কলকাতা, নিউজ ডেস্ক: জেলের ভিতরে বন্দি, বাইরে কড়া পাহারা। আর সেই পাহারার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা হাই সিকিউরিটি সেলেই মিলল একের পর এক ইলেকট্রনিক ডিভাইস! প্রেসিডেন্সি কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে জঙ্গি আফতাব আনসারির সেল থেকে উদ্ধার হয়েছে একাধিক মোবাইল ফোন, তার মধ্যে একটি আইফোনও রয়েছে। সঙ্গে মিলেছে দু’টি রাউটার, পেনড্রাইভ, কার্ড রিডার, ওটিজি কেবল এবং অ্যাডাপ্টার। একসঙ্গে এতগুলি যোগাযোগ ও তথ্য আদানপ্রদানের সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, জেলের অন্দরে নিরাপত্তার ফাঁকটা ঠিক কোথায়?
গত ১৩ অগস্ট প্রেসিডেন্সি জেলে বিশেষ তল্লাশি চালানো হয়। সেই তল্লাশিতেই আফতাবের সেল থেকে ওই সরঞ্জামগুলি উদ্ধার হয়েছে বলে খবর। ঘটনাটি যে কোনও সাধারণ বন্দির সেল থেকে মোবাইল উদ্ধারের মতো নয়। কারণ, আফতাব আনসারি প্রেসিডেন্সি জেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাই সিকিউরিটি বন্দি। ২০০২ সালে কলকাতার আমেরিকান সেন্টারে জঙ্গি হামলার মামলায় তাঁর নাম অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত হিসাবে উঠে এসেছিল। সেই মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের সাজাও রয়েছে। ফলে এমন এক বন্দির সেল থেকে একাধিক ফোন এবং নেটওয়ার্ক-সংক্রান্ত সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশ্ন আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর ধরন। একটি বা দু’টি মোবাইল ফোনের পাশাপাশি রয়েছে আইফোন, দু’টি রাউটার, পেনড্রাইভ, কার্ড রিডার এবং ওটিজি কেবল। অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু গোপনে ফোন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল কি না, তা নিয়েও তদন্তকারীদের সামনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ফোনগুলিতে কী ধরনের তথ্য রয়েছে, কোন নম্বরে যোগাযোগ করা হয়েছে, ইন্টারনেট ব্যবহার করা হয়েছিল কি না—সবই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আর এখানেই সামনে আসছে আরও বড় প্রশ্ন—জেলের ভিতরে এই ডিভাইসগুলি ঢুকল কী ভাবে? সাধারণত হাই সিকিউরিটি বন্দিদের ক্ষেত্রে তল্লাশি ও নজরদারি অন্য বন্দিদের তুলনায় অনেক বেশি কড়া থাকে। সেখানে একসঙ্গে এতগুলি নিষিদ্ধ ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম পৌঁছে যাওয়া মানে নিরাপত্তার একাধিক স্তরে ফাঁক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাইরে থেকে কোনও ব্যক্তি সরবরাহ করেছিল? জেলের ভিতরের কারও সাহায্য মিলেছিল? নাকি অন্য কোনও পথে ধাপে ধাপে ঢুকেছিল সরঞ্জামগুলি? সেই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
আফতাবকে ঘিরে জেলের ভিতর থেকে যোগাযোগের অভিযোগ অবশ্য অতীতেও উঠেছে। জেলবন্দি অবস্থায় বিদেশে থাকা তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগও প্রকাশ্যে এসেছিল। ফলে এ বার তাঁর সেল থেকে এতগুলি যোগাযোগ-সহায়ক যন্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় পুরনো অভিযোগগুলিও নতুন করে তদন্তের পরিধিতে আসতে পারে।
ঘটনার পর হেস্টিংস থানায় আফতাবের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ফোন এবং অন্যান্য ডিভাইসের ফরেন্সিক পরীক্ষা করানো হতে পারে। বিশেষ করে কল লগ, মেসেজ, যোগাযোগের তালিকা, ইন্টারনেট ব্যবহারের তথ্য এবং ডিভাইসগুলিতে থাকা ডেটা খতিয়ে দেখে তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন—জেলের চার দেওয়ালের মধ্যে বসে আফতাব ঠিক কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন?
প্রেসিডেন্সি জেলে এর আগেও বন্দিদের কাছ থেকে মোবাইল উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। সেই কারণে জেল কর্তৃপক্ষের নজরদারি এবং তল্লাশি ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়। কিন্তু এ বার যে জায়গা থেকে উদ্ধার হয়েছে, সেটিই ঘটনাকে আলাদা মাত্রা দিচ্ছে। কারণ, অভিযুক্ত সাধারণ বন্দি নন—জঙ্গি হামলার মামলায় দণ্ডিত এক হাই সিকিউরিটি বন্দি।
ফলে তদন্ত এখন শুধু মোবাইল উদ্ধারের ঘটনায় আটকে নেই। নজর রয়েছে ‘মোবাইল ঢোকার পথ’ এবং ‘মোবাইল ব্যবহারের নেটওয়ার্ক’—দুই দিকেই। সেই পথের সন্ধান মিললে শুধু প্রেসিডেন্সি জেলের নিরাপত্তার গলদই প্রকাশ্যে আসবে না, জেলের অন্দর থেকে বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে আফতাবের যোগাযোগের কোনও বড় সূত্রও সামনে আসতে পারে।