বিশেষ প্রতিবেদন: মহাকাশে ভারতের বেসরকারি রকেটশিল্পের মুকুটে আরও একটি পালক। প্রথম উড়ানেই কক্ষপথে পৌঁছে নজির গড়েছিল ভারতের বেসরকারি সংস্থা স্কাইরুট অ্যারোস্পেসের রকেট বিক্রম-১। এ বার সেই সাফল্যের হাত ধরেই আমেরিকার একটি মহাকাশ প্রযুক্তি সংস্থার কাছ থেকে জোড়া উৎক্ষেপণের বরাত পেল হায়দরাবাদের সংস্থাটি। মার্কিন স্টার্টআপ রিফ্লেক্ট অরবিটাল তাদের ভবিষ্যতের মহাকাশযান কক্ষপথে পাঠাতে স্কাইরুটের বিক্রম সিরিজের রকেট ব্যবহার করবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক মহাকাশ বাজারে ভারতের বেসরকারি সংস্থার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ার ইঙ্গিত হিসাবেই দেখা হচ্ছে এই চুক্তিকে।
রিফ্লেক্ট অরবিটালের লক্ষ্য, মহাকাশে বিশেষ ধরনের প্রতিফলক বা আয়না বসিয়ে সূর্যের আলো পৃথিবীর নির্দিষ্ট এলাকায় প্রতিফলিত করা। সংস্থাটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, কক্ষপথে থাকা এই প্রতিফলক সূর্যালোককে পৃথিবীর নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দিতে পারবে। এর ফলে সূর্য ডোবার পরেও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সহায়তা, রাতে জরুরি উদ্ধারকাজে আলোর ব্যবস্থা এবং যেখানে প্রচলিত পরিকাঠামো নেই, সেখানে আলোকসজ্জার মতো সম্ভাব্য ব্যবহার তৈরি হতে পারে। তবে এই প্রযুক্তি এখনও বিকাশের পর্যায়ে। এর কার্যকারিতা, খরচ এবং পরিবেশের উপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।
মহাকাশে বসানো এই প্রতিফলকগুলিকে অনেকেই ‘স্পেস মিরর’ বা মহাকাশের আয়না বলে বর্ণনা করছেন। সহজ করে বললে, পৃথিবীর কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলে সূর্যের আলো পৌঁছে দেওয়ার জন্য মহাকাশে প্রতিফলক ব্যবহার করার পরিকল্পনা। আর সেই প্রযুক্তি বাস্তবায়নের পথে রিফ্লেক্ট অরবিটালের মহাকাশযানকে কক্ষপথে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পেতে চলেছে ভারতীয় সংস্থা স্কাইরুট। রিফ্লেক্ট অরবিটালের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী বেন নওয়াকের বক্তব্য, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মহাকাশে উপগ্রহ পাঠানোর জন্য উৎক্ষেপণ পরিষেবার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সেই তুলনায় রকেটের মাধ্যমে কক্ষপথে পৌঁছনোর সুযোগ সীমিত। নতুন উৎক্ষেপণ সংস্থার সঙ্গে কাজ করলে নির্দিষ্ট সময়ে মহাকাশযান পাঠানোর পরিকল্পনা করা সহজ হবে। স্কাইরুটের সঙ্গে এই চুক্তি সেই প্রয়োজন মেটাতে সাহায্য করবে বলে আশা মার্কিন সংস্থাটির।
স্কাইরুটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী পবন কুমার চন্দনা জানিয়েছেন, রিফ্লেক্ট অরবিটালের মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী মহাকাশ প্রকল্পের জন্যই বিক্রম সিরিজের রকেট তৈরি করা হচ্ছে। দুই সংস্থার এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে উৎক্ষেপণের সময়সূচি সম্পর্কে নিশ্চয়তা এবং অভিযানের প্রয়োজন অনুযায়ী নমনীয়তা দেওয়া সম্ভব হবে বলে তাঁর দাবি। ২০১৮ সালে ইসরোর প্রাক্তন দুই ইঞ্জিনিয়ার পবন কুমার চন্দনা ও নাগা ভারত ডাক্কা স্কাইরুট অ্যারোস্পেস