নয়াদিল্লি: সমাজমাধ্যমে নতুন ইনিংস শুরু করলেন কংগ্রেসের প্রবীণ নেত্রী সনিয়া গান্ধী। বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ইনস্টাগ্রামে আত্মপ্রকাশ করলেন তিনি। আর প্রথম পোস্টেই নিজের আসন্ন আত্মজীবনী ‘বিলংগিং: আ জার্নি অফ লাভ’-এর ঝলক তুলে ধরলেন সনিয়া। ব্যক্তিগত জীবন, প্রেম, পরিবার, শোক এবং রাজনীতির দীর্ঘ পথচলা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবনের নানা অধ্যায় উঠে আসতে চলেছে এই বইয়ে। ফলে সনিয়ার ইনস্টাগ্রামে যোগ দেওয়ার ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে বইপ্রেমীদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
সনিয়ার প্রথম পোস্টে রয়েছে একটি ভিডিয়ো, যেখানে তাঁর আসন্ন আত্মজীবনীকে সামনে আনা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রকাশ্যে খুব বেশি কথা বলতে দেখা যায়নি তাঁকে। এ বার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির কথা পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে চলেছেন কংগ্রেসের এই নেত্রী। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী তিনি। সেই অভিজ্ঞতার ব্যক্তিগত বয়ানই বইটির অন্যতম আকর্ষণ হতে চলেছে।
১০ নভেম্বর প্রকাশিত হবে আত্মজীবনী
সনিয়ার আত্মজীবনী ‘বিলংগিং: আ জার্নি অফ লাভ’ প্রকাশিত হওয়ার কথা আগামী ১০ নভেম্বর। বইটির আন্তর্জাতিক সংস্করণ প্রকাশ করবে মার্কিন প্রকাশনা সংস্থা আলফ্রেড এ নফ। ভারতে বইটি প্রকাশের দায়িত্ব নিয়েছে হার্পারকলিন্স ইন্ডিয়া। প্রথমে ভারতে বইটি প্রকাশ করার কথা ছিল পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়ার। কিন্তু পাণ্ডুলিপির কিছু অংশে সম্পাদনা এবং কয়েকটি বিষয় বাদ দেওয়া নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হওয়ায় সেই চুক্তি আর এগোয়নি। পরে হার্পারকলিন্স বইটি প্রকাশের দায়িত্ব নেয়।
বইটি ঘিরে আগেই রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। কারণ, এতে শুধু সনিয়ার ব্যক্তিগত জীবনের কথা নয়, নেহরু-গান্ধী পরিবারের অন্তরঙ্গ অভিজ্ঞতা এবং ভারতের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অধ্যায়ও উঠে আসার কথা। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শাসনকাল, আরএসএসের ভূমিকা, সাম্প্রদায়িক সংঘাত এবং সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতির মতো বিষয় নিয়ে পাণ্ডুলিপির সম্পাদনা ঘিরে প্রকাশকের সঙ্গে মতপার্থক্যের খবর সামনে এসেছিল। যদিও প্রকাশনা সংক্রান্ত বিরোধের সব দিক নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির বক্তব্য এক নয়।
ইতালির ছোট শহর থেকে ভারতের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু
ইতালিতে জন্ম সনিয়ার। তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় ১৯৬৫ সালে, কেমব্রিজে পড়াশোনার সময় রাজীব গান্ধীর সঙ্গে পরিচয়ের পর। সেই পরিচয় ধীরে ধীরে প্রেমে পরিণত হয়। পরে রাজীবকে বিয়ে করে ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হয়ে ওঠেন সনিয়া। বিদেশের ছোট শহরে কাটানো শৈশব থেকে ভারতীয় সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনযাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া—এই যাত্রার নানা অভিজ্ঞতা আত্মজীবনীতে উঠে আসতে পারে।
রাজীব গান্ধীর সঙ্গে সংসার করার সময় দীর্ঘদিন রাজনীতি থেকে দূরেই থাকতে চেয়েছিলেন সনিয়া। কিন্তু একের পর এক ব্যক্তিগত বিপর্যয় তাঁর জীবনকে আমূল বদলে দেয়। ১৯৮০ সালে রাজীবের ভাই সঞ্জয় গান্ধীর বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু, ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড এবং ১৯৯১ সালে রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ড—এই ঘটনাগুলি শুধু গান্ধী পরিবার নয়,
ভারতের রাজনীতির ইতিহাসেও গভীর ছাপ ফেলেছিল। স্বামীর মৃত্যুর পর সনিয়ার ব্যক্তিগত জীবন এবং রাজনৈতিক অবস্থান, দু’টিই নতুন মোড় নেয়।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার কাহিনিও কি থাকবে?
২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসার পর সনিয়া গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী করার দাবি উঠেছিল। কিন্তু তিনি সেই পদ গ্রহণ করেননি। পরিবর্তে দলের নেতৃত্ব এবং সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন করার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেন। কেন তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেননি, সেই সিদ্ধান্তের পিছনে কী ভাবনা কাজ করেছিল—আত্মজীবনীতে তারও ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে বলে প্রত্যাশা।
সনিয়া নিজেই জানিয়েছেন, নিজের জীবন নিয়ে লেখা তাঁর কাছে সহজ ছিল না। বহু স্মৃতি, অনুভূতি এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এত দিন নিজের মধ্যেই ধরে রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পিছন ফিরে তাকিয়ে তাঁর জীবনের নানা অধ্যায়ে প্রেম, পরিবার, আনুগত্য এবং শোকের ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ইনস্টাগ্রামে নতুন অধ্যায়, নজর বইয়ের দিকে
রাজনীতিতে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও সনিয়া গান্ধী বরাবরই ব্যক্তিগত পরিসরকে আড়ালে রাখতে পছন্দ করেছেন। তাই ইনস্টাগ্রামে তাঁর আত্মপ্রকাশ এবং আত্মজীবনী নিয়ে প্রচার—দু’টিই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এই বইয়ের মাধ্যমে গান্ধী পরিবারের বহুল আলোচিত ইতিহাসের পাশাপাশি এমন কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সামনে আসতে পারে, যা এত দিন জনসমক্ষে বিস্তারিত ভাবে আসেনি।
তবে বইটি প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত তার সমস্ত বক্তব্য বা বিতর্কিত অধ্যায়ের বিষয়বস্তু সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। আগামী ১০ নভেম্বর আত্মজীবনী প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে, সনিয়া গান্ধী তাঁর জীবনের কোন কোন অজানা অধ্যায় পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছেন।





