JAZZBAAT 24 BANGLA
১৮ অক্টো ২০২৬, ১২:১৯ পিএম
Breaking
চোরবাগানকাণ্ডে শোকের আবহ! কালীঘাটে পুজো দিলেন অমিত শাহ, শুভেন্দুকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন আহতদে... মা সরস্বতীকে অপমান করে কি মা দুর্গার মর্যাদা বাড়ানো যায়.… দায় কার? চোরবাগানকাণ্ডের পর বড় নির্দেশ শুভেন্দুর! কলকাতার জনপ্রিয় পুজো মণ্ডপে বিশেষ টিম, প্রয়োজনে... চোরবাগানকাণ্ডের পর বড় সিদ্ধান্ত শুভেন্দুর! শহরের জনপ্রিয় পুজো মণ্ডপে বিশেষ নজরদারি, প্রয়ো... চোরবাগানকাণ্ডে বড় ঘোষণা শুভেন্দুর! মৃতদের পরিবার পাবে ২৫ লক্ষ টাকা ও সরকারি চাকরি, আহতদের... চোরবাগানকাণ্ডের পর কলকাতায় বড় পদক্ষেপ! দুর্গাপুজোর মধ্যেই জারি ১৬৩ ধারা, ৩ দিন কড়া নিষে... Shatarup Ghosh : চোরবাগান পদপিষ্টের ঘটনা, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন শতরূপের চোরবাগানকাণ্ডে শোকের আবহ! কালীঘাটে পুজো দিলেন অমিত শাহ, শুভেন্দুকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন আহতদে... মা সরস্বতীকে অপমান করে কি মা দুর্গার মর্যাদা বাড়ানো যায়.… দায় কার? চোরবাগানকাণ্ডের পর বড় নির্দেশ শুভেন্দুর! কলকাতার জনপ্রিয় পুজো মণ্ডপে বিশেষ টিম, প্রয়োজনে... চোরবাগানকাণ্ডের পর বড় সিদ্ধান্ত শুভেন্দুর! শহরের জনপ্রিয় পুজো মণ্ডপে বিশেষ নজরদারি, প্রয়ো... চোরবাগানকাণ্ডে বড় ঘোষণা শুভেন্দুর! মৃতদের পরিবার পাবে ২৫ লক্ষ টাকা ও সরকারি চাকরি, আহতদের... চোরবাগানকাণ্ডের পর কলকাতায় বড় পদক্ষেপ! দুর্গাপুজোর মধ্যেই জারি ১৬৩ ধারা, ৩ দিন কড়া নিষে... Shatarup Ghosh : চোরবাগান পদপিষ্টের ঘটনা, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন শতরূপের

মা সরস্বতীকে অপমান করে কি মা দুর্গার মর্যাদা বাড়ানো যায়.…

মা সরস্বতীকে অপমান করে কি মা দুর্গার মর্যাদা বাড়ানো যায়.…

দুর্গাপুজো বাঙালির, বইও বাঙালির। এক দিকে দেবীর আরাধনা, অন্য দিকে জ্ঞানের সাধনা। এক দিকে ঢাকের বাদ্যি, আলোর রোশনাই, মণ্ডপে মণ্ডপে জনস্রোত; অন্য দিকে ফুটপাথের ধারে ছোট্ট একটি বইয়ের স্টল, টেবিলের উপর সাজানো নানা বিষয়ের বই, পাতা উল্টে দেখছেন কৌতূহলী মানুষ। এই দুই ছবি তো বাংলার উৎসবেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে এ বার পুজোর মরসুমে প্রশ্ন উঠছে, দুর্গামণ্ডপের পাশে বইয়ের স্টলই কি কারও কারও কাছে এত বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠেছে? লটারির দোকান বসতে আপত্তি নেই, অন্য নানা পণ্যের স্টলও দিব্যি চলছে, অথচ রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বইয়ের স্টল নিয়ে এত আপত্তি কেন? বইয়ের সঙ্গে লড়াইটা কি আসলে কোনও বিশেষ মতাদর্শের সঙ্গে, না কি ভিন্নমত প্রকাশের অধিকারটির সঙ্গেই?

কলকাতা হাইকোর্টে সিপিএমের বইয়ের স্টল বসানো নিয়ে মামলার শুনানিতে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের প্রশ্ন, ‘‘লটারির দোকান তো দিচ্ছেন না, বইয়ের দোকান দেবেন, অসুবিধা কী?’’ বিরোধী রাজনৈতিক দলের কণ্ঠস্বর এ ভাবে দাবিয়ে দেওয়া উচিত নয় বলেও পর্যবেক্ষণ করেছে আদালত। এই প্রশ্নের গুরুত্ব একটি স্টলের অনুমতি পাওয়া বা না-পাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি। কারণ, গণতন্ত্রে প্রশাসনের ক্ষমতা শুধু নিয়ম কার্যকর করার ক্ষমতা নয়, সেই নিয়ম সকলের ক্ষেত্রে সমান ভাবে প্রয়োগ করার দায়িত্বও। একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতার বিরোধী বলেই তার বইয়ের স্টল বসানোর সুযোগ সংকুচিত হবে, এমন ধারণা যদি তৈরি হয়, তা হলে প্রশ্ন উঠবে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েই।

বনগাঁয় পুজোর মণ্ডপের সামনে সিপিএমের বইয়ের স্টল বসানো নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত। বামেদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে যে জায়গায় তারা পুজোর সময়ে বই বিক্রির স্টল বসিয়ে আসছে, এ বার সেখানে অনুমতি দেওয়া হয়নি। অথচ অন্য সংগঠনের স্টল রয়েছে। রাজ্যের তরফে যুক্তি, সংশ্লিষ্ট জমি পূর্ত দফতরের অধীন এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া হয়নি। সরকারি জমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনুমতি জরুরি, এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। রাস্তা, ফুটপাথ কিংবা পুজোমণ্ডপের আশপাশে স্টল বসালে পথচারীদের চলাচল, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তার বিষয়টিও দেখতে হয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই নিয়ম কি সবার জন্য সমান? অন্য স্টলগুলি কী ভাবে অনুমতি পেল? একই নিয়ম যদি একটি সংগঠনের ক্ষেত্রে কঠোর ভাবে প্রয়োগ করা হয়, অন্যদের ক্ষেত্রে তা শিথিল থাকে, তবে সেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

বিতর্কের আর একটি দিক আরও তাৎপর্যপূর্ণ। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পুজো কমিটিগুলিকে বলেছিলেন, সিপিএমের বইয়ের স্টলে ‘দুর্গাপুজো’র বদলে ‘শারদোৎসব’ লেখা থাকলে সেই স্টল বসতে দেওয়া উচিত নয়। অর্থাৎ, বই বিক্রির প্রশ্নের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে উৎসবের নামকরণ। ‘দুর্গাপুজো’ শব্দটির ধর্মীয় তাৎপর্য রয়েছে, এ কথা অস্বীকার করার কোনও কারণ নেই। আবার ‘শারদোৎসব’ শব্দটিরও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে নিজস্ব ব্যবহার রয়েছে। কেউ পুজোকে ধর্মীয় আচার হিসেবে দেখবেন, কেউ তাকে বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করবেন। এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই তো বাংলার সাংস্কৃতিক পরিসর গড়ে উঠেছে। কিন্তু একটি শব্দের ব্যবহার নিয়ে আপত্তি থাকলেই কি কোনও রাজনৈতিক দলের বইয়ের স্টল বন্ধ করে দেওয়া যায়?

ধর্মীয় বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করা এবং ভিন্নমতের অধিকার স্বীকার করা, দুটির মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। বরং গণতান্ত্রিক সমাজে এই দুইয়ের সহাবস্থানই কাম্য। ‘শারদোৎসব’ শব্দটি কারও পছন্দ না-ও হতে পারে। কেউ মনে করতে পারেন, ‘দুর্গাপুজো’ বললেই উৎসবের যথার্থ পরিচয় প্রকাশ পায়। সেই মত প্রকাশের অধিকার তাঁর রয়েছে। কিন্তু অন্য কেউ ‘শারদোৎসব’ শব্দ ব্যবহার করলেই তাঁর মতপ্রকাশের পথ বন্ধ করে দেওয়ার অধিকার কারও নেই। শব্দ নিয়ে বিতর্কের উত্তর যুক্তি দিয়ে দিতে হয়, প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নয়। দুর্গাপুজোর মর্যাদা কি এতটাই ভঙ্গুর যে অন্য একটি সাংস্কৃতিক শব্দের ব্যবহারেই তা ক্ষুণ্ণ হবে?

