নিউজ ডেস্ক: এক দিকে বিস্তীর্ণ মরুভূমি, অন্য দিকে জলের অফুরন্ত ভাণ্ডার। মাঝখানে কয়েক হাজার কিলোমিটার উত্তপ্ত সমুদ্র। সেই সমুদ্র পেরিয়েই কি বরফের পাহাড় টেনে এনে মেটানো সম্ভব তৃষ্ণার্ত দেশের জলের চাহিদা? প্রায় পাঁচ দশক আগে এমনই এক অবিশ্বাস্য পরিকল্পনা নিয়ে আলোড়ন পড়েছিল বিজ্ঞানী মহলে। সৌদি আরবের মরুভূমিতে পানীয় জলের সঙ্কট মেটাতে অ্যান্টার্কটিকা থেকে বিশাল হিমশৈল টেনে আনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন সৌদি রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স মহম্মদ আল ফয়সল। শুধু কল্পনার স্তরে আটকে ছিল না সেই ভাবনা। ১৯৭৭ সালে আমেরিকার আইওয়া প্রদেশে আন্তর্জাতিক সম্মেলন ডেকে বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও গবেষকদের সামনে পরিকল্পনাটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছিল। আর সেই সম্মেলনের আকর্ষণ বাড়াতে সুদূর আলাস্কা থেকে হেলিকপ্টার, বিমান ও ট্রাকে করে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল এক টনেরও বেশি ওজনের হিমবাহের বরফ!
তবে আলাস্কার বরফ আইওয়ায় পৌঁছলেও অ্যান্টার্কটিকার হিমশৈল আর সৌদি আরবের উপকূলে পৌঁছতে পারেনি। সমুদ্রের উত্তাপ, বরফ গলে যাওয়ার আশঙ্কা, বিশাল বরফখণ্ড টেনে নিয়ে যাওয়ার বিপুল শক্তির প্রয়োজন এবং খরচ—সব মিলিয়ে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এই ব্যর্থ স্বপ্নের মধ্যে লুকিয়ে ছিল ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: পৃথিবীতে যখন বিপুল পরিমাণ মিষ্টি জল সমুদ্রে মিশে যাচ্ছে, তখন সেই জলকে মানুষের কাজে লাগানো যাবে না কেন?
মরুভূমিতে জলের খোঁজে বরফের পাহাড়
সৌদি আরবের জলসঙ্কটের ইতিহাস দীর্ঘ। দেশের বিস্তীর্ণ অংশ শুষ্ক, সারা বছর বয়ে চলা নদীর সংখ্যাও কার্যত নেই। অথচ জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শহরায়ণ, শিল্পের প্রসার এবং কৃষির প্রয়োজন মেটাতে ক্রমশ বাড়ছিল জলের চাহিদা। সমুদ্রের নোনা জলকে পানীয় জলে পরিণত করার জন্য লবণমুক্তকরণ বা ডিস্যালিনেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলেও, সেই প্রক্রিয়ায় বিপুল শক্তি ও অর্থের প্রয়োজন হয়।
সত্তরের দশকে সৌদি আরবের জল সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন প্রিন্স মহম্মদ আল ফয়সল। তাঁর ভাবনা ছিল, সমুদ্রের জল থেকে মিষ্টি জল তৈরি করার পরিবর্তে প্রকৃতির তৈরি বিশাল জলভাণ্ডারকেই যদি কাজে লাগানো যায়, তা হলে কেমন হয়? অ্যান্টার্কটিকার হিমশৈলগুলি আসলে বিপুল পরিমাণ মিষ্টি জলের আধার। হিমবাহ থেকে ভেঙে সমুদ্রে ভেসে আসা এই বরফের পাহাড়ের একাংশ যদি অক্ষত অবস্থায় সৌদি আরবের উপকূল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যায়, তা হলে গলিয়ে বিপুল পরিমাণ পানীয় জল পাওয়া সম্ভব।
এই পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা অবশ্য শুধু সৌদি আরবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সত্তরের দশকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে জলসঙ্কটের বিকল্প সমাধান হিসেবে হিমশৈল পরিবহণের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছিল। ১৯৭৩ সালে হিমশৈল টেনে নিয়ে যাওয়ার বৈজ্ঞানিক দিক নিয়ে গবেষণাও প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু ভাবনাটিকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন ছিল আরও বিস্তারিত গবেষণা, সমুদ্রপথের হিসাব, বরফের গলন রোধের প্রযুক্তি এবং বিপুল অর্থের জোগান।
আইওয়ায় হাজির এক টনের বরফ
