বিশেষ প্রতিবেদন: আমেরিকায় চাকরি, মোটা মাইনে, প্রযুক্তি সংস্থায় নিরাপদ কেরিয়ার, স্বচ্ছন্দ জীবনের যে ছবিকে সাফল্যের মাপকাঠি বলে মনে করা হয়, সেই ছবিটাই এক দিন নিজের হাতে ভেঙে দিয়েছিলেন শশী কুমার। বিদেশের চাকরি ছেড়ে তিনি ফিরে এসেছিলেন কৃষির টানে। পরিবারের আপত্তি, আর্থিক সঙ্কট, ব্যবসা প্রায় ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা—একটির পর একটি বাধা পেরিয়ে সেই সিদ্ধান্তই আজ তাঁকে নিয়ে গিয়েছে কয়েকশো কোটি টাকার ব্যবসার দরজায়। তাঁর তৈরি সংস্থা ‘অক্ষয়কল্প অর্গ্যানিক’-এর বার্ষিক ব্যবসা এখন প্রায় ৬০০ কোটি টাকার লক্ষ্যে।
শশীর গল্পের শুরু অবশ্য ২০১০ সালে নয়। কলেজে পড়ার সময় থেকেই কৃষি নিয়ে তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। বেঙ্গালুরু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে তিনি স্থানীয় এক প্রাকৃতিক কৃষক চেরকাডি রামচন্দ্র রাওয়ের সংস্পর্শে আসেন। মাত্র কয়েক একর জমিতে নারকেল, গোলমরিচ, আনারস, ধান, সব্জি, মিলেট, আম—বিভিন্ন ফসল ফলিয়ে কী ভাবে একটি খামারকে লাভজনক করে তোলা যায়, তা কাছ থেকে দেখেছিলেন শশী। শুধু চাষ নয়, উৎপাদিত পণ্য বিক্রি ও বিনিময়ের মাধ্যমে কৃষিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবসা হিসাবেও দেখেছিলেন তিনি।
কিন্তু পরিবারের চোখে কৃষি তখনও অনিশ্চিত পেশা। শশীর বাবা নিজেও কৃষক ছিলেন। নিজের জীবনের চাষবাসের অভিজ্ঞতা থেকে ছেলেকে বরং পড়াশোনা করে সফটওয়্যারের চাকরিতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। শশীও সেই পথেই এগোন। উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকার শিকাগোয় ইলিনয় ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে পড়াশোনা করেন। পরে প্রযুক্তি দুনিয়ায় দীর্ঘ কেরিয়ার তৈরি করেন এবং উইপ্রোয় প্রায় ১২ বছর লিড আর্কিটেক্ট হিসাবে কাজ করেন।
তার পরেও কৃষির ভাবনা তাঁকে ছাড়েনি। শেষ পর্যন্ত ২০১০ সালে কর্পোরেট চাকরির নিরাপত্তা ছেড়ে কৃষিকে পেশা করার সিদ্ধান্ত নেন শশী। সিদ্ধান্তে বাবা এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন যে, দীর্ঘ আট বছর ছেলের সঙ্গে কথা বলেননি। কারণ, যে পেশা থেকে ছেলেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন, সেই কৃষিকেই ছেলের ভবিষ্যৎ হিসাবে বেছে নেওয়া তিনি মেনে নিতে পারেননি।
শুরুটা মোটেই মসৃণ ছিল না। নতুন উদ্যোগ বার বার আর্থিক সঙ্কটে পড়ে। একাধিক বার প্রায় দেউলিয়া হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেই সময় পাশে দাঁড়ান স্ত্রী শিল্পা জি। নিজেদের সঞ্চয় থেকে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা ব্যবসায় ঢালেন তিনি। শশীর কাকা ড. মুনি রেড্ডিও আরও ১০ লক্ষ টাকা দেন। অর্থাৎ মোট ৪০ লক্ষ টাকার সেই সহায়তা কঠিন সময়ে উদ্যোগটিকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
শশীর ব্যবসার মডেলও ছিল প্রচলিত কৃষির থেকে আলাদা। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু মরসুমি ফসলের উপর নির্ভর করলে কৃষকের নিয়মিত আয় নিশ্চিত করা কঠিন। তাই অক্ষয়কল্পের মডেলের কেন্দ্রে রাখা হয় দুগ্ধ ব্যবসাকে—যাতে কৃষকের ঘরে নিয়মিত নগদ অর্থ আসে। তার সঙ্গে যুক্ত হয় মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, মৌমাছি পালন, মুরগি, কলা চাষ এবং জৈব সার উৎপাদনের মতো একাধিক কাজ। লক্ষ্য ছিল, একটি কৃষক পরিবার যেন একটিমাত্র ফসলের উপর নির্ভরশীল না থাকে।
আজ সেই মডেলেই যুক্ত প্রায় ২,৮০০ কৃষক পরিবার। সংস্থার দাবি অনুযায়ী, গত আর্থিক বছরে অংশীদার কৃষক পরিবারের গড় মাসিক আয় ছিল প্রায় ১.২৮ লক্ষ টাকা। কৃষকদের দেওয়া মোট অর্থের পরিমাণও বছরে প্রায় ৪৮০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থার সঙ্গে যুক্ত কৃষকদের গড় বয়স প্রায় ৩২ বছর; তাঁদের মধ্যে প্রায় ১,২০০ জন মহিলা।
অক্ষয়কল্প এখন শুধু কৃষকদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করা সংস্থা নয়। বেঙ্গালুরু, চেন্নাই ও হায়দরাবাদে এর বাজার তৈরি হয়েছে। মুম্বই ও পুণেতেও সম্প্রসারণের পথে সংস্থাটি। অর্থাৎ, খামার থেকে সরাসরি ক্রেতার ঘর পর্যন্ত একটি সম্পূর্ণ সরবরাহ-ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা হয়েছে।
তবে শশী কুমারের কাছে ৬০০ কোটি টাকার ব্যবসাই শেষ কথা নয়। তাঁর লক্ষ্য আরও বড়—কৃষিকে এমন একটি পেশা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা, যাকে তরুণ প্রজন্ম আর বাধ্যতামূলক বা অনিশ্চিত জীবিকা বলে মনে করবে না। বরং প্রযুক্তি, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে কৃষিকে মিলিয়ে একটি সম্মানজনক ও লাভজনক পেশা হিসাবে বেছে নেবে।
এক সময় যে কৃষি থেকে ছেলেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন বাবা, সেই কৃষিকেই পেশা করে আজ হাজার হাজার কৃষক পরিবারের সঙ্গে একটি বড় ব্যবসায়িক মডেল দাঁড় করিয়েছেন শশী। আমেরিকার চাকরি ছেড়ে মাঠে নামার সেই সিদ্ধান্ত তাই শুধু এক ব্যক্তির কেরিয়ার বদলের গল্প নয় কৃষিকে ব্যবসার চোখে দেখলে তার সম্ভাবনা কতটা বড় হতে পারে, তারও এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ।