মালদহ, নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে রোগীর পাশে থাকার কথা চিকিৎসক, নার্স এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের। কিন্তু মালদহ মেডিক্যাল কলেজে দেখা গেল অন্য ছবি। রোগীর শয্যার একেবারে পাশে রাখা হয়েছে ইঁদুর ধরার কল। রাত বাড়লেই ওয়ার্ডের ভিতর ইঁদুরের ছোটাছুটি! এমনই অভিযোগ রোগী ও তাঁদের পরিজনদের। কখনও খাবারে মুখ দিচ্ছে, কখনও বিছানার কাছে চলে আসছে। কয়েক জন রোগীকে ইঁদুরে কামড়েছে বলেও অভিযোগ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও ইঁদুরের উৎপাতের কথা অস্বীকার করেনি। বরং রোগীদের যাতে ক্ষতি না হয়, সে জন্যই শয্যার পাশে ইঁদুর ধরার কল রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মেডিক্যাল কলেজের সুপার প্রসেনজিৎ বর।
রোগী ও তাঁদের আত্মীয়দের অভিযোগ, এই সমস্যা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই মালদহ মেডিক্যাল কলেজের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ইঁদুরের দাপট চলছে। দিনের তুলনায় রাতেই পরিস্থিতি বেশি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। আলো-আঁধারি ওয়ার্ডে রোগীর বিছানার তলা দিয়ে কিংবা দেওয়ালের পাশ দিয়ে ইঁদুর ছুটে বেড়ায়। অসুস্থ রোগীদের অনেকেই আতঙ্কে ঘুমোতে পারছেন না বলে অভিযোগ।
সমস্যা শুধু উৎপাতেই থেমে নেই। রোগীদের অভিযোগ, ওয়ার্ডে রাখা খাবারেও ইঁদুর মুখ দিচ্ছে। ফলে চিকিৎসাধীন রোগীদের স্বাস্থ্য এবং সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কয়েক জন রোগীকে ইঁদুরে কামড়ানোর অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে।
হাসপাতালের সুপার প্রসেনজিৎ বর ইঁদুরের দৌরাত্ম্যের কথা মেনে নিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘অসুস্থ রোগীদের যাতে কোনও ক্ষতি না হয়, তাই ইঁদুর ধরার কল রাখা হয়েছে শয্যার পাশে।’’ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, ইতিমধ্যেই ‘পেস্ট কন্ট্রোল’ করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও পুরোপুরি সমস্যার সমাধান হয়নি। সুপারের ব্যাখ্যা, হাসপাতালের বিভিন্ন জায়গায় ফল্স সিলিং থাকায় ইঁদুরের যাতায়াত বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এর মধ্যেই হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রোগীদের একাংশের অভিযোগ, কয়েকটি ওয়ার্ডের মেঝেতে জল জমে রয়েছে। অসুস্থ রোগীদের সেই জলের মধ্য দিয়েই যাতায়াত করতে হচ্ছে। ফলে এক দিকে ইঁদুরের আতঙ্ক, অন্য দিকে জল জমে থাকা- দুইয়ে মিলে ওয়ার্ডের পরিবেশ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে।
সুপারের বক্তব্য, পাইপলাইনের সমস্যার কারণে কয়েকটি ওয়ার্ডে জল জমেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাফাইকর্মীদের কাজ না করার সমস্যা। তাঁর দাবি, বেতনের দাবিতে সাফাইকর্মীরা কাজ করছেন না। ফলে হাসপাতালের পরিষেবা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে প্রভাব পড়েছে। তবে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোরও। ইংরেজবাজার বিধানসভার প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক তথা বিজেপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শ্রীরূপা মিত্র চৌধুরী হাসপাতালের পরিস্থিতি নিয়ে সরব। তাঁর বক্তব্য, ‘‘ইঁদুর ধরার যন্ত্র রয়েছে মানে মালদহ মেডিক্যাল কলেজে ইঁদুর রয়েছে। হাসপাতালের ওয়ার্ডে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। সরকার বদলেছে। কিন্তু সরকারি আধিকারিকদের পরিবর্তন ঘটেনি। তাই এমন পরিস্থিতি।’’ বিষয়টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে তুলে ধরবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
তবে রাজনৈতিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বাইরে রোগী ও পরিজনদের প্রশ্নটাই এখন বড়, চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসে কেন ইঁদুরের আতঙ্কে রাত কাটাতে হবে? হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ইঁদুর ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু শয্যার পাশে ইঁদুর ধরার কল রাখার মতো পরিস্থিতি যে সরকারি হাসপাতালের স্বাস্থ্যবিধি ও পরিকাঠামো নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলছে, তা মানছেন সকলেই। ইঁদুরের উৎপাত, ওয়ার্ডে জল জমা এবং সাফাইকর্মীদের কর্মবিরতি—একসঙ্গে তিন সমস্যায় মালদহ মেডিক্যাল কলেজের পরিষেবা এখন কার্যত চাপে।