জলপাইগুড়ি, নিউজ ডেস্ক: অপেক্ষার অবসান কি এ বার সত্যিই? দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যে বক্সার জঙ্গল বাঘশূন্য, সেখানে ফের শোনা যাবে বাঘের গর্জন! সব ঠিক থাকলে আগামী ২ অক্টোবর বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পে প্রথম বাঘ ছাড়া হবে। ইতিমধ্যেই জঙ্গলের ভিতরে বাঘের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা তৈরি করে ফেলেছে বন দফতর। তৈরি হয়েছে বিশেষ এনক্লোজার। বাঘ কোথায় থাকবে, কী ভাবে তাকে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া হবে, নিরাপত্তা এবং নজরদারির ব্যবস্থা কতটা উপযুক্ত—সব খতিয়ে দেখতে চলতি সপ্তাহেই বক্সায় আসছে কেন্দ্রীয় ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি (NTCA)-র দল।
রাজ্যের বন ও পরিবেশমন্ত্রী মনোজ কুমার ওরাওঁ জানিয়েছেন, বক্সায় বাঘ ফেরানোর প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে। তাঁর কথায়, ‘‘বাঘমামা আসছেন। তাঁর জন্য আমরা সব রকম প্রস্তুতি নিয়েছি। প্রাথমিক ভাবে একটি বাঘ আনা হবে। পরে আরও একটি বাঘ আনার পরিকল্পনা রয়েছে।’’ বন দফতর সূত্রে খবর, প্রথম পর্যায়ে একটি বাঘ আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সম্ভাব্য উৎস হিসেবে উঠে আসছে বিহারের বাল্মিকী টাইগার রিজার্ভ। পরবর্তী পর্যায়ে অসমের মানস ন্যাশনাল পার্ক থেকেও একটি বাঘ আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কোন জঙ্গল থেকে প্রথম বাঘটি আসবে, তা এখনও চূড়ান্ত নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এবং কেন্দ্রীয় দলের পরিদর্শনের পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বক্সার জঙ্গলে যে এলাকায় বাঘ রাখা হবে, সেই জায়গাটি ইতিমধ্যেই পরিদর্শন করেছেন বন দফতরের শীর্ষ আধিকারিকেরা। মন্ত্রী মনোজ কুমার ওরাওঁয়ের সঙ্গে ছিলেন বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের ফিল্ড ডিরেক্টর কুমার বিমল, ডেপুটি ফিল্ড ডিরেক্টর দেবাশিস শর্মা, হরিকৃষ্ণন পিজে-সহ অন্য আধিকারিকেরা। বাঘের জন্য তৈরি এনক্লোজার, আশপাশের জঙ্গল এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা তাঁরা খতিয়ে দেখেছেন। তবে বাঘের জন্য ‘ঘর’ তৈরি করাই শেষ কথা নয়। নতুন জঙ্গলে একটি বাঘকে ছাড়ার আগে দেখতে হয় তার চারপাশে পর্যাপ্ত জল, শিকার এবং নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র রয়েছে কি না। সেই সঙ্গে বাঘটি যাতে মানুষের বসতিতে ঢুকে না পড়ে, তার জন্য জঙ্গলের সীমানা, সম্ভাব্য চলাচলের পথ এবং নজরদারি ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। NTCA-র কেন্দ্রীয় দল মূলত এই বিষয়গুলিই খতিয়ে দেখবে বলে বন দফতর সূত্রে খবর।
যে জঙ্গলে এক সময় ছিল বাঘের অবাধ বিচরণ
বক্সায় বাঘ ফেরানোর উদ্যোগকে শুধু নতুন করে বাঘ ছাড়ার কর্মসূচি হিসাবে দেখছে না বন দফতর। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসও। আলিপুরদুয়ারের বক্সা এক সময় বাঘের অন্যতম বিচরণক্ষেত্র ছিল। সুন্দরবনের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের এই জঙ্গলেও বাঘের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে নানা কারণে বক্সা থেকে বাঘের উপস্থিতি কার্যত হারিয়ে যায়।
দীর্ঘদিন ধরে বক্সায় বাঘের অস্তিত্ব নিয়ে নানা জল্পনা থাকলেও নিশ্চিত ভাবে স্থায়ী বাঘের জনসংখ্যা তৈরি হয়নি। এর পর থেকেই বক্সায় ফের বাঘ ফিরিয়ে আনার দাবি জোরালো হয়। বিভিন্ন সময়ে পরিকল্পনা করা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরিকাঠামো তৈরির কাজ শুরু হলেও কেন্দ্রীয় অনুমোদন-সহ একাধিক কারণে বাঘ আনার প্রক্রিয়া এগোয়নি। এ বার সেই জটিলতা অনেকটাই কেটেছে বলে বন দফতরের দাবি।
