নয়াদিল্লি: রাশিয়ার কাছ থেকে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কেনা দেশগুলির উপর বিপুল শুল্ক চাপানোর পথ খুলে দিয়েছিল আমেরিকার নতুন আইন। লক্ষ্য ছিল, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর জন্য মস্কোর আর্থিক জোগান কমানো এবং রুশ জ্বালানি কেনা দেশগুলির উপর চাপ তৈরি করা। সেই আইনে সই করার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অবস্থান বদলালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাশিয়া সংক্রান্ত একাধিক নিষেধাজ্ঞা, বিধিনিষেধ ও অতিরিক্ত শুল্ক আপাতত কার্যকর না করার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। তাতে বড়সড় স্বস্তি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে ভারত ও চিনের মতো দেশগুলির জন্য, যারা রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কেনে। তবে এই সিদ্ধান্তকে রাশিয়ার উপর থেকে আমেরিকার সমস্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বলে দেখার অবকাশ নেই। ট্রাম্পের নির্দেশে গ্রাহাম আইনের একাধিক ধারায় ছাড় দেওয়া হলেও, আগে থেকে কার্যকর থাকা রুশ নিষেধাজ্ঞাগুলি বহাল রয়েছে।
১৬ অক্টোবর জারি করা এক নির্বাহী নির্দেশে ট্রাম্প জানান, আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করেই তিনি নতুন আইনের আওতায় নির্দিষ্ট কিছু শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধ প্রয়োগ থেকে আপাতত বিরত থাকছেন। কংগ্রেসের কাছে এই সিদ্ধান্তের পক্ষে প্রয়োজনীয় শংসাপত্র ও ব্যাখ্যা জমা দেওয়ার কথাও নির্দেশে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে রাশিয়ার জ্বালানি কেনা দেশগুলির বিরুদ্ধে নতুন করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকর করার ক্ষেত্রে আপাতত বিরতি এল। কিন্তু এই ছাড় কত দিন বজায় থাকবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গিয়েছে। নির্দেশ অনুযায়ী, পরিস্থিতি বিবেচনা করে ভবিষ্যতে আবার পদক্ষেপ করার সুযোগ থাকবে মার্কিন প্রশাসনের হাতে।
কী রয়েছে গ্রাহাম আইনে?
প্রয়াত মার্কিন সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে তৈরি ‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট, ২০২৬’ আইনে পরিণত হয় ১৮ সেপ্টেম্বর। ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো এবং মস্কোর সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া দেশগুলিকে শাস্তির আওতায় আনার উদ্দেশ্যেই এই আইন তৈরি করা হয়েছিল।
আইনটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থান অনুযায়ী, রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সবচেয়ে বড় পাঁচ আমদানিকারক দেশের পণ্য আমেরিকায় প্রবেশের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে এই ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয় নয়। রাশিয়ার জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে এবং প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই তা কার্যকর হওয়ার কথা। রাশিয়ার তেল কেনা বা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে মস্কোকে সাহায্য করার অভিযোগে অন্য দেশগুলির বিরুদ্ধেও শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যবস্থা রয়েছে আইনে।
রাশিয়া থেকে আমেরিকায় সরাসরি আমদানি করা পণ্যের উপর ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বাড়ানোর সংস্থানও রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, আইনের লক্ষ্য শুধু মস্কোকে শাস্তি দেওয়া নয়; রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে অন্য দেশগুলির উপরও অর্থনৈতিক চাপ তৈরির সুযোগ রাখা হয়েছে। ভারত ও চিন এই পরিস্থিতিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশই রাশিয়ার বড় জ্বালানি ক্রেতা। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞার জেরে রাশিয়া তুলনামূলক কম দামে অপরিশোধিত তেল বিক্রির দিকে ঝুঁকেছিল। ভারতীয় শোধনাগারগুলিও সেই সুযোগে রুশ তেল আমদানি বাড়ায়। ফলে নতুন আইনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকর হলে ভারতীয় পণ্য রফতানি এবং জ্বালানি আমদানি—দুই ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা বাড়তে পারত।
ভারতের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত?
ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টি শুধু রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়তে পারে দেশের আমদানি খরচ, বাণিজ্য ঘাটতি, মুদ্রাস্ফীতি এবং পরিবহণ ব্যয়ের উপর। রাশিয়ার কাছ থেকে তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে তেল পাওয়ার সুযোগ কমে গেলে ভারতকে বিকল্প সরবরাহকারীদের দিকে তাকাতে হতে পারে। তাতে দাম, পরিবহণ ও সরবরাহের শর্ত নতুন করে হিসাব করতে হবে। অন্যদিকে, ভারতীয় পণ্যের উপর আমেরিকা অতিরিক্ত শুল্ক চাপালে ওষুধ, বস্ত্র, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য এবং অন্যান্য রফতানি ক্ষেত্রের উপর চাপ তৈরি হতে পারত। আমেরিকা ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রফতানি বাজার হওয়ায় শুল্কের অনিশ্চয়তা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নতুন আইনের আওতায় শাস্তিমূলক শুল্ক কার্যকর না করার সিদ্ধান্ত ভারতীয় অর্থনীতির জন্য স্বস্তির বার্তা।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য সম্পর্কের সমস্ত সমস্যা মিটে গেল। গ্রাহাম আইনের বাইরেও দুই দেশের মধ্যে শুল্ক, বাজারে প্রবেশের সুযোগ এবং বাণিজ্যনীতি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন রয়েছে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নির্দেশে নতুন আইনের নির্দিষ্ট ব্যবস্থাগুলিতে ছাড় দেওয়া হয়েছে; অন্য কোনও আইনের অধীনে আরোপিত শুল্ক বা নিষেধাজ্ঞা স্বয়ংক্রিয় ভাবে উঠে যায়নি। চিনের ক্ষেত্রেও একই ভাবে স্বস্তির সম্ভাবনা রয়েছে। রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যে বেজিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নতুন আইনের কঠোর প্রয়োগ হলে চিনা পণ্যের উপর অতিরিক্ত শুল্কের ঝুঁকি তৈরি হতে পারত। আপাতত সেই আশঙ্কা কিছুটা কমলেও ভবিষ্যতে আমেরিকা কী অবস্থান নেয়, তা নির্ভর করবে দুই দেশের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের উপর।
রাশিয়ার উপর কি চাপ কমল?
