হাবিবুর রহমান, ঢাকা: চীনের সঙ্গে ঋণনির্ভর অর্থায়ন থেকে বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বের দিকে অগ্রসর হওয়া, বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের প্রস্তাব দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন কৌশল সামনে আনছে বাংলাদেশ। শুধু ঋণ সংগ্রহ নয়, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উন্নয়ন প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের কার্যকারিতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের চলমান বার্ষিক সভার ফাঁকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে অতিরিক্ত অর্থায়ন বা নতুন ঋণ কর্মসূচির কোনওটিই এখনও চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি।
গতকাল বুধবার সম্মেলনের তৃতীয় দিনে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থায়ন সম্পর্ককে সরকারি পর্যায়ের ঋণনির্ভর মডেল থেকে বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বের দিকে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ চলছে। চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি এ অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। ভবিষ্যতে চীনের অর্থায়নে ঋণের পরিবর্তে বিনিয়োগের অংশ বাড়ানোর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের অর্থনৈতিক নীতির প্রধান লক্ষ্য এখন বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
চীনের সঙ্গে অর্থায়নের ধরন পরিবর্তনের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশলে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সরকারি ঋণের পাশাপাশি সরাসরি বিনিয়োগ ও যৌথ অংশীদারত্ব বাড়ানো গেলে বেসরকারি পুঁজি আকৃষ্ট করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এই অবস্থানকে চীনের সঙ্গে বিদ্যমান ঋণচুক্তি বাতিল কিংবা চীনা অর্থায়ন বন্ধের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নতুন বিনিয়োগের পরিমাণ, চুক্তির শর্ত কিংবা প্রকল্পভিত্তিক কোনও চূড়ান্ত সমঝোতার ঘোষণা এখনও পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, আগামী তিন বছরে নিয়মিত সহায়তার বাইরে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন চেয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ১২ অক্টোবর বার্ষিক সভার প্রথম দিনে বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল ও বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাদের আলোচনায় এই প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও সারে ভর্তুকির চাপ এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অর্থায়ন পাওয়ার বিষয়টি এতে গুরুত্ব পেয়েছে।
১৩ অক্টোবর বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনা বিজার্দের সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী জানান, অতিরিক্ত অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা চলছে, তবে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আলোচনা ও পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে আরও কয়েক মাস লাগতে পারে। অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি, কর্মসূচি এবং মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বোঝাপড়া রয়েছে।
বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যে তিন বছর মেয়াদি কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক (সিপিএফ) চূড়ান্ত করার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। এই কাঠামোর মাধ্যমে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতার অগ্রাধিকার ও অর্থায়নের ক্ষেত্র নির্ধারিত হবে। অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবটি এই বৃহত্তর অংশীদারত্ব আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও অর্থায়ন অনুমোদিত হয়েছে—এমন কোনও ঘোষণা আসেনি।
বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থায়ন চাওয়ার পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের অঙ্গীকারও করেছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলির বাস্তবায়নকাল সাত বছর থেকে পাঁচ বছরে নামিয়ে আনার লক্ষ্য জানিয়েছে সরকার। প্রকল্প অনুমোদনের সময় ১৮ মাস থেকে আট মাসে কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে তা পাঁচ মাসে নামিয়ে আনার লক্ষ্যও তুলে ধরা হয়েছে। প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা গেলে উন্নয়ন অর্থায়নের সুফল দ্রুত পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এই লক্ষ্যগুলি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরবর্তী সময়ে মূল্যায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনা নিয়েও আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া। কিছু সংস্কার কখন এবং কোন পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করা, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এই আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
আইএমএফের সঙ্গে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে নতুন কর্মসূচির চূড়ান্ত শর্ত, সময়সূচি ও অনুমোদন এখনও নিশ্চিত হয়নি। সম্ভাব্য সংস্কার শর্তের মধ্যে ব্যাংক খাতের সমস্যা সমাধান ও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণের বিষয়টিও উঠে এসেছে। এ ক্ষেত্রে ঋণ আলোচনার অগ্রগতি এবং সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারের পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিয়ে এই আলোচনা এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। আইএমএফের সর্বশেষ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.২ শতাংশ হতে পারে। সংস্থাটির আগের পূর্বাভাস ছিল ৪.৩ শতাংশ। একই অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ১০.৯ শতাংশে পৌঁছতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি ব্যয় ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার পাশাপাশি বিনিয়োগের গতি এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের পরিমাণের পাশাপাশি অর্থের ব্যবহার কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। উন্নয়ন অর্থায়নের সুফল কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রকল্পের বাস্তব ফলাফলের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বেসরকারি পুঁজি আকৃষ্ট করা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিনিয়োগের পরিবেশ শক্তিশালী করার মাধ্যমে অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তব ফল নির্ভর করবে পরবর্তী নীতিগত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
ব্যাংককের বার্ষিক সভায় বাংলাদেশের আলোচনার তাৎপর্য তাই শুধু নতুন ঋণ সংগ্রহে সীমাবদ্ধ নয়। চীনের সঙ্গে অর্থায়নের ধরন পরিবর্তনের অভিপ্রায়, বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব, আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচি এবং উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের অঙ্গীকার—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন কাঠামো নিয়ে আলোচনা সামনে এসেছে।
একদিকে জ্বালানি ব্যয়, ভর্তুকি ও অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় বাংলাদেশের অর্থায়ন প্রয়োজন; অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে ঋণের ওপর নির্ভরতা নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এই দুই লক্ষ্যকে সমন্বয় করাই সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। ব্যাংককের সভায় বাংলাদেশের সামনে নতুন অর্থায়নের সম্ভাবনা ও নীতিগত আলোচনার সুযোগ তৈরি হলেও এর প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে পরবর্তী চুক্তি, অর্থায়নের শর্ত এবং বাস্তবায়নের ফলাফলে।
