কলকাতা: আকাশে চোখ রাখার মতো দৃশ্য। অগস্টের শেষ সপ্তাহেই ঘটতে চলেছে বছরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য মহাজাগতিক ঘটনা—গভীর আংশিক চন্দ্রগ্রহণ। ২৭ অগস্ট রাত থেকে ২৮ অগস্ট ভোর পর্যন্ত পৃথিবীর ছায়ায় ঢেকে যাবে চাঁদের সিংহভাগ। গ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে চাঁদের প্রায় ৯৬ শতাংশ অংশ পৃথিবীর গাঢ় ছায়া বা ‘আমব্রা’-র মধ্যে চলে যাবে। ফলে পুরোপুরি গ্রাস না হলেও চাঁদকে অনেকটাই ‘রক্তিম’ বা তামাটে দেখাতে পারে এই গ্রহণ।
তবে ভারতের আকাশপ্রেমীদের জন্য রয়েছে হতাশার খবর। ভারত থেকে এই চন্দ্রগ্রহণ দেখা যাবে না। গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়গুলি যখন ঘটবে, তখন ভারতের আকাশে চাঁদ দিগন্তের নীচে থাকবে। ফলে কলকাতা-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খালি চোখে এই মহাজাগতিক দৃশ্য দেখার সুযোগ মিলবে না।
কী ভাবে হবে এই গ্রহণ?
চন্দ্রগ্রহণ ঘটে যখন সূর্য, পৃথিবী এবং চাঁদ প্রায় একই সরলরেখায় চলে আসে এবং পৃথিবী সূর্যের আলো আটকে দিয়ে চাঁদের উপর ছায়া ফেলে। পৃথিবীর ছায়ার দু’টি প্রধান অংশ—পেনাম্ব্রা বা হালকা ছায়া এবং আমব্রা বা গাঢ় ছায়া। চাঁদের কোনও অংশ আমব্রার মধ্যে ঢুকলে শুরু হয় আংশিক চন্দ্রগ্রহণ।
এ বার গ্রহণটি গভীর আংশিক। অর্থাৎ চাঁদের প্রায় পুরোটাই পৃথিবীর গাঢ় ছায়ার মধ্যে ঢুকে যাবে, কিন্তু একেবারে ১০০ শতাংশ নয়। সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রায় ৯৬ শতাংশ চাঁদ আমব্রায় ঢাকা পড়বে। সেই কারণে দূর থেকে চাঁদকে প্রায় পূর্ণগ্রাস গ্রহণের মতো দেখাতে পারে।
কখন শুরু, কখন চূড়ান্ত পর্যায়?
বিশ্বব্যাপী হিসাবে গ্রহণের পেনাম্ব্রাল পর্যায় শুরু হবে ২৮ অগস্ট ভারতীয় সময় ভোররাতের দিকে। তার পরে শুরু হবে আসল আংশিক গ্রহণ। আন্তর্জাতিক সময় অনুযায়ী পেনাম্ব্রাল গ্রহণ শুরু ০১:২৩ UTC-তে, আংশিক গ্রহণ শুরু ০২:৩৩ UTC-তে এবং সর্বোচ্চ গ্রহণ ০৪:১২ UTC-র কাছাকাছি। পুরো গ্রহণপর্বের পেনাম্ব্রাল পর্যায় শেষ হবে ০৭:০১ UTC-র দিকে।
ভারতীয় সময় অনুযায়ী সর্বোচ্চ গ্রহণ হবে ২৮ অগস্ট সকাল প্রায় ৯টা ৪৩-৪৪ মিনিটে। কিন্তু সেই সময়ে ভারতের আকাশে চাঁদ দৃশ্যমান থাকবে না। তাই সময় জানা থাকলেও দেশের মাটি থেকে সেই মুহূর্ত চোখে দেখা সম্ভব নয়।
কোথা থেকে দেখা যাবে?
