নয়াদিল্লি: পৃথিবীর কোন প্রান্তে প্রাণের বৈচিত্র্য সবচেয়ে বেশি? এত দিন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা ভরসা করেছেন পরিচিত প্রজাতির মানচিত্রের উপর। কিন্তু গত এক শতকের আবিষ্কার সেই মানচিত্রকেই যেন নতুন করে আঁকছে। একের পর এক অজানা প্রাণীর প্রজাতি বিজ্ঞানের খাতায় যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে পৃথিবীর ‘বায়োডাইভার্সিটি হটস্পট’-এর ধারণাও। যে সব অঞ্চলকে আগে তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হত, নতুন তথ্যের আলোয় তার কয়েকটি উঠে আসছে জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসাবে। সবচেয়ে নাটকীয় বদল দেখা যাচ্ছে সরীসৃপ ও উভচরদের ক্ষেত্রে।
গত একশো বছর—১৯২০ থেকে ২০২০—ধরে বিজ্ঞানীদের হাতে জমেছে পৃথিবীর স্থলচর মেরুদণ্ডী প্রাণীদের প্রজাতি-আবিষ্কারের বিপুল তথ্য। শুধু নতুন প্রাণীর নাম তালিকায় যোগ হয়নি, বদলেছে আগে জানা প্রাণীদের বিস্তৃতি সম্পর্কেও ধারণা। সেই তথ্য একত্র করে নতুন করে জীববৈচিত্র্যের মানচিত্র তৈরি করতেই গবেষকদের চোখে পড়েছে চমকপ্রদ পরিবর্তন। অর্থাৎ, পৃথিবীতে নতুন প্রাণী আবিষ্কার মানে শুধু বিজ্ঞানের খাতায় আরও একটি নাম যোগ হওয়া নয়। তার সঙ্গে বদলে যেতে পারে একটি গোটা অঞ্চলের পরিবেশগত গুরুত্ব।
কেন? কারণ, কোনও অঞ্চলে এমন প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেলে, যাদের বিস্তৃতি অত্যন্ত সীমিত এবং অন্য কোথাও দেখা যায় না, সেই জায়গাটির সংরক্ষণমূল্য আচমকাই বেড়ে যায়। ফলে নতুন আবিষ্কার কোনও বন, দ্বীপ, পাহাড় বা জলাভূমিকে জীববৈচিত্র্যের ‘হটস্পট’ হিসাবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
সবচেয়ে বড় বদল সরীসৃপের মানচিত্রে
গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ সরীসৃপদের নিয়ে। গত এক শতকে নতুন প্রজাতি আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে সরীসৃপদের জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলির অবস্থানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গিয়েছে। এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে প্রাণীরা নিজেরাই এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে চলে গিয়েছে। বরং বিজ্ঞানীরা কোথায় কত ধরনের বিরল ও সীমিত-বিস্তৃতির প্রজাতি রয়েছে, সে সম্পর্কে নতুন তথ্য পেয়েছেন।
নতুন তথ্যের ফলে যে জায়গাগুলি আগে জীববৈচিত্র্যের মানচিত্রে তেমন গুরুত্ব পেত না, সেগুলির কিছু এখন সামনে উঠে এসেছে। গবেষণার এই ফলই পুরনো ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে, যে মানচিত্রকে এত দিন ‘পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের ছবি’ বলে ধরা হত, সেটি কি আসলে অসম্পূর্ণ ছিল? উত্তরটা অনেকটাই ‘হ্যাঁ’।
কারণ, কোনও অঞ্চলে যত বেশি প্রাণীকে বিজ্ঞানীরা শনাক্ত করতে পারবেন, সেই এলাকার জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণাও তত স্পষ্ট হবে। আবার কোনও অঞ্চলের জঙ্গল, পাহাড়, দ্বীপ বা দুর্গম উপত্যকায় গবেষণা কম হলে সেখানে থাকা অজানা প্রজাতির সংখ্যাও অজানাই থেকে যাবে। ফলে মানচিত্রে জায়গাটি তুলনামূলক ভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ দেখাতে পারে। নতুন অনুসন্ধান শুরু হলে সেই ছবিটাই রাতারাতি বদলে যেতে পারে।
অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নজর কেন?
গবেষণায় নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল। নতুন প্রজাতি আবিষ্কারের ফলে এই এলাকাগুলির কয়েকটি জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসাবে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গবেষণার অন্য বিশ্লেষণেও ইন্দোনেশিয়া, মধ্য আন্দিজ এবং মাদাগাস্কারের মতো অঞ্চলকে নতুন করে উদীয়মান জীববৈচিত্র্য কেন্দ্র হিসাবে চিহ্নিত করার কথা উঠে এসেছে।
এই জায়গাগুলির বিশেষত্ব কোথায়?