প্রতিষ্ঠা করেন। লক্ষ্য ছিল, বেসরকারি উদ্যোগে এমন রকেট তৈরি করা, যা বাণিজ্যিক ভাবে উপগ্রহকে পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছে দিতে পারে। ২০২২ সালে সংস্থার বিক্রম-এস রকেটের উড়ান ভারতের বেসরকারি মহাকাশ শিল্পের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হয়ে উঠেছিল। তবে কক্ষপথে উপগ্রহ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা প্রমাণ করাই ছিল পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।
সেই পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসে ২০২৬ সালের ১৮ জুলাই। শ্রীহরিকোটার সতীশ ধবন মহাকাশ কেন্দ্র থেকে বিক্রম-১-এর প্রথম কক্ষপথ অভিযান সফল ভাবে সম্পন্ন হয়। ভারতের প্রথম বেসরকারি ভাবে তৈরি কক্ষপথে উপগ্রহ পাঠানোর রকেট হিসাবে ইতিহাস গড়ে এই যান। প্রথম উড়ানেই নির্দিষ্ট কক্ষপথে পৌঁছনো যে কোনও নতুন রকেটের পক্ষেই বড় সাফল্য। কারণ, রকেটের ইঞ্জিন, জ্বালানি ব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি এবং উড়ানের বিভিন্ন ধাপের মধ্যে সামঞ্জস্য ঠিকঠাক কাজ করছে কি না, প্রথম অভিযানে তারই কঠিন পরীক্ষা হয়।
বিক্রম-১-এর সাফল্যের পরে বিদেশি সংস্থার কাছ থেকে বাণিজ্যিক বরাত পাওয়া স্কাইরুটের কাছে তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এর আগে জার্মান সংস্থা ডিসিউবডও বিক্রম-১-এর প্রথম উড়ানে নিজেদের প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য পেলোড পাঠিয়েছিল। পরে অস্ট্রেলিয়ার মহাকাশ প্রযুক্তি সংস্থা হেক্স২০-র সঙ্গে একাধিক উৎক্ষেপণের চুক্তিও করে স্কাইরুট। এ বার আমেরিকার রিফ্লেক্ট অরবিটালের বরাত সংস্থার আন্তর্জাতিক ব্যবসার পরিধি আরও বাড়াল।
দীর্ঘদিন ধরে ভারতের মহাকাশ অভিযানের প্রধান ভরকেন্দ্র ছিল ইসরো। বেসরকারি সংস্থার প্রবেশের পরে সেই ছবিতে দ্রুত পরিবর্তন আসছে। এখন শুধু উপগ্রহ তৈরি নয়, রকেট নির্মাণ, উৎক্ষেপণ পরিষেবা এবং মহাকাশভিত্তিক প্রযুক্তির নানা ক্ষেত্রেও ভারতীয় উদ্যোগগুলি জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক গ্রাহকেরা ভারতীয় বেসরকারি সংস্থার উপর ভরসা রাখলে এই শিল্পে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে বাণিজ্যিক মহাকাশযাত্রার ক্ষেত্রে সাফল্যের মাপকাঠি শুধু একটি সফল উৎক্ষেপণ নয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্ভরযোগ্য পরিষেবা দেওয়া, খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ধারাবাহিক ভাবে রকেট উৎক্ষেপণের সক্ষমতা তৈরি করাও জরুরি। স্কাইরুটের সামনে এখন সেই চ্যালেঞ্জ। বিক্রম-১-এর প্রথম উড়ান আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের আস্থা বাড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই আস্থাকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায় রূপান্তর করাই হবে পরবর্তী পরীক্ষা।
ভারতের বেসরকারি মহাকাশশিল্পের জন্য এই চুক্তি তাই নিছক একটি বাণিজ্যিক বরাত নয়। এক দিকে মহাকাশে নতুন প্রযুক্তির পরীক্ষার সুযোগ, অন্য দিকে আন্তর্জাতিক উৎক্ষেপণ বাজারে জায়গা করে নেওয়ার লড়াই—দুই ক্ষেত্রেই স্কাইরুটের সামনে খুলছে নতুন দরজা।





