নয়াদিল্লি: দেশের অন্যতম নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ)-তে পিএইচডি-তে ভর্তি ঘিরে নতুন করে বিতর্ক। তফসিলি জনজাতি (এসটি) পড়ুয়াদের জন্য সংরক্ষিত আসন বণ্টনে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে পিএইচডি-তে ভর্তির ক্ষেত্রে সংরক্ষণের নিয়ম যথাযথ ভাবে মানা হয়নি বলে অভিযোগ করেছে স্টুডেন্টস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (এসএফআই)। সেই অভিযোগ খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
গত ২৬ অক্টোবর জেএনইউয়ের উপাচার্যের তরফে কমিটি গঠনের বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। স্কুল অফ সোশ্যাল সায়েন্সেসের ডিন বিবেক কুমারের নেতৃত্বে তৈরি এই কমিটিতে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এসটি লিয়াজোঁ অফিসার, ইকুয়াল অপরচুনিটি অফিসের প্রধান উপদেষ্টা, ডেপুটি রেজিস্ট্রার (লিগ্যাল) এবং এসসি-এসটি-ওবিসি সেলের সহকারী রেজিস্ট্রার। প্রয়োজনে কমিটির বাইরে থেকেও অতিরিক্ত সদস্য নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে তদন্তকারী দলকে।
কী অভিযোগ ছাত্র সংগঠনের?
এসএফআইয়ের দাবি, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে জেএনইউয়ে পিএইচডি-র জন্য মোট ৭১১টি আসন ঘোষণা করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, তফসিলি জনজাতির পড়ুয়াদের জন্য ৭.৫ শতাংশ আসন সংরক্ষিত থাকার কথা। সেই হিসাবে ৭১১টি আসনের মধ্যে প্রায় ৫৩টি এসটি প্রার্থীদের জন্য বরাদ্দ হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি সংক্রান্ত প্রসপেক্টাসে মাত্র ৩৮টি আসনের উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ, সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১৫টি আসনের ঘাটতি রয়েছে।
শুধু এসটি সংরক্ষণ নয়, তফসিলি জাতি (এসসি) এবং বিশেষ ভাবে সক্ষম (পিডব্লিউডি) প্রার্থীদের আসন বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ছাত্র সংগঠনটি। এসএফআইয়ের অভিযোগ, ১৫ শতাংশ সংরক্ষণের নিয়ম অনুযায়ী এসসি প্রার্থীদের জন্য প্রায় ১০৭টি আসন বরাদ্দ হওয়া উচিত ছিল। অথচ প্রসপেক্টাসে রয়েছে ১০৩টি। অন্য দিকে, বিশেষ ভাবে সক্ষম প্রার্থীদের জন্যও নির্ধারিত সংরক্ষণের তুলনায় কম আসন রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ।
কেন উঠছে অনিয়মের অভিযোগ?
এসএফআইয়ের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কেন্দ্র ও বিষয়ভিত্তিক বিভাগে আলাদা আলাদা ভাবে সংরক্ষণের হিসাব করার পদ্ধতির কারণেই এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। সংগঠনের অভিযোগ, 'মাইক্রো ইউনিট' পদ্ধতিতে প্রতিটি কেন্দ্র এবং বিভাগ ধরে সংরক্ষণের হিসাব করা হচ্ছে। ফলে যেখানে আসন সংখ্যা কম, সেখানে সংরক্ষণের নির্দিষ্ট শতাংশ কার্যকর করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে এসসি ও এসটি প্রার্থীদের জন্য কোনও আসনই রাখা হচ্ছে না।
এ ছাড়াও ইউজিসি-নেট, ইউজিসি-নেট-জেআরএফ এবং গেট—এই তিনটি পৃথক মাধ্যমে পিএইচডি-তে ভর্তির আসন ভাগ করে দেওয়ার পদ্ধতি নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯টি কেন্দ্রে এসসি ও এসটি—দুই শ্রেণির প্রার্থীদের জন্যই কোনও আসন বরাদ্দ করা হয়নি। তদন্ত কমিটিতে পড়ুয়াদের প্রতিনিধিত্বের দাবি এ দিকে, তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও তাতে পড়ুয়াদের প্রতিনিধিত্ব রাখার দাবি তুলেছে জেএনইউ ছাত্র সংসদ (জেএনইউএসইউ)। তাদের বক্তব্য, পড়ুয়াদের অভিযোগের ভিত্তিতেই যখন তদন্ত হচ্ছে, তখন তদন্ত প্রক্রিয়ায় তাঁদের প্রতিনিধিদেরও অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া উচিত।
এই বিতর্কে ইতিমধ্যেই হস্তক্ষেপ করেছে জাতীয় তফসিলি জাতি কমিশন। জেএনইউ ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি গোপিকা বাবুর অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখছে কমিশন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে সংরক্ষিত আসন বণ্টন সংক্রান্ত তথ্য এবং অভিযোগের ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ করা হয়েছে, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। জাতীয় তফসিলি জনজাতি কমিশনও বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপ করেছে বলে জানিয়েছে এসএফআই।
সব মিলিয়ে, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি-তে ভর্তি প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণের নিয়ম কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। এসএফআইয়ের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে চলতি শিক্ষাবর্ষের ভর্তি প্রক্রিয়ায় সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। এখন নজর পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির রিপোর্টের দিকে। সংরক্ষিত আসনের বণ্টনে সত্যিই কোনও গরমিল হয়েছে কি না, এবং হয়ে থাকলে তা কী ভাবে সংশোধন করা হবে, সেটাই দেখার।




