কলকাতা, নিউজ ডেস্ক: সরকারি হাসপাতালে রোগী ভর্তি হচ্ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়ছে না বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা। ফলে একই চিকিৎসককে সপ্তাহে একাধিক দিন ‘অ্যাডমিশন ডে’ সামলাতে হচ্ছে। তার উপর সরকারি হাসপাতালে রোগী ভর্তি করানোর পর ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ রাখার নতুন নির্দেশ ঘিরে চিকিৎসকদের একাংশের মধ্যে তৈরি হয়েছে অসন্তোষ। এই জোড়া চাপ সামলাতে এ বার নজর বেসরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রে। কলকাতার নামী কর্পোরেট হাসপাতাল থেকে শুরু করে জেলার বেসরকারি ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের চুক্তির ভিত্তিতে সরকারি হাসপাতালে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করেছে স্বাস্থ্য ভবন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের দাবি, এটি স্থায়ী নিয়োগের বিকল্প নয়। আপাতত দ্রুত ঘাটতি মেটানোর ব্যবস্থা। তাঁর কথায়, লক্ষ্য এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে সরকারি হাসপাতালে কোনও চিকিৎসককে সপ্তাহে দু’দিন করে ‘অ্যাডমিশন ডে’ দিতে না হয়। জেলা ও মহকুমা হাসপাতালগুলিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরিষেবা পৌঁছে দিতেই এই উদ্যোগ।
ঘটনার সূত্রপাত সোমবারের স্বাস্থ্য ভবনের নির্দেশিকা ঘিরে। সরকারি হাসপাতালে কোনও চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে যে দিন রোগী ভর্তি হবেন, সেই দিন থেকে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টা ওই চিকিৎসক বেসরকারি ভাবে রোগী দেখতে পারবেন না—এমন নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ বলে স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে খবর।
কিন্তু নির্দেশিকা সামনে আসার পর চিকিৎসকদের একাংশের প্রশ্ন, বাস্তবে এই নিয়ম কার্যকর হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের উপর চাপ আরও বাড়বে না তো? কারণ, চিকিৎসকের ঘাটতির জন্যই বহু সরকারি হাসপাতালে একই চিকিৎসককে সপ্তাহে দু’দিন পর্যন্ত ‘অ্যাডমিশন ডে’ সামলাতে হয়। ফলে সপ্তাহের দু’টি দিনের সঙ্গে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টা যোগ হলে কার্যত সপ্তাহের প্রায় ছ’দিনই ওই চিকিৎসকের প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সুযোগ থাকবে না। চিকিৎসকদের একাংশের বক্তব্য, ঘাটতি না মিটিয়ে শুধু প্রাইভেট প্র্যাকটিসে বিধিনিষেধ চাপালে সমস্যার সমাধান হবে না।
এই বিতর্কের মধ্যেই মঙ্গলবার স্বাস্থ্য ভবনে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। বৈঠকের মূল আলোচ্য ছিল চুক্তিভিত্তিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ এবং তাঁদের পারিশ্রমিক। মন্ত্রীর দাবি, চুক্তির খসড়া ইতিমধ্যেই তৈরি। খুব শীঘ্রই এই ব্যবস্থা চালু করার লক্ষ্যে এগোচ্ছে সরকার।