এই গ্রহণের সবচেয়ে ভাল দৃশ্য মিলবে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ অংশে। ইউরোপ এবং আফ্রিকার কিছু অংশ থেকেও গ্রহণ দেখা যাবে, যদিও কোথাও কোথাও গ্রহণের পুরো পর্বের বদলে নির্দিষ্ট অংশ দেখা যেতে পারে। পশ্চিম দিগন্তের দিকে চাঁদ অস্ত যাওয়ার কাছাকাছি থাকায় ইউরোপের কিছু এলাকায় পর্যবেক্ষণের সময়ও সীমিত হতে পারে।
গ্রহণের চূড়ান্ত পর্যায় সূর্যোদয়ের কাছাকাছি হওয়ায় যে সব অঞ্চলে এটি দেখা যাবে, সেখানেও দিগন্তের কাছাকাছি চাঁদকে দেখতে হবে। তাই উঁচু বাড়ি, গাছপালা বা অন্য কোনও বাধা ছাড়া খোলা জায়গা থেকে পশ্চিম আকাশের দিকে তাকানোই ভাল।
‘রক্তিম চাঁদ’ কেন?
চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ সব সময় পুরোপুরি কালো হয়ে যায় না। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল দিয়ে সূর্যের আলো যাওয়ার সময় নীল আলোর তুলনায় লাল ও কমলা আলোর বিচ্ছুরণ কম হয়। সেই আলো পৃথিবীর ছায়ার ভিতর দিয়ে চাঁদের দিকে পৌঁছতে পারে। ফলে গ্রহণের সময় চাঁদের গায়ে তামাটে, কমলা বা লালচে আভা দেখা দিতে পারে।
এ বার যেহেতু চাঁদের প্রায় ৯৬ শতাংশ অংশ আমব্রায় ঢুকে যাবে, তাই গ্রহণের চূড়ান্ত পর্যায়ে এই লালচে-তামাটে রং আরও নাটকীয় ভাবে ফুটে উঠতে পারে। সেই কারণেই অনেক সময় এমন দৃশ্যকে জনপ্রিয় ভাষায় ‘ব্লাড মুন’ বলা হয়। যদিও বৈজ্ঞানিক ভাবে এটি আংশিক চন্দ্রগ্রহণ, পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ নয়।
খালি চোখে দেখা যাবে?
চন্দ্রগ্রহণ দেখার ক্ষেত্রে সূর্যগ্রহণের মতো বিশেষ সতর্কতার প্রয়োজন নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, চন্দ্রগ্রহণ খালি চোখে দেখা নিরাপদ। চোখ রক্ষার জন্য বিশেষ গ্রহণের চশমা প্রয়োজন হয় না। তবে দূরবীন বা ছোট টেলিস্কোপ ব্যবহার করলে চাঁদের পৃষ্ঠে পৃথিবীর ছায়ার ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্য আরও স্পষ্ট দেখা যেতে পারে। ভারতে সরাসরি দেখা না গেলেও বিশ্বের যে সব প্রান্তে গ্রহণ দৃশ্যমান হবে, সেখানকার বিভিন্ন পর্যবেক্ষণকেন্দ্র বা অনলাইন সম্প্রচারের মাধ্যমে মহাজাগতিক এই দৃশ্য দেখার সুযোগ মিলতে পারে।
রাখির দিনেই চন্দ্রগ্রহণ, কিন্তু ভারতে প্রভাব?
এ বারের বিশেষত্ব আরও একটি কারণে। ২৮ অগস্টই রক্ষাবন্ধন। একই দিনে ঘটছে এই গভীর আংশিক চন্দ্রগ্রহণ। ফলে গ্রহণের ‘সুতক’ এবং রাখির আচার নিয়ে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে যেহেতু গ্রহণটি ভারত থেকে দৃশ্যমান নয়, প্রচলিত ধর্মীয় মত অনুযায়ী ভারতে গ্রহণজনিত সুতকের নিয়ম প্রযোজ্য নয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, আকাশে এক বিরল মহাজাগতিক নাটক চললেও কলকাতা-সহ ভারতের আকাশে সে দিন চাঁদের গায়ে পৃথিবীর ছায়া পড়তে দেখা যাবে না। তবে বিশ্বের অন্য প্রান্তে রাতের আকাশে চাঁদ তখন বদলে যাবে, প্রায় পুরো গোল চাঁদটি ধীরে ধীরে ঢুকে পড়বে পৃথিবীর অন্ধকার ছায়ায়, আর একসময় তার গায়ে ফুটে উঠতে পারে সেই রহস্যময় তামাটে আভা।