দুর্গম পাহাড়, বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, ঘন অরণ্য, ভিন্ন ভিন্ন জলবায়ু এবং দীর্ঘ সময় ধরে তুলনামূলক কম অনুসন্ধান—সব মিলিয়ে এমন বহু জায়গা রয়েছে যেখানে প্রাণীজগতের সম্পূর্ণ ছবি এখনও বিজ্ঞানীদের হাতে পৌঁছয়নি।
বিশেষ করে দ্বীপভিত্তিক পরিবেশে বিবর্তনের নিজস্ব পথ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। একটি দ্বীপ বা পাহাড়ি উপত্যকায় দীর্ঘ সময় ধরে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা প্রাণীর জনসংখ্যা ধীরে ধীরে আলাদা প্রজাতিতে পরিণত হতে পারে। ফলে একই রকম দেখতে হলেও জেনেটিক পরীক্ষা বা বিস্তারিত শারীরিক বিশ্লেষণের পরে দেখা যেতে পারে, তারা আসলে পৃথক প্রজাতি।
উভচরদের ক্ষেত্রেও বদল
শুধু সরীসৃপ নয়, উভচরদের ক্ষেত্রেও গত এক শতকের আবিষ্কার জীববৈচিত্র্যের ছবিকে পাল্টেছে। ব্যাঙ, স্যালামান্ডার, নিউটের মতো উভচর প্রাণীরা পরিবেশের পরিবর্তনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে কোনও এলাকায় নতুন উভচর প্রজাতির সন্ধান পাওয়া সেই অঞ্চলের পরিবেশগত গুরুত্বেরও ইঙ্গিত দিতে পারে।
আর এখানেই নতুন গবেষণার আরও বড় তাৎপর্য। কোনও অঞ্চলকে শুধু সেখানে মোট কত প্রাণী আছে তা দিয়ে বিচার করলে হবে না; কোন কোন বিরল প্রজাতি সেখানে রয়েছে, তাদের বিস্তৃতি কতটা সীমিত—সেটিও দেখতে হবে।
এই কারণেই জীববৈচিত্র্যের ‘হটস্পট’ বলতে শুধু প্রাণীর ভিড় বোঝায় না। অনেক ক্ষেত্রে একটি ছোট এলাকায় এমন বহু প্রজাতি থাকতে পারে, যাদের পৃথিবীর অন্য কোথাও অস্তিত্ব নেই। তাদের বলা হয় ‘এন্ডেমিক’ বা স্থানীয় ভাবে সীমাবদ্ধ প্রজাতি। এমন কোনও এলাকার বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হলে সেই প্রজাতিগুলির অস্তিত্বও বিপন্ন হতে পারে।
নতুন প্রাণী আবিষ্কারই বা হচ্ছে কী ভাবে?
‘নতুন প্রজাতি’ শুনলে অনেকের চোখে ভেসে ওঠে কোনও গভীর অরণ্যে বিজ্ঞানীদের সম্পূর্ণ অচেনা প্রাণী আবিষ্কারের ছবি। বাস্তবটা আরও জটিল।
কখনও সত্যিই কোনও অজানা প্রাণী আবিষ্কৃত হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে বহু বছর ধরে পরিচিত একটি প্রাণীকে নতুন করে পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখা যায়, সেটি আসলে অন্য একটি পৃথক প্রজাতি। উন্নত ডিএনএ বিশ্লেষণ, মলিকিউলার ট্যাক্সোনমি এবং আরও নিখুঁত শারীরিক পর্যবেক্ষণের ফলে একই নামে পরিচিত প্রাণীর মধ্যে লুকিয়ে থাকা পৃথক প্রজাতিও সামনে আসছে। ফলে গত একশো বছরের প্রজাতি-আবিষ্কারের হিসাব আসলে বিজ্ঞানীদের পৃথিবীকে দেখার ক্ষমতারও ইতিহাস। প্রযুক্তি যত উন্নত হয়েছে, দুর্গম এলাকায় পৌঁছনোর ক্ষমতা যত বেড়েছে, ডিএনএ বিশ্লেষণ যত সহজ হয়েছে—ততই বেড়েছে ‘অজানা’ জীবনের সন্ধান।
জলবায়ুর ছবিও বদলাচ্ছে
