নয়াদিল্লি, নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: বয়স মাত্র ১৬। অথচ ওজন প্রায় ২৭৫ কেজি! এমন চরম স্থূলতার কারণে সাধারণ গাড়িতেও জায়গা হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত ‘ম্যাটাডর’ ভ্যানে করে কিশোরকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয় পরিবারকে। দিল্লির স্যার গঙ্গারাম হাসপাতালে পৌঁছনোর পর চিকিৎসকেরা দেখেন, শুধু অতিরিক্ত ওজনই নয় তার সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে একাধিক গুরুতর শারীরিক সমস্যা। তীব্র শ্বাসকষ্ট, অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে সংক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল।
কিশোরটির বিএমআই প্রায় ১০০-র কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর ছিল যে অস্ত্রোপচারের আগে প্রায় দু’সপ্তাহ পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে রেখে শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল করার চেষ্টা করেন চিকিৎসকেরা। এরপর একাধিক বিভাগের বিশেষজ্ঞ মিলে ঠিক করেন, এই অবস্থায় ওজন কমানোর জন্য ব্যারিয়াট্রিক সার্জারিই সবচেয়ে উপযুক্ত পথ।
অস্ত্রোপচারটিও মোটেই সহজ ছিল না। বয়স কম, ওজন বিপুল, তার উপর তীব্র স্লিপ অ্যাপনিয়া অ্যানাস্থেশিয়া থেকে শুরু করে রোগীকে অস্ত্রোপচারের টেবিলে সঠিক ভাবে রাখা, ল্যাপারোস্কোপিক অস্ত্রোপচার এবং অস্ত্রোপচারের পর শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ প্রতিটি ধাপেই ছিল বড় ঝুঁকি। পরিস্থিতি সামলাতে প্রায় ২০ জন বিশেষজ্ঞের একটি দল তৈরি করা হয়। শিশু-ক্রিটিক্যাল কেয়ার, ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি, পেডিয়াট্রিক গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজি, কার্ডিয়োলজি এবং অ্যানাস্থেশিয়া একাধিক বিভাগের চিকিৎসকেরা যুক্ত ছিলেন।
শেষ পর্যন্ত সফল হয় অস্ত্রোপচার। চিকিৎসকেরা ল্যাপারোস্কোপিক স্লিভ গ্যাস্ট্রেকটমি করেন। এই অস্ত্রোপচারে পাকস্থলীর একটি বড় অংশ বাদ দিয়ে তার আয়তন কমিয়ে দেওয়া হয়, যাতে কম খাবারেই পেট ভরা অনুভূতি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে ওজন কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
চিকিৎসকদের নেতৃত্বে ছিলেন স্যার গঙ্গারাম হাসপাতালের ডক্টর দক্ষ শেঠি, ডক্টর সুধীর কালহান, ডক্টর মুকুন্দ খেতন এবং ডক্টর সুবীরাজ জন। তাঁদের বক্তব্য, এটি কোনও ‘রুটিন’ ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি ছিল না। কিশোরের বয়স, বিপুল ওজন এবং গুরুতর স্লিপ অ্যাপনিয়ার কারণে অস্ত্রোপচারের প্রতিটি ধাপ আগেভাগে পরিকল্পনা করতে হয়েছে।
অস্ত্রোপচারের পর অবশ্য দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন কিশোরটি। মাত্র তিন দিন পরই হাসপাতাল থেকে ছাড়া হয় তাকে। তবে আসল লড়াই তখনও বাকি। অস্ত্রোপচারের পর নিয়মিত চিকিৎসা, নির্দিষ্ট ডায়েট এবং ওজন নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনার মধ্যে রাখা হয়েছে তাকে।
আর সেই চিকিৎসার ফলও ইতিমধ্যেই নজরে পড়েছে। অস্ত্রোপচারের প্রায় দু’মাস পর তাঁর ওজন ২৭৫ কেজি থেকে কমে প্রায় ২২৩ কেজি হয়েছে। অর্থাৎ কমেছে প্রায় ৫২ কেজি। চিকিৎসকেরা অবশ্য স্পষ্ট করেছেন, লক্ষ্য শুধু ওজন কমানো নয়। দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসকষ্ট ও স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো সমস্যা কমানো, চলাফেরার ক্ষমতা বাড়ানো এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান উন্নত করাই তাঁদের আসল লক্ষ্য।
চিকিৎসকদের বক্তব্য, এত কম বয়সে ব্যারিয়াট্রিক অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত কখনওই হালকা ভাবে নেওয়া যায় না। এই কিশোরের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ওজন ইতিমধ্যেই দৈনন্দিন জীবন ও স্বাস্থ্যের উপর গুরুতর প্রভাব ফেলেছিল। তাই অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্তের আগে পরিবারকে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এবং একাধিক বিভাগের বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন করা হয়।
এখনও নিয়মিত চিকিৎসকদের নজরদারিতে রয়েছে কিশোরটি। চলছে কাঠামোবদ্ধ ওজন-নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি। চিকিৎসকদের আশা, ধীরে ধীরে ওজন আরও কমবে, চলাফেরার ক্ষমতা বাড়বে এবং স্থূলতার কারণে তৈরি হওয়া দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিগুলিও কমবে।
১৬ বছরের শরীরে ২৭৫ কেজির বোঝা শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শুরু হল নতুন লড়াই। দু’মাসেই ৫২ কেজি ওজন কমার পর এখন চিকিৎসকদের নজর একটাই দিকে এই কিশোরকে ফের স্বাভাবিক, সক্রিয় জীবনে ফিরিয়ে আনা।