মন্ত্রী বদলের পর গতি
রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পরে বন ও পরিবেশ দফতরের দায়িত্ব পান আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রামের বিধায়ক মনোজ কুমার ওরাওঁ। বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প তাঁর বিধানসভা এলাকার কাছেই। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বক্সায় বাঘ ফেরানোর বিষয়ে সক্রিয় হন তিনি। বন দফতরের আধিকারিকদের নিয়ে একাধিক বৈঠক এবং পরিদর্শনের পর বাঘের সম্ভাব্য আবাসস্থল চূড়ান্ত করার কাজ এগোয়। জঙ্গলের ভিতরে নির্দিষ্ট এলাকায় এনক্লোজ়ার তৈরির পাশাপাশি বাঘ আনার পর তার পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রী জানিয়েছেন, আপাতত একটি বাঘ আনা হবে। নতুন পরিবেশে তার আচরণ এবং মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করা হবে। তার পরে ধাপে ধাপে আরও বাঘ আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ বক্সায় বাঘের প্রত্যাবর্তন?
বাঘ একটি জঙ্গলের খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে থাকা প্রাণী। ফলে কোনও ব্যাঘ্র প্রকল্পে বাঘের উপস্থিতি শুধু পর্যটনের আকর্ষণ নয়, গোটা বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যের সঙ্গেও জড়িত। পর্যাপ্ত শিকারভিত্তি এবং সুস্থ বনভূমি থাকলে বাঘের মতো শীর্ষ শিকারির উপস্থিতি সেই বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। বক্সায় বাঘ ফিরলে পর্যটনের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। ডুয়ার্সের জঙ্গল এমনিতেই পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। জলদাপাড়া, গরুমারা, বক্সা—উত্তরবঙ্গের এই অরণ্যগুলির মধ্যে বক্সার আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। তার সঙ্গে যদি বাঘের উপস্থিতি যুক্ত হয়, তা হলে পর্যটনের পরিধি আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তবে বাঘ ফেরানোর সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। বক্সার জঙ্গলের আশপাশে রয়েছে একাধিক গ্রাম ও মানুষের বসতি। বাঘ নতুন পরিবেশে ছাড়া হলে তার চলাচল কোন দিকে হয়, তা নজরে রাখা অত্যন্ত জরুরি। মানুষ-বন্যপ্রাণ সংঘাত এড়ানোই হবে বন দফতরের অন্যতম বড় পরীক্ষা। তাই বাঘের গতিবিধি নজরে রাখতে ক্যামেরা ট্র্যাপ, নিয়মিত পেট্রোলিং এবং প্রয়োজনীয় নজরদারি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার দিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাঘটি নতুন পরিবেশে কতটা স্বচ্ছন্দে রয়েছে, শিকার ধরতে পারছে কি না, তার শারীরিক অবস্থাই বা কেমন—সবই নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।
প্রথমে এক, লক্ষ্য আরও
বন দফতরের পরিকল্পনা আপাতত ধাপে ধাপে এগোনোর। প্রথমে একটি বাঘ। তার পরে আরও একটি। অর্থাৎ রাতারাতি বক্সাকে বাঘে ভরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নয়। বরং নতুন করে একটি বাঘের জনসংখ্যা গড়ে তোলার জন্য ধীরে এবং পরিকল্পিত ভাবে এগোতে চাইছে রাজ্য। এখন অবশ্য সব নজর কেন্দ্রীয় দলের পরিদর্শনের দিকে। বাঘের জন্য তৈরি ‘ঘর’ কতটা নিরাপদ, জঙ্গলের পরিবেশ উপযুক্ত কি না, পর্যাপ্ত শিকার রয়েছে কি না—সবুজ সঙ্কেত মিললেই পরবর্তী ধাপ শুরু হবে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর তাই বক্সার জঙ্গলে এখন নতুন উত্তেজনা। ঘর তৈরি, প্রস্তুত বন দফতর। বাকি শুধু অতিথির আসা। কেন্দ্রীয় দলের ছাড়পত্র মিললে আগামী ২ অক্টোবর সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন—বক্সার জঙ্গলে আবার ফিরবে বাঘ।