এখানে একটি সহজ প্রশ্ন করা যায়: মা সরস্বতীর প্রতীক বইকে অবজ্ঞা করে কি মা দুর্গার আরাধনার মর্যাদা বাড়ানো সম্ভব? বাংলার সমাজে দুর্গাপুজো এবং বিদ্যার সাধনা পরস্পরের বিরোধী নয়। বরং সাহিত্য, শিল্প, সঙ্গীত, নাটক, দর্শন ও পাঠচর্চার মধ্য দিয়েই বাঙালির উৎসবের পরিসর সমৃদ্ধ হয়েছে। পুজোর মণ্ডপে যেমন প্রতিমা ও আলোকসজ্জা থাকে, তেমনই থাকে নাটক, গান, আবৃত্তি, প্রদর্শনী এবং বইয়ের স্টল। এই সব কিছু মিলিয়েই উৎসবের বহুমাত্রিকতা। সেখানে বইয়ের জায়গা সংকুচিত করা মানে শুধু একটি রাজনৈতিক দলকে বাধা দেওয়া নয়, উৎসবের সাংস্কৃতিক পরিসরকেও সংকুচিত করা।

সপ্তমীর সন্ধ্যায় যাদবপুরের এইট বি বাসস্ট্যান্ডের কাছে সিপিএমের বইয়ের স্টল ঘিরে উত্তেজনার খবর সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে। অভিযোগ, স্টল সরানোর জন্য পুলিশ ও পুরসভার আধিকারিকেরা হাজির হন এবং সেখানে বুলডোজারও আনা হয়। সিপিএমের নেতাদের দাবি, স্টল বসানোর অনুমতি তাঁদের কাছে ছিল। অন্য দিকে, প্রশাসনিক অনুমতির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। একটি বইয়ের স্টল ঘিরে বুলডোজার হাজির হওয়ার ছবি নিজেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তৈরি করে: প্রশাসনিক সমস্যা মেটানোর জন্য কি এমন পদ্ধতির প্রয়োজন ছিল?

এখানেই শেষ নয়। ঢাকুরিয়ায় সিপিআই ও এসইউসিআইয়ের বইয়ের স্টল ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বাবুবাগানে দীর্ঘদিন ধরে স্টল বসানোর পরও কোনও আগাম নোটিস ছাড়া তা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ এসইউসিআইয়ের। বাগুইআটির জগৎপুরে বিজেপির কর্মীদের বিরুদ্ধে বই খালে ফেলে দেওয়া, ধাক্কাধাক্কি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন বামপন্থীরা। হালতুতেও পুজোর স্টল নিয়ে আপত্তির কথা জানিয়েছে সিপিএম। 

বইয়ের স্টলকে কেন্দ্র করে এই সংঘাতের মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হল, রাজনৈতিক মতাদর্শ যেন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাপকাঠি হয়ে উঠছে—এমন ধারণা তৈরি হওয়া। সিপিএমের বইয়ের স্টলে বামপন্থী রাজনীতির বই থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। মার্ক্সবাদ নিয়ে কেউ পড়বেন, কেউ সমালোচনা করবেন। কেউ ইতিহাসের বই কিনবেন, কেউ শিশুদের গল্প। কেউ স্টলে দাঁড়িয়ে বই উল্টে দেখবেন, কেউ পাশ কাটিয়ে চলে যাবেন। পাঠক কী পড়বেন, কী বিশ্বাস করবেন, তা তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত। কিন্তু পাঠকের কাছে পৌঁছনোর সুযোগটাই যদি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আটকে দেওয়া হয়, তা হলে মতাদর্শের লড়াই আর যুক্তির ময়দানে থাকে না; তা চলে যায় প্রশাসনিক ক্ষমতার হাতে।