এই পরিকল্পনাকে ঘিরেই ১৯৭৭ সালের ২ থেকে ৬ অক্টোবর আমেরিকার আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত হয়েছিল হিমশৈলের ব্যবহার নিয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ২০০ জন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী তাতে অংশ নিয়েছিলেন। আলোচনার বিষয় ছিল, কী ভাবে হিমশৈল শনাক্ত করা হবে, কোন বরফখণ্ড পরিবহণের উপযুক্ত, কী ভাবে তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, মাঝপথে গলে যাওয়া আটকানো যাবে কী করে এবং গন্তব্যে পৌঁছনোর পরে সেই বরফ থেকে জল সংগ্রহের ব্যবস্থা কেমন হবে।
সম্মেলনের আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন প্রিন্স মহম্মদ। বরফ পরিবহণের ধারণাটি নিয়ে আলোচনার জন্য তিনি ব্যক্তিগত ভাবে অর্থসাহায্যও করেছিলেন। কিন্তু কেবল বক্তৃতা আর গবেষণাপত্র দিয়ে যে এই প্রকল্পের বাস্তবতা বোঝানো যাবে না, তা বুঝেছিলেন আয়োজকেরা। তাই আইওয়ার মতো স্থলবেষ্টিত অঞ্চলে বাস্তব হিমবাহের বরফ এনে হাজির করার পরিকল্পনা হয়।
আলাস্কার পোর্টেজ হিমবাহ অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হয় এক টনেরও বেশি ওজনের বরফের একটি বিশাল খণ্ড। সেটিকে প্রথমে হেলিকপ্টারে, পরে বিমানে এবং শেষে ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয় আইওয়ায়। এই বরফ কোনও সমুদ্রে ভাসমান পূর্ণাঙ্গ হিমশৈল ছিল না; বরং প্রকৃত হিমবাহের বরফের একটি নমুনা। সম্মেলনে বরফের বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করা, গবেষণার কাজে ব্যবহার করা এবং হিমশৈল নিয়ে আলোচনাকে বাস্তবের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়াই ছিল তার উদ্দেশ্য। সম্মেলনের ভোজসভায় সেই বরফের কিছু অংশ পানীয় ঠান্ডা করতেও ব্যবহার করা হয়েছিল বলে সে সময়ের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।
একটি বরফের খণ্ডকে আলাস্কা থেকে আইওয়ায় নিয়ে আসার এই আয়োজন নিছক প্রদর্শনী ছিল না। বরং বিশাল বরফখণ্ড পরিবহণের বাস্তব চ্যালেঞ্জ বোঝানোর একটি প্রতীকী প্রচেষ্টা ছিল। কিন্তু কয়েক হাজার কিলোমিটার সমুদ্রপথে কোটি কোটি টন বরফ টেনে নিয়ে যাওয়ার কাজ যে কত কঠিন, তা সম্মেলনের আলোচনাতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
৫৬০০ কিলোমিটার উত্তপ্ত সমুদ্রই বড় বাধা
অ্যান্টার্কটিকা থেকে সৌদি আরবে হিমশৈল নিয়ে যাওয়ার পথে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল সমুদ্রের তাপমাত্রা। বরফখণ্ডটি যত উত্তরের উষ্ণ জলভাগের দিকে এগোবে, তত দ্রুত গলতে থাকবে। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, প্রস্তাবিত পথে ৫৬০০ কিলোমিটারেরও বেশি এমন সমুদ্রপথ পেরোতে হতে পারত, যেখানে জলের তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে। এই পরিবেশে বিপুল আয়তনের বরফও দ্রুত ক্ষয় হতে পারে।
বরফের গলন কমাতে তার চারপাশে নিরোধক আবরণ বা ইনসুলেশন দেওয়ার প্রস্তাব উঠেছিল। বিশেষ ধরনের ফোম দিয়ে হিমশৈল ঢেকে রাখার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হয়। কিন্তু সমুদ্রের ঢেউ, স্রোত, বাতাস এবং দীর্ঘ যাত্রাপথে সেই আবরণ কতটা অক্ষত থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। আবরণ ঠিক ভাবে কাজ না করলে গন্তব্যে পৌঁছনোর আগেই বরফের বড় অংশ গলে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
সমস্যা শুধু বরফ গলে যাওয়ার নয়। এত বড় একটি বরফখণ্ডকে সমুদ্রের স্রোত ও ঢেউয়ের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করে টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন বিপুল শক্তি। সে সময়ের গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় টান দেওয়ার ক্ষমতা সম্পন্ন জাহাজের অভাবও ছিল বড় বাধা। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় বরফের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা, জাহাজ চলাচলের পথে বিপদ এড়ানো এবং গন্তব্যের কাছে পৌঁছে হিমশৈলকে নিরাপদে নোঙর করার মতো সমস্যারও সমাধান প্রয়োজন ছিল।
অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছনো সহজ, সৌদি আরব অনেক কঠিন
বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছিলেন, অ্যান্টার্কটিকা থেকে সৌদি আরব পর্যন্ত বরফ নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে তুলনামূলক কম দূরত্বের কোনও গন্তব্যে পরীক্ষামূলক পরিবহণের প্রয়োজন। সেই কারণেই অস্ট্রেলিয়ার উপকূলকে সম্ভাব্য পরীক্ষামূলক গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। অ্যান্টার্কটিকা থেকে অস্ট্রেলিয়ার দূরত্ব তুলনায় কম হলেও, সেই যাত্রাতেও বরফের উল্লেখযোগ্য অংশ গলে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
১৯৮০ সালে হিমশৈল পরিবহণ নিয়ে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় গবেষক উইলফ্রিড এফ উইকস দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার নানা সমস্যার বিশ্লেষণ করেছিলেন। তাঁর মূল্যায়নে, অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বরফ টেনে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে পরীক্ষা করা যেতে পারে। কিন্তু সৌদি আরবের মতো দূরবর্তী ও উষ্ণ অঞ্চলে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে বরফকে গলন থেকে রক্ষা করার সমস্যা ছিল অনেক বেশি জটিল। সেই সমস্যার কার্যকর সমাধান তখনও পাওয়া যায়নি।
প্রিন্স মহম্মদ অবশ্য আশাবাদী ছিলেন। ১৯৭৭ সালের সম্মেলন শেষে তিনি আশা প্রকাশ করেছিলেন, কয়েক বছরের মধ্যেই সৌদি আরবের উপকূলে একটি বিশাল হিমশৈল পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হয়নি। প্রকল্পটি নিয়ে গবেষণা চললেও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, অর্থ ও প্রশাসনিক সমর্থনের অভাবে শেষ পর্যন্ত কোনও হিমশৈলকে অ্যান্টার্কটিকা থেকে সৌদি আরবে টেনে নিয়ে যাওয়া যায়নি।
ব্যর্থ পরিকল্পনা, কিন্তু গবেষণায় লাভ
হিমশৈল পরিবহণের পরিকল্পনা সফল না হলেও, তার ফলে বরফের গঠন, সমুদ্রের স্রোত, গলনের হার, পরিবহণের শক্তি এবং বরফ সংরক্ষণের প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা এগিয়েছিল। বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছিলেন, প্রকৃতির বিপুল জলভাণ্ডারকে কাজে লাগানোর ধারণা আকর্ষণীয় হলেও তার বাস্তব প্রয়োগের জন্য শুধু বড় বরফখণ্ড খুঁজে পেলেই হবে না। সেই বরফকে দীর্ঘ সময় অক্ষত রাখা, নিরাপদে পরিবহণ করা এবং গন্তব্যে পৌঁছে ব্যবহারযোগ্য জলে পরিণত করার পুরো ব্যবস্থাটিই কার্যকর হতে হবে।
আজ সৌদি আরব সমুদ্রের নোনা জলকে পানীয় জলে পরিণত করার ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ। লবণমুক্তকরণ প্রযুক্তি তার জল সরবরাহ ব্যবস্থার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। ফলে অ্যান্টার্কটিকার বরফ টেনে আনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আগের মতো আলোচনা না হলেও, জলসঙ্কটের বিকল্প সমাধান খোঁজার প্রশ্নটি এখনও প্রাসঙ্গিক।
পৃথিবীর বহু অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন, খরা, ভূগর্ভস্থ জলের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে মিষ্টি জলের উপর চাপ বাড়ছে। সেই পরিস্থিতিতে ১৯৭৭ সালের এই পরিকল্পনা মনে করিয়ে দেয়, জলসঙ্কট মোকাবিলায় মানুষের কল্পনা কত দূর পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এই ঘটনাই দেখায়, কোনও ধারণা যতই অভিনব হোক, বাস্তবের সমুদ্র, আবহাওয়া, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।





