বিশেষ প্রতিবেদন: উঠোনে ঘুরে বেড়াত মাত্র পাঁচটি দেশি মুরগি। পোলট্রি ব্যবসার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সম্পর্কে ছিল না কোনও অভিজ্ঞতা। সেই সামান্য পুঁজি আর স্বনির্ভর হওয়ার ইচ্ছেকে সম্বল করেই পথচলা শুরু করেছিলেন দক্ষিণ আন্দামানের ওয়ান্দুর গ্রামের রাজেশ্বরী। তিন বছরের ব্যবধানে ছবিটা আমূল বদলে গিয়েছে। এখন তাঁর পোলট্রি ইউনিটে মাসে প্রায় ২,০০০ মুরগির ছানা উৎপাদন হয়। মাংসের মুরগি, ডিম ও ছানা বিক্রি মিলিয়ে মাসিক নিট লাভের পরিমাণ প্রায় ১.৯১ লক্ষ টাকা। গ্রামবাংলার উঠোনে সীমাবদ্ধ থাকা মুরগি পালন কী ভাবে বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ ও পরিকল্পনার হাত ধরে লাভজনক উদ্যোগে পরিণত হতে পারে, রাজেশ্বরীর কাহিনি তারই নজির।
২০২৩ সালে স্বনির্ভর হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে পোলট্রি পালনের বিষয়ে পরামর্শ চাইতে তিনি যোগাযোগ করেন ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব এগ্রিকালচারাল রিসার্চের অধীন সেন্ট্রাল আইল্যান্ড এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সঙ্গে। তখন তাঁর কাছে ছিল মাত্র পাঁচটি দেশি মুরগি। মূলত পরিবারের প্রয়োজন মেটাতেই সেগুলি পালন করতেন তিনি। কিন্তু নিজের উদ্যোগকে ব্যবসায় পরিণত করার আগ্রহ ছিল প্রবল। সেই আগ্রহকে কাজে লাগিয়েই শুরু হয় প্রশিক্ষণ ও হাতে-কলমে শেখার পর্ব।
প্রথমে মুরগি পালনের মৌলিক বিষয়গুলি শেখেন রাজেশ্বরী। কী ভাবে মুরগির ঘর তৈরি করতে হয়, কী ধরনের খাবার দিতে হয়, রোগ প্রতিরোধের জন্য কী ব্যবস্থা নিতে হয়, কখন টিকা দিতে হয়—একের পর এক বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন তিনি। পরে প্রজননের জন্য মুরগি পালন, ডিম থেকে ছানা ফোটানো, হ্যাচারি পরিচালনা এবং উৎপাদনের সময়সূচি নির্ধারণের মতো উন্নত পদ্ধতিও শেখেন। শুধু প্রশিক্ষণ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি বিজ্ঞানীরা। নিয়মিত প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও সহায়তার মাধ্যমে তাঁর উদ্যোগের সম্প্রসারণেও সাহায্য করা হয়।
ধীরে ধীরে পাঁচটি মুরগির ছোট সংসার রূপ নেয় সুসংগঠিত পোলট্রি ইউনিটে। রাজেশ্বরী তৈরি করেন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে প্রজননের জন্য মুরগি পালন, ডিম থেকে ছানা ফোটানো এবং মাংসের জন্য মুরগি প্রতিপালন—সবই একই উদ্যোগের অংশ। তাঁর খামারে রয়েছে ২,৫০০ ডিমের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি ছোট ইনকিউবেটর। অর্থাৎ, ডিম পাড়ার পর স্বাভাবিক ভাবে তা দেওয়ার জন্য মুরগির উপর নির্ভর না করে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ডিম ফুটিয়ে ছানা উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।
প্রথম দিকে তিনি প্রায় ২,৪০০ মুরগি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পালন করেন। পরে নিয়মিত উৎপাদন বজায় রাখতে প্রজননের জন্য প্রায় ৫৫০টি মুরগি রাখেন। পাশাপাশি মাংস উৎপাদন ও বিক্রির জন্য পালন করেন প্রায় ১,২০০টি মুরগি। এই ব্যবস্থায় এক দিকে যেমন নতুন ছানা উৎপাদন করা যায়, অন্য দিকে মাংসের মুরগি ও ডিম বিক্রি করেও আয় হয়। রাজেশ্বরীর খামারে বর্তমানে মাসে প্রায় ৩,৬০০টি ডিম পাওয়া যায়। তার মধ্যে প্রায় ২,৫০০টি ডিম ছানা ফোটানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। উন্নত ইনকিউবেশন পদ্ধতি এবং মুরগির স্বাস্থ্যরক্ষার নিয়ম মেনে চলার ফলে ডিম থেকে ছানা ফোটার হার প্রায় ৮০ শতাংশ। সেই হিসাবেই মাসে প্রায় ২,০০০টি ছানা উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। ছোট উদ্যোগ থেকে নিয়মিত উৎপাদনের এই পর্যায়ে পৌঁছনোর পিছনে রয়েছে পরিকল্পিত প্রজনন, রোগ প্রতিরোধ, খাবারের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার কৌশল।