গবেষণার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক পরিবেশ ও জলবায়ুর সঙ্গে জীববৈচিত্র্যের সম্পর্ক। নতুন প্রজাতির তথ্য যোগ হওয়ার পরে সরীসৃপ ও উভচরদের ক্ষেত্রে কোন পরিবেশগত উপাদান বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেই ধারণাতেও পরিবর্তন এসেছে।
আগের কিছু বিশ্লেষণে তাপমাত্রাকে প্রজাতি বৈচিত্র্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসাবে দেখা হত। কিন্তু নতুন তথ্যের আলোকে বৃষ্টিপাত এবং আর্দ্রতার মতো বিষয়গুলিও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষত উভচরদের ক্ষেত্রে জল ও আর্দ্রতার উপর নির্ভরশীলতা অত্যন্ত বেশি হওয়ায় এই সম্পর্ক স্বাভাবিক ভাবেই তাৎপর্যপূর্ণ।
অর্থাৎ, নতুন প্রাণী আবিষ্কার শুধু ‘কোথায় কী প্রাণী আছে’, এই প্রশ্নের উত্তর বদলায়নি। বদলাচ্ছে কেন সেখানে ওই প্রাণী আছে, সেই প্রশ্নের উত্তরও।
সংরক্ষণনীতিতে বড় প্রভাব
এই গবেষণার সবচেয়ে বাস্তব গুরুত্ব সম্ভবত সংরক্ষণে। পৃথিবীর প্রতিটি বন, পাহাড় বা জলাভূমিকে সমান ভাবে রক্ষা করা সম্ভব নয়। সীমিত অর্থ ও সম্পদের মধ্যে বিজ্ঞানীরা এমন এলাকাকে অগ্রাধিকার দিতে চান যেখানে বিপন্ন, বিরল এবং স্থানীয় প্রজাতির ঘনত্ব বেশি। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত নির্ভর করে তথ্যের উপর।
কোনও জায়গা সম্পর্কে তথ্যই যদি অসম্পূর্ণ হয়, তবে সেটি সংরক্ষণের তালিকায় পিছিয়ে যেতে পারে। পরে সেখানে একের পর এক নতুন প্রজাতির সন্ধান মিললে বোঝা যায়, এত দিন আসলে এলাকার গুরুত্বই ঠিক ভাবে জানা ছিল না। এই গবেষণা তাই একটি সতর্কবার্তাও দিচ্ছে—যে অঞ্চলকে আমরা ‘কম গুরুত্বপূর্ণ’ ভাবছি, সেখানে হয়তো এমন প্রাণী রয়েছে, যাদের সম্পর্কে আমরা এখনও কিছুই জানি না।
পৃথিবীর জীবনের খাতা এখনও অসম্পূর্ণ
একশো বছর ধরে বিজ্ঞানীরা প্রাণীর সন্ধান করেছেন। নতুন প্রজাতির নাম দিয়েছেন। পুরনো প্রজাতির পরিচয় নতুন করে যাচাই করেছেন। পৃথিবীর নানা প্রান্তে অভিযান চালিয়েছেন। তবু সেই বিপুল পরিশ্রমের পরেও গবেষণার ফল বলছে—জীববৈচিত্র্যের সম্পূর্ণ মানচিত্র এখনও তৈরি হয়নি। বরং নতুন আবিষ্কার পুরনো মানচিত্রকে বার বার বদলে দিচ্ছে।
আজ যে অঞ্চলকে জীববৈচিত্র্যের প্রান্ত বলে মনে হচ্ছে, আগামী দিনের কোনও আবিষ্কার সেটিকেই গুরুত্বপূর্ণ হটস্পটে পরিণত করতে পারে। আবার যে জায়গাকে দীর্ঘদিন ধরে জীববৈচিত্র্যের কেন্দ্র বলে মনে করা হয়েছে, নতুন তথ্য তার গুরুত্বের তুলনামূলক চিত্রও বদলে দিতে পারে।
অর্থাৎ, পৃথিবীর প্রাণভাণ্ডারের সবচেয়ে বড় রহস্য হয়তো অজানা কোনও গ্রহে নয়—আমাদের এই পরিচিত পৃথিবীতেই।
শত বছর ধরে খুঁজেও বিজ্ঞানীরা যে মানচিত্রকে সম্পূর্ণ করতে পারেননি, সেই মানচিত্র এখনও আঁকা হচ্ছে। আর প্রতিটি নতুন প্রজাতি আবিষ্কার যেন পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতার আর একটি দরজা খুলে দিচ্ছে। যে প্রাণীটিকে আমরা আজ ‘নতুন’ বলছি, হয়তো সে এই পৃথিবীতেই আমাদের অজান্তে হাজার হাজার বছর ধরে বেঁচে আছে। নতুন শুধু তার পরিচয়, অজানা ছিল আমাদের চোখ।