পরিকল্পনার মডেলটিও ব্যাখ্যা করেছেন শারদ্বত। তাঁর বক্তব্য, কলকাতার বহু কর্পোরেট হাসপাতালে এমন চিকিৎসক রয়েছেন যাঁদের বাড়ি রাজ্যের বিভিন্ন জেলায়। কেউ কালনা বা পূর্বস্থলীর বাসিন্দা, কেউ কৃষ্ণনগর বা শান্তিপুরের। তাঁদের নিজেদের বাড়ির কাছাকাছি সরকারি হাসপাতালে সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট দিন ‘অ্যাডমিশন ডে’ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হবে। ওই দিন এবং পরবর্তী দু’দিন তাঁরা সরকারি হাসপাতালে রোগী পরিষেবা দেবেন। বিনিময়ে তাঁদের নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক দেওয়া হবে এবং ওই তিন দিন বেসরকারি ভাবে রোগী দেখার সুযোগ থাকবে না।
স্বাস্থ্য দফতরের যুক্তি, এই ব্যবস্থায় জেলা ও মহকুমা হাসপাতালগুলি একসঙ্গে বিশেষজ্ঞ পরিষেবা পাবে, আবার কলকাতার সরকারি হাসপাতালগুলির চিকিৎসকদের উপর চাপও কমবে। একই সঙ্গে স্থানীয় ভাবে কর্মরত বেসরকারি বিশেষজ্ঞদেরও সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যাবে।
বিশেষ করে যে সব বিভাগে চিকিৎসকের ঘাটতি বেশি, সেই তালিকাই এখন তৈরি করছে স্বাস্থ্য ভবন। অ্যানেস্থেশিয়া, রেডিয়ো ডায়াগনসিস, চর্মরোগ, মনোরোগ, কার্ডিয়োলজি, নেফ্রোলজি, নিউরো মেডিসিন এবং নিউরো সার্জারি—এই বিভাগগুলিতে দ্রুত বিশেষজ্ঞ পরিষেবা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, যে সব ক্ষেত্রে জেলা হাসপাতাল থেকে রোগীদের কলকাতায় রেফার করতে হয় বেশি, সেখানেই আগে এই ব্যবস্থা কার্যকর করার লক্ষ্য।
সরকারের এই উদ্যোগের পিছনে আরও একটি বাস্তব সমস্যা রয়েছে। রাজ্যে একের পর এক মেডিক্যাল কলেজ, সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল এবং জেলা হাসপাতালের পরিকাঠামো তৈরি হলেও সব জায়গায় সেই অনুপাতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ হয়নি। ফলে কোথাও যন্ত্র রয়েছে, কিন্তু তা চালানোর মতো চিকিৎসক নেই; কোথাও আবার বিভাগ চালু থাকলেও পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ না থাকায় রোগীদের অন্যত্র পাঠাতে হয়। স্বাস্থ্য ভবনের পরিকল্পনা, এই ফাঁকটুকুই আপাতত চুক্তিভিত্তিক চিকিৎসকদের দিয়ে পূরণ করা।
কিন্তু চিকিৎসক সংগঠনগুলির একাংশ এই মডেল নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। অ্যাসোসিয়েশন অফ হেল্থ সার্ভিস ডক্টর্সের সাধারণ সম্পাদক উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, সরকারি চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে যদি বলা হয় যে তাঁরা রোগীর প্রতি পূর্ণ দায়বদ্ধ থাকবেন, তা হলে বেসরকারি ক্ষেত্রের চিকিৎসকদের কয়েক দিনের জন্য এনে একই ধরনের পরিষেবা আশা করা কতটা বাস্তবসম্মত? তাঁর প্রশ্ন, ‘‘এক দিকে সরকারি চিকিৎসকদের বলা হচ্ছে অন্য কাজে মন না দিতে, অন্য দিকে বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের সপ্তাহে কয়েক দিনের জন্য সরকারি হাসপাতালে আনার কথা বলা হচ্ছে। দু’টি ব্যবস্থার দায়বদ্ধতা এক হতে পারে না।’’
তাঁদের দাবি, রাজ্যে চিকিৎসকের অভাবের চেয়ে বড় সমস্যা হল শূন্যপদে নিয়োগ না হওয়া। মেডিক্যাল কলেজগুলি থেকে প্রতি বছর এমডি, এমএস পাশ করে বহু চিকিৎসক বেরোচ্ছেন। তাঁদের স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালে কাজে লাগানোর দাবি উঠছে।