বিজেপি সিপিএমের মতাদর্শের বিরোধী হতে পারে। বামেদের রাজনৈতিক ইতিহাস, তাদের শাসনকাল, তাদের নীতি—সব কিছুরই সমালোচনা হতে পারে। গণতন্ত্রে কোনও রাজনৈতিক দল সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু রাজনৈতিক সমালোচনা আর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জনসংযোগের পথ বন্ধ করে দেওয়া এক বিষয় নয়। বিজেপি যদি মনে করে বামপন্থী মতাদর্শ ভুল, তবে সেই মতাদর্শের বিরুদ্ধে পাল্টা বই প্রকাশ করতে পারে, নিজেদের স্টল বসাতে পারে, সভা করতে পারে, বিতর্কের আয়োজন করতে পারে। মানুষের কাছে নিজের যুক্তি পৌঁছে দিতে পারে। কিন্তু প্রতিপক্ষের বইয়ের স্টল সরিয়ে দিয়ে নিজের মতকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা গণতান্ত্রিক আত্মবিশ্বাসের পরিচয় নয়।

ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাসও এই প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গিক। ২০১১ সালে বামফ্রন্ট সরকারের পতনের পর তৃণমূল আমলেও বিভিন্ন এলাকায় বামপন্থীদের বইয়ের স্টল বসানো নিয়ে বাধা ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছিল। তখন বিরোধী বামেরা অভিযোগ করেছিল, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাদের সাংস্কৃতিক ও জনসংযোগের পরিসর সংকুচিত করা হচ্ছে। আজ নতুন রাজনৈতিক ক্ষমতার আমলে একই ধরনের অভিযোগ উঠছে। এই তুলনা থেকে অবশ্যই বলা যায় না যে, অতীতের অভিযোগই বর্তমানের অভিযোগের প্রমাণ। প্রতিটি ঘটনার নিজস্ব তথ্য ও প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক শিক্ষা নেওয়ার জায়গাটি স্পষ্ট: যে দল এক সময় বিরোধী কণ্ঠস্বরের স্বাধীনতা দাবি করেছে, ক্ষমতায় এসে তারও সেই স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব রয়েছে। অন্যের অন্যায়কে নিজের অন্যায়ের অজুহাত করা যায় না।

গণতন্ত্রের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হল, ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলিও মানুষের কাছে পৌঁছতে পারবে। নির্বাচনে হারলে কোনও রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ মুছে যায় না, তার সমর্থকদের অধিকারও শেষ হয়ে যায় না। আজ সিপিএমের বইয়ের স্টল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কাল অন্য কোনও বিরোধী দলের পত্রিকা, বই বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অনুমতি নিয়েও একই বিতর্ক হতে পারে। তখন বর্তমান শাসক দল বিরোধী আসনে থাকলে কী চাইবে? প্রশাসন যেন তার রাজনৈতিক পরিচয় দেখে সিদ্ধান্ত নেয়, না কি আইন মেনে নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করে? এই প্রশ্নের উত্তর কোনও দলই নিজের সুবিধামতো দিতে পারে না। গণতান্ত্রিক অধিকার সবার জন্যই সমান হতে হবে।

তবে বইয়ের স্টল বসানোর অধিকার মানে আইন অমান্য করার অবাধ অনুমতি নয়। সরকারি জমিতে স্টল বসাতে হলে অনুমতি লাগবে। রাস্তা আটকে রাখা যাবে না, অগ্নিনির্বাপণ ও নিরাপত্তাবিধি মানতে হবে, পথচারীদের অসুবিধা করা চলবে না। কোনও স্টল এই নিয়ম ভাঙলে প্রশাসন ব্যবস্থা নিতেই পারে। কিন্তু সেই ব্যবস্থার কারণ লিখিত ভাবে জানাতে হবে, প্রয়োজনে নোটিস দিতে হবে এবং একই নিয়ম অন্য সব স্টলের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে হবে। প্রশাসন যদি কোনও স্টলকে বেআইনি বলে, তবে তার প্রমাণ দেখাক। আর যদি অন্য সংগঠন একই নিয়ম ভেঙেও অনুমতি পেয়ে থাকে, তা হলে সেই বৈষম্যেরও ব্যাখ্যা দিক। স্বচ্ছতা ও সমতা—এই দুইয়ের উপরই প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে।