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ফলে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া দেশগুলির বিরুদ্ধে নতুন আইনের আওতায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকর করার ক্ষেত্রে আপাতত বিরতি এল। এতে মস্কোর তেল বিক্রির বাজার ধরে রাখার সুযোগ কিছুটা বাড়তে পারে। কারণ, ভারত ও চিনের মতো বড় ক্রেতারা নতুন করে মার্কিন শুল্কের আশঙ্কা ছাড়াই বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা পাচ্ছে। তবে রাশিয়ার উপর আমেরিকার সমস্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়নি। ট্রাম্পের নির্দেশেই স্পষ্ট করা হয়েছে, রুশ সরকারের নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের কারণে আগে জারি হওয়া নির্বাহী নির্দেশ ও তার আওতায় আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলি এই ছাড়ের ফলে বাতিল হচ্ছে না। অর্থাৎ, নতুন আইনের কিছু বিধান প্রয়োগ না করার সিদ্ধান্ত এবং রাশিয়ার উপর থেকে সামগ্রিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া—দুটি আলাদা বিষয়।
এখানেই ট্রাম্পের নীতির জটিলতা। এক দিকে, ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য রাশিয়ার আর্থিক জোগান কমাতে নতুন আইনকে সমর্থন করেছেন তিনি। অন্য দিকে, সেই আইনের কিছু কঠোর ব্যবস্থা আপাতত কার্যকর না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফলে ওয়াশিংটনের রাশিয়া নীতিতে চাপ সৃষ্টি ও কূটনৈতিক নমনীয়তা—দুই প্রবণতাই পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে। জ্বালানির দাম, আমেরিকার স্বার্থ এবং রাজনৈতিক হিসাব ট্রাম্প তাঁর নির্দেশে সিদ্ধান্তটিকে আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপও এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপট বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। রুশ তেলের উপর নির্ভরশীল দেশগুলিকে শাস্তি দিতে গিয়ে যদি আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে কিংবা জ্বালানির দাম বেড়ে যায়, তা হলে তার প্রভাব আমেরিকার অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
ডিজেলের দাম ও জ্বালানি ব্যয় আমেরিকার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। পরিবহণ ও পণ্য সরবরাহের খরচ বাড়লে তার প্রভাব পড়ে বিভিন্ন পণ্যের দামে। ফলে রাশিয়ার উপর চাপ বাড়ানোর নীতি কার্যকর করতে গিয়ে নিজের দেশের অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করা ওয়াশিংটনের পক্ষেও সহজ নয়। নভেম্বরে আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় জ্বালানির দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের একমাত্র কারণ নির্বাচনী হিসাব—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো প্রমাণ নেই। তাঁর সরকারি নির্দেশে জাতীয় স্বার্থের যুক্তি দেওয়া হয়েছে; জ্বালানির বাজার এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি বৃহত্তর প্রেক্ষাপট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কোন পথে?
গ্রাহাম আইন তৈরি হয়েছিল রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের জন্য মস্কোকে আলোচনায় বাধ্য করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু নতুন আইনের কঠোর ব্যবস্থা কার্যকর করার আগেই ছাড় দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, আমেরিকা কি রাশিয়ার বিরুদ্ধে চাপের কৌশল কিছুটা শিথিল করছে? এর উত্তর এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। ট্রাম্পের নির্দেশে ছাড় দেওয়া হলেও ভবিষ্যতে পরিস্থিতি বদলালে নিষেধাজ্ঞা বা শুল্কের ব্যবস্থা ফের কার্যকর করার সুযোগ রয়েছে। মার্কিন প্রশাসন রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্য, নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর সম্ভাব্য প্রচেষ্টা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলির ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করবে। প্রয়োজন মনে করলে আরও পদক্ষেপের সুপারিশও করা হতে পারে।
ভারতের জন্য আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, রাশিয়ার তেল কেনাকে কেন্দ্র করে নতুন মার্কিন আইনের আওতায় অতিরিক্ত শাস্তিমূলক শুল্কের আশঙ্কা কিছুটা কমেছে। কিন্তু এই স্বস্তি স্থায়ী কি না, তা নির্ভর করবে ওয়াশিংটনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের উপর। ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনীতি, রাশিয়ার জ্বালানি রফতানি, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এবং ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য সম্পর্ক—সব কিছুর উপরই নজর রাখতে হবে। এক কথায়, রাশিয়াকে শাস্তি দেওয়ার জন্য তৈরি আইনেই আপাতত ছাড় দিলেন ট্রাম্প। তাতে স্বস্তি ভারত ও চিনের, কিন্তু আন্তর্জাতিক জ্বালানি রাজনীতি ও ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে অনিশ্চয়তা কাটল না।





