। আগের সংস্করণে শ্রীলঙ্কায় প্রতিযোগিতাটি জিতেছিল পাকিস্তান। এ বার সেই দলে থাকার সুযোগ হারালেন কাশিফ। তবু তিনি হতাশায় ভেঙে পড়েননি। তাঁর আশা, ভবিষ্যতে আবার দেশের হয়ে খেলার সুযোগ পাবেন।
নিজের ক্রিকেটজীবন বাবার আপত্তিতে থেমে গেলেও, ছেলেদের স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াননি কাশিফ। বরং তাঁদের পাশে থেকে নিশ্চিত করেছেন, তাঁরা যেন নিজেদের প্রতিভা মেলে ধরার সুযোগ পান। আজ তাঁর ক্যামেরায় ধরা পড়ছে ছেলেদের জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। কখনও আনন্দ, কখনও হতাশা, কখনও সাফল্যের উচ্ছ্বাস। ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি কাশিফের। কিন্তু ছেলেদের চোখ দিয়ে সেই স্বপ্নকেই নতুন করে দেখতে পাচ্ছেন তিনি। আর সেই যাত্রায় তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়তো কোনও ট্রফি নয়—দুই ছেলেকে নিজেদের স্বপ্নের পথে এগিয়ে যেতে দেখা।
উৎস: টাইমস অফ ইন্ডিয়া পোর্টাল
প্রতিবেদনের ধরন: সংবাদসংস্থা