বইয়ের স্টল নিয়ে বিতর্কে তাই আদালতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আদালতকে জমির মালিকানা, অনুমতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের আইনি বৈধতা খতিয়ে দেখতে হবে। কিন্তু বিচারপতির প্রশ্নের বৃহত্তর তাৎপর্য জনপরিসরের স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত। বিরোধী রাজনৈতিক দলের কণ্ঠস্বর দাবিয়ে দেওয়া উচিত নয়—এই নীতির গুরুত্ব কেবল কোনও একটি মামলায় সীমাবদ্ধ নয়। জনপরিসর এমন হওয়া দরকার, যেখানে শাসক ও বিরোধী উভয়েই নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারে, আর মানুষ স্বাধীন ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে কোন বক্তব্য গ্রহণ করবে। প্রশাসনের কাজ সেই পরিসর সুরক্ষিত করা, নিজের পছন্দের মতাদর্শের জন্য একচেটিয়া জায়গা তৈরি করা নয়।

সবচেয়ে বড় কথা, বইকে ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। বইয়ের ভিতরে ভুল তথ্য থাকলে তার প্রতিবাদ করা যায়। কোনও মতাদর্শের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে যুক্তি দিয়ে তার বিরোধিতা করা যায়। যে বইয়ের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে হয়, তার বিরুদ্ধে পাল্টা বই লেখা যায়। এই পথই সভ্য সমাজের পথ। কিন্তু বই সরিয়ে দেওয়া, স্টল ভাঙা বা অনুমতি আটকে দেওয়ার মাধ্যমে চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলে তা উল্টো ফলও আনতে পারে। নিষেধাজ্ঞা কৌতূহল বাড়ায়, আর প্রশাসনিক বাধা অনেক সময় একটি ছোট স্টলকেও বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করে।

দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে যে সর্বজনীনতার কথা বলা হয়, তার পরীক্ষা হয় ঠিক এই জায়গাতেই। সর্বজনীনতা মানে শুধু বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এক মণ্ডপে এসে প্রতিমা দর্শন করবেন, তা নয়। এর অর্থ, ভিন্ন বিশ্বাস, ভিন্ন মত, ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের মানুষও একই জনপরিসরে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে পারবেন। পুজোর আলোয় যদি কেবল শাসকের পছন্দের বক্তব্যই জায়গা পায়, আর অন্য মতের বইয়ের স্টলকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়, তবে সেই সর্বজনীনতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের কাছে তাই প্রশ্নটি একটি স্টলের অনুমতির চেয়েও বড়। সরকার কি রাজনৈতিক মতভেদকে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করবে, না কি প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে সেই মতভেদকে আড়াল করতে চাইবে? ‘দুর্গাপুজো’ না ‘শারদোৎসব’—কোন শব্দ ব্যবহার করা উচিত, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু সেই বিতর্কের নিষ্পত্তি বইয়ের দোকান বন্ধ করে নয়, আলোচনায় হওয়া উচিত। ধর্মীয় আবেগের মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে অন্যের মতপ্রকাশের অধিকার খর্ব করা হলে তা শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় ঐতিহ্যকেও রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে টেনে আনে।

মা সরস্বতীর হাতে বই। সেই বই জ্ঞান, প্রশ্ন, যুক্তি ও অনুসন্ধানের প্রতীক। মা দুর্গার আরাধনা শক্তির, ন্যায়ের ও অশুভের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক। এই দুই প্রতীকের মধ্যে বিরোধ তৈরি করার প্রয়োজন কোথায়? বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস, যুক্তির প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা—এসবই তো একটি সুস্থ সমাজের শক্তি। যে উৎসবের নাম করে বইয়ের স্টলকে অপমান করা হয়, সে উৎসবের সাংস্কৃতিক মর্যাদা বাড়ে না। যে প্রশাসন অনুমতির নিয়মের আড়ালে রাজনৈতিক বাছবিচারের অভিযোগের মুখে পড়ে, তার বিশ্বাসযোগ্যতাও অক্ষুণ্ণ থাকে না।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই স্পষ্ট: মা সরস্বতীর অমর্যাদা করে কি মা দুর্গার মর্যাদা বাড়ানো যায়? বইয়ের স্টল যদি নিয়ম মেনে বসে, তাকে বসতে দিতে হবে—সে স্টল শাসকের মতের পক্ষে হোক বা বিপক্ষে। আর যদি নিয়ম ভাঙে, তবে একই নিয়মে ব্যবস্থা নিতে হবে সবার বিরুদ্ধে। গণতন্ত্রে ক্ষমতার আসন কোনও মতাদর্শের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। ভোটে জিতে সরকার গঠন করা যায়, কিন্তু মানুষের চিন্তা, পাঠাভ্যাস ও মতপ্রকাশের উপর একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

