অকালে চলে গেলো ১৯টি তরতাজা প্রাণ। এখনও মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন আরও ২৫। শনিবারের তিলোত্তমা শহর কোনো আলোকোজ্জ্বল আনন্দনগরী ছিল না, সে দিন শহরটা ছিল শুধুই বুকফাটা কান্না, স্বজনহারাদের হাহাকার আর অন্তিম যাত্রার এক নীরব সাক্ষী। উৎসবের পাঁচটা দিন যেখানে হওয়ার কথা ছিল বেঁচে থাকার উদ্যাপন, সেখানে তা এক মহোৎসবে নয়, এক গভীর বেদনার ‘উৎ-শব’-এ রূপ নিল। বাঙালিদের শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো। যে মা’কে বরণ করে নিতে সারা বছর মুখিয়ে থাকে বাঙালি, সেই মা এলেন বটে, কিন্তু সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন বহু নিরীহ প্রাণ—যাঁদের ঘরে ফেরার অপেক্ষায় বুক বেঁধে বসে ছিল তাঁদের প্রিয়জন। পরিস্থিতি বুঝে ওঠার আগেই মৃত্যুমিছিলে পরিণত হয়ে উঠলো উত্তর কলকাতার রাজপথ।
কলকাতা শহরের প্রতিটি কোনায় ঝলমল করছিলো আলোর রোশনাই, মাইকে বাজছিলো নানা ধরণের সব গান আরও সমুদ্রের মতো এগিয়ে আসছিলো মানুষের ঢল। ভিড় দেখে অবশ্য উদ্যোক্তারা ভাবছিলেন এবারে আমাদের প্যান্ডেল খাস হয়েছে! কিন্তু, সত্যি-ই কী তাই ? উৎসবের আলো তো নিভে যায় না, কিন্তু সেই আলোর নিচে জমা হওয়া অন্ধকারের দায় কার? প্যান্ডেলের জৌলুস আর মানুষের উন্মাদনার ভিড়ে কোথাও কি তবে হারিয়ে গেল মানুষের জীবনের চেয়েও বড় কোনো সত্য? মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার দায় কার? আদেও কী কেউ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বুক ছিটিয়ে সাহসের বলতে পারবে, আমি বা আমরা দায় স্বীকার করে নিলাম! কিন্তু, না! তবে হয়তো সরকারের দেওয়া ২৫ লক্ষ টাকার চেয়ে এই দায় মেনে নেওয়া আরও বড় জয়ের হতো। একটি প্রাণের মূল্য কী শুধু কাগজের নোটে দিয়ে ধামা চাপা দেওয়া যায়? হয়তো পরিবারগুলো গরিব কিন্তু, তারা তো আর সরকারের কাছে বলেনি আমরা না খেতে পেয়ে রয়েছি! ফুটপাতে বাচ্চার দুধ গরম করা যায় না কিন্তু, গাফিলতির দায় ঝেড়ে ফেলতে টাকা দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করা যায়?
দুর্ঘটনার পর অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী,স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও রাজ্যসভাপতি গিয়েছিলেন অসহায় পরিবার গুলো পাশে দাড়াতে। রবির সকালে দিল্লি থেকে ছুটে এসেছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। গ্রেফতারও হয়েছেন ৭জন। দুর্ঘটনার সঠিক কারণ জানতে SIT ও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিম গঠন করা হয়েছে। কিন্তু, মন্ত্রীরা আগে এলে ও পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা করলে হয়তো বন্ধ হয়ে যেত না ১৯টি প্রাণের নিশ্বাস। আগে থেকে কেন কোনো সচেতনতা নেওয়া হয়নি? কেন "ঠেকে শিখতে গেলে " এই প্রবাদ প্রমান করতে হলে ঘটনার বলি হতে হবে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের? উদ্বোধনের সময় আসেন তাবড় তাবড় নেতারা, কিন্তু , তারপর কি আর সত্যি দেখা মেলে তাদের? "পশ্চিমবঙ্গ" একটি পরিবার , তবে সেই পরিবার সুরক্ষিত আছে তো? কে করবে এই প্রশ্ন গুলো? আর কত প্রাণ চলে গেলে হুশ ফিরে আসবে!
আজ বাতাসে ঢাকের আওয়াজ ফিকে, কান পাতলে শুধু শোনা যায় প্রিয়জন হারানোর আর্তনাদ। তিলোত্তমার এই উৎসবের আলো হয়তো আবার ফুটবে, কিন্তু সেই আলোর নিচে থেকে যাওয়া চোখের জলের দাগ কোনোদিন মোছার নয়।