সার্ভিস ডক্টর্স ফোরামের সম্পাদক সজল বিশ্বাসের বক্তব্যও একই সুরে। তাঁর প্রশ্ন, ‘‘প্রতি বছর রাজ্যের মেডিক্যাল কলেজগুলি থেকে স্নাতকোত্তর চিকিৎসক তৈরি হচ্ছেন। তাঁদের নিয়োগ করা হবে না কেন? কর্পোরেট হাসপাতালের একজন ব্যস্ত চিকিৎসক মাসে কত দিন জেলায় গিয়ে পরিষেবা দিতে পারবেন?’’ তাঁর মতে, সরকারি হাসপাতালের নিয়মিত পরিষেবার সঙ্গে বেসরকারি চিকিৎসকের চুক্তিভিত্তিক পরিষেবার তুলনা চলে না।
তবে চিকিৎসক মহলের সবাই এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করছেন না। পশ্চিমবঙ্গ ডক্টর্স ফোরামের সভাপতি কৌশিক চাকীর মতে, বেসরকারি ক্ষেত্রের দক্ষ বিশেষজ্ঞদের সরকারি হাসপাতালে যুক্ত করা গেলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হতে পারেন। বিশেষ করে কার্ডিয়োলজি, নিউরোসার্জারি, কার্ডিওথোরাসিক ও স্পাইন সার্জারি, গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজি এবং অঙ্কো-সার্জারির মতো জটিল চিকিৎসায় এই ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। তবে তিনিও মনে করেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগকে কখনওই স্থায়ী নিয়োগের বিকল্প করা উচিত নয়।
স্বাস্থ্য দফতর অবশ্য বলছে, স্থায়ী নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তারা অস্বীকার করছে না। কিন্তু হেল্থ রিক্রুটমেন্ট বোর্ডের মাধ্যমে নিয়োগ সম্পূর্ণ করতে সময় লাগে। বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষা, কাউন্সেলিং, নিয়োগ—পুরো প্রক্রিয়ায় কয়েক মাস কেটে যেতে পারে। সেই সময়ের মধ্যে জেলা হাসপাতালের রোগীরা যাতে বিশেষজ্ঞ পরিষেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সে জন্যই চুক্তিভিত্তিক চিকিৎসকের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য ভবনের একাংশের দাবি, এই ধরনের চুক্তিভিত্তিক চিকিৎসক নিয়োগের আলোচনা অবশ্য নতুন নয়। ২০১৮ সালেই চিকিৎসকদের সঙ্গে বৈঠকে এমন প্রস্তাব উঠেছিল বলে দফতরের আধিকারিকদের দাবি। আইনি দিক খতিয়ে দেখার কথাও হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। এ বার প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিয়ন্ত্রণের নতুন নির্দেশ এবং সরকারি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞের ঘাটতি—দুই সমস্যার মাঝেই পুরনো পরিকল্পনাকে নতুন করে সামনে আনছে স্বাস্থ্য দফতর।
এখন প্রশ্ন, ‘অ্যাডমিশন ডে’ কমাতে বাইরে থেকে চিকিৎসক এনে কি সরকারি হাসপাতালের ভিতরের সমস্যার সমাধান হবে? নাকি দরকার শূন্যপদ পূরণ করে পূর্ণ সময়ের বিশেষজ্ঞ নিয়োগ? স্বাস্থ্য ভবনের পরিকল্পনা আপাতত দ্রুত পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার রাস্তা খুলছে। কিন্তু সরকারি চিকিৎসক সংগঠনগুলির দাবি, সাময়িক বন্দোবস্ত নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নিয়োগ নীতি। কারণ হাসপাতালের ভবন, যন্ত্রপাতি এবং পরিকাঠামো যতই বাড়ুক, রোগীর পাশে নিয়মিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকলে সেই পরিকাঠামোর পূর্ণ সুফল মিলবে না।
এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই স্বাস্থ্য ভবনের নতুন মডেল কতটা দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং চুক্তিভিত্তিক চিকিৎসকেরা জেলা-মহকুমার সরকারি হাসপাতালে কতটা নিয়মিত পরিষেবা দিতে পারেন সেটাই এখন নজরে।