দুর্গাপুজোর আলোয় বইয়ের স্টলও থাকুক, মতের সংঘাতও থাকুক, যুক্তির লড়াইও চলুক। কারণ, যে সমাজ বইকে জায়গা দিতে পারে না, সে সমাজ নিজের সাংস্কৃতিক শক্তিকেই ছোট করে। আর যে সরকার প্রতিপক্ষের বইয়ের স্টল দেখে অস্বস্তিতে পড়ে, তার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি বইয়ের নয়, গণতন্ত্রে নিজের আত্মবিশ্বাসের।

3 Views 0 Likes 0 Comments

Related News

দায় কার?
মতামত

দায় কার?

নীলাঞ্জন দাসগুপ্ত: উৎসবের শহরে মৃত্যুর মিছিল। মণ্ডপে মণ্ডপে আলোর রোশনাই, রাস্তায় মানুষের ঢল, ঢাকের আওয়াজ আর দেবী দর্শনের উন্মাদনা—তারই মধ্যে উত্তর কলকাতার চোরবাগানে ১৯টি প্রাণ ঝরে গেল। সপ্তমীর সন্ধ্যায় যে মানুষগুলি আন...

১৮ অক্টো ২০২৬, ১০:৫১ এএম · 6 মিনিট
বিক্রম-১-এর সাফল্যে ভর করে আমেরিকার বরাত পেল ভারতের স্কাইরুট
মতামত

বিক্রম-১-এর সাফল্যে ভর করে আমেরিকার বরাত পেল ভারতের স্কাইরুট

বিশেষ প্রতিবেদন: মহাকাশে ভারতের বেসরকারি রকেটশিল্পের মুকুটে আরও একটি পালক। প্রথম উড়ানেই কক্ষপথে পৌঁছে নজির গড়েছিল ভারতের বেসরকারি সংস্থা স্কাইরুট অ্যারোস্পেসের রকেট বিক্রম-১। এ বার সেই সাফল্যের হাত ধরেই আমেরিকার একটি ম...

১৫ অক্টো ২০২৬, ০৯:৪৪ পিএম · 3 মিনিট
আন্দামানের রাজেশ্বরীর সাফল্যে বদল গ্রামীণ স্বনির্ভরতার সংজ্ঞা
মতামত

আন্দামানের রাজেশ্বরীর সাফল্যে বদল গ্রামীণ স্বনির্ভরতার সংজ্ঞা

বিশেষ প্রতিবেদন: উঠোনে ঘুরে বেড়াত মাত্র পাঁচটি দেশি মুরগি। পোলট্রি ব্যবসার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সম্পর্কে ছিল না কোনও অভিজ্ঞতা। সেই সামান্য পুঁজি আর স্বনির্ভর হওয়ার ইচ্ছেকে সম্বল করেই পথচলা শুরু করেছিলেন দক্ষিণ আন্দামানের ওয়...

১৫ অক্টো ২০২৬, ০৯:১৭ পিএম · 4 মিনিট
সূর্যের চেয়ে দীর্ঘজীবী নক্ষত্রের চারপাশে ‘সুপার পৃথিবী’র খোঁজে বিজ্ঞানীরা
মতামত

সূর্যের চেয়ে দীর্ঘজীবী নক্ষত্রের চারপাশে ‘সুপার পৃথিবী’র খোঁজে বিজ্ঞানীরা

বিশেষ প্রতিবেদন: পৃথিবী আছে, জল আছে, প্রাণও আছে। কিন্তু প্রাণের বিকাশের জন্য এই নীল গ্রহটিই কি মহাবিশ্বের সবচেয়ে আদর্শ ঠিকানা? নাকি দূর মহাকাশে এমন কোনও গ্রহ রয়েছে, যেখানে পৃথিবীর চেয়েও অনুকূল পরিবেশে প্রাণের জন্ম হতে পা...

১৫ অক্টো ২০২৬, ০৮:২৬ পিএম · 6 মিনিট

Top Comments (0)

No approved comments yet.