এই উদ্যোগের আয়ও একাধিক উৎস থেকে আসছে। প্রতি মাসে রাজেশ্বরী প্রায় ৬০০ কিলোগ্রাম জীবন্ত মুরগির মাংস, ৬০০টি ছানা এবং ১,১০০টি খাওয়ার উপযোগী ডিম বাজারে বিক্রি করেন। এই সমন্বিত পোলট্রি ব্যবস্থার অর্থনৈতিক হিসাব অনুযায়ী, তাঁর মাসিক নিট লাভ আনুমানিক ১.৯১ লক্ষ টাকা। লাভ ও ব্যয়ের অনুপাত ২.০২। অর্থাৎ, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচালিত এই উদ্যোগে উৎপাদন ও বিপণনের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
তবে রাজেশ্বরীর সাফল্যের আসল তাৎপর্য শুধু আয়ের অঙ্কে নয়। গ্রামীণ এলাকায় অনেক পরিবারই বাড়ির উঠোনে অল্প কয়েকটি মুরগি পালন করে। সেই মুরগি থেকে ডিম ও মাংস পাওয়া যায়, কখনও কিছু বিক্রি করে সামান্য অর্থও আসে। কিন্তু উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, ছানা উৎপাদনের ব্যবস্থা এবং বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলে সেই কাজকে নিয়মিত আয়ের উৎসে পরিণত করা কঠিন। রাজেশ্বরীর অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, ছোট পরিসরে শুরু করেও সঠিক জ্ঞান ও ধারাবাহিক সহায়তা পেলে উদ্যোগকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।
বিশেষ করে আন্দামান-নিকোবরের মতো দ্বীপাঞ্চলে মুরগির ছানার নিয়মিত জোগান এবং পোলট্রি উৎপাদনের পরিকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় ভাবে ছানা উৎপাদন করা গেলে বাইরের সরবরাহের উপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে স্থানীয় বাজারে মাংস ও ডিমের জোগান বাড়ে। রাজেশ্বরীর মতো উদ্যোগগুলি তাই ব্যক্তিগত আয়ের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখতে পারে। এই সাফল্যের পিছনে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের গুরুত্বও স্পষ্ট। শুধু ঋণ বা প্রাথমিক আর্থিক সহায়তা দিয়ে উদ্যোগকে টেকসই করা যায় না। প্রয়োজন উপযুক্ত প্রযুক্তি, পশুপাখির স্বাস্থ্য সম্পর্কে জ্ঞান, উৎপাদন পরিকল্পনা এবং বাজারের চাহিদা বোঝার ক্ষমতা। রাজেশ্বরীকে সেই ধারাবাহিক সহায়তা দিয়েছে আইসিএআর-এর সেন্ট্রাল আইল্যান্ড এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট।
ফলে তাঁর উদ্যোগ এখন অন্য গ্রামীণ মহিলা ও তরুণদের কাছেও অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
অবশ্য পোলট্রি ব্যবসায় লাভের অঙ্ক সব জায়গায় এক হবে না। মুরগির খাবারের দাম, রোগের প্রকোপ, মৃত্যুর হার, বিদ্যুৎ ও শ্রমের খরচ, বাজারদর এবং বিক্রির সুযোগ—সব কিছুর উপরেই আয় নির্ভর করে। রাজেশ্বরীর খামারের সাফল্যকে তাই সহজে বিপুল লাভের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বরং তাঁর অভিজ্ঞতার শিক্ষা হল, ব্যবসার ঝুঁকি বুঝে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনে এবং নিয়মিত উৎপাদনের পরিকল্পনা করে এগোলে ছোট উদ্যোগও লাভজনক হতে পারে। পাঁচটি দেশি মুরগি থেকে মাসে প্রায় ২,০০০ ছানা উৎপাদনের পর্যায়ে পৌঁছনোর এই যাত্রা আসলে স্বনির্ভরতার এক বাস্তব ছবি। এখানে সাফল্যের সূত্র শুধু পরিশ্রম নয়; তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, পরিকল্পনা এবং নিয়মিত সহায়তা। রাজেশ্বরীর কাহিনি মনে করিয়ে দেয়, গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তনের সূচনা সব সময় বড় পুঁজি দিয়ে হয় না। কখনও কখনও সেই পরিবর্তনের শুরু হয় বাড়ির উঠোনে ঘুরে বেড়ানো মাত্র পাঁচটি মুরগি থেকেই।





