প্রিয় ক্রিশ্চিয়ানো, এই দিনটা যে একদিন আসবে, ফুটবলের এই নিষ্ঠুর নিয়ম যে তোমাকেও একদিন ছুঁয়ে যাবে, তা হয়ত মস্তিষ্কের কোনও এক নিভৃত কোণে আগে থেকেই জমিয়ে রাখা ছিল। কিন্তু মন কি আর সব সময় যুক্তির ধার ধারে? যখন তোমার বুটজোড়া চিরকালের মতো তুলে রাখার খবরটা সারা বিশ্বে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল, তখন বুকের ভেতরটা কেমন যেন হু হু করে উঠল। মনে হল, আমার যৌবনের একটা বড় অংশ চিরকালের মতো হারিয়ে গেল। চোখের কোণে কখন যে জল জমেছে, টেরই পাইনি। একটা অবসর, একটা যুগের অবসান, জীবন্ত এক রূপকথার সমাপ্তি যে এভাবে ঘটবে, তা ভাবিনি। একবারের জন্যও দেশকে বিশ্বকাপ দিতে পারোনি, মরমে মরে যাচ্ছিলে, এই তো কয়েকদিন আগেই বিশ্বকাপ থেকে সেদিন বিদায় নিল পর্তুগাল, যেদিন তোমার চোখের কোণে জল দেখেছিলাম, এবারেও পারলে না। তুমি পারতে চেয়েছিলে, ভীষণভাবে, কিন্তু অদৃষ্ট তোমায় এই উপহারটা পেতে দেয়নি। সেদিনই বোধহয় সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলেছিলে, ক্রিশ্চিয়ানো!
জানো ক্রিশ্চিয়ানো, হাজার হাজার মাইল দূরের এই বাংলায় বসে তোমার খেলা দেখতে দেখতে কবে যে তুমি আমার জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিলে, তা আমি নিজেই জানি না। আটলান্টিকের বুকে পর্তুগালের ছোট্ট দ্বীপ মাদেইরা থেকে উঠে আসা এক অখ্যাত, দরিদ্র পরিবারের ছেলে যখন নিজের জেদ আর পরিশ্রমে বিশ্বজয়ী হয়ে ওঠে, তখন সে শুধু আর একজন ফুটবলার থাকে না; সে হয়ে ওঠে কোটি কোটি মানুষের বেঁচে থাকার, লড়াই করার জ্বলন্ত অনুপ্রেরণা। তোমার জীবনের গল্পটা তো শুধু ফুটবলের নয়, তোমার গল্পটা হল হার না মানা এক অদম্য জেদের। সেই যে ২০০৩ সালে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের হাত ধরে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে পা রাখলে এক ছিপছিপে, কোঁকড়ানো চুলের পর্তুগিজ তরুণ, সেই থেকেই তোমার প্রেমে পড়া। তোমার সেই অভাবনীয় গতি, পায়ের সেই জাদুকরী স্টেপ-ওভার, আর প্রতিপক্ষকে বোকা বানিয়ে বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে যাওয়া, সবই যেন ছিল অদ্ভুত মায়া। ৭ নম্বর জার্সিটার যে একটা আলাদা ওজন আছে, জর্জ বেস্ট, এরিক ক্যান্টোনা বা ডেভিড বেকহ্যামের পর সেই জার্সির মর্যাদা যে তুমি এতটা উঁচুতে নিয়ে যাবে, তা হয়ত শুরুতে অনেকেই ভাবেনি। কিন্তু তুমি প্রমাণ করেছিলে, তুমি কারও ছায়া হতে আসোনি, তুমি এসেছিলে নিজের এক বিশাল সাম্রাজ্য তৈরি করতে। তুমি হয়ে উঠেছিলে ম্যানচেস্টারের চোখের মণি, ফার্গির নিজের ছেলের মতো।
এরপর সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর সেই শুভ্র সাদা জার্সি। রিয়াল মাদ্রিদে তুমি যা করেছ, তা ফুটবলের ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তুমি যেন মানুষ ছিলে না, ছিলে এক গোলমেশিন। এল ক্লাসিকোর সেই টানটান উত্তেজনার রাতে ক্যাম্প ন্যু-তে গিয়ে যখন তুমি দর্শকদের শান্ত হওয়ার ইশারা করতে (Calma, I am here), তখন আমাদের শিরায় শিরায় অ্যাড্রেনালিন ছুটে যেত। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের রাত মানেই ছিল তোমার রাত, তুমি ছিলে ‘মিস্টার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ’। যখনই দল বিপদে পড়েছে, যখনই মনে হয়েছে সব শেষ, তখনই ত্রাতা হয়ে তোমার আবির্ভাব। জুভেন্টাসের বিরুদ্ধে সেই অবিস্মরণীয় বাইসাইকেল কিক! মাটি থেকে অত উঁচুতে শূন্যে ভেসে ওই শট, স্বয়ং ঈশ্বরও হয়ত সেদিন গ্যালারিতে বসে তোমার ওই গোলের প্রশংসা করেছিলেন।
পর্তুগাল জাতীয় দলের হয়ে তোমার অবদান ফুটবলের ইতিহাসে চিরকাল লেখা থাকবে, কেউ কোনওদিন ভুলবে না। ২০১৬ সালের ইউরো কাপের ফাইনালের সেই রাতের কথা মনে পড়লে আজও আমার গায়ে কাঁটা দেয়। চোট পেয়ে যখন তুমি স্ট্রেচারে মাঠ ছাড়ছিলে, তোমার চোখের সেই জল আমাদের কোটি কোটি ভক্তের হৃদয় ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। কিন্তু তুমি তো হার মানতে শেখোনি। পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে ডাগআউটে দাঁড়িয়ে তুমি যেভাবে দলকে নির্দেশ দিচ্ছিলে, তা প্রমাণ করেছিল তুমি শুধু একজন অধিনায়ক নও, তুমি অকুতোভয় সেনাপতি। তোমার ওই জেদই সেদিন পর্তুগালকে চ্যাম্পিয়ন করেছিল। আবার ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সেই দিনটির কথাও ভুলতে পারি না। টানেল দিয়ে একা মাথা নিচু করে তোমার হেঁটে যাওয়া আর দু’হাতে মুখ ঢেকে শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে ওঠার দৃশ্য, আমার পক্ষে তা সহ্য করা সম্ভব ছিল না। আমরা সেদিন তোমার সঙ্গে কেঁদেছিলাম, জানো! বিশ্বজয়ের ট্রফিটা হয়ত তোমার অধরা থেকে গেল, কিন্তু তুমি যা জিতেছ, কোটি কোটি মানুষের এই নিঃশর্ত ভালবাসা, তা ক’জন পায়?
অনেকে বলে ফুটবলে নাকি জন্মগত প্রতিভা লাগে। তুমি শিখিয়েছ, প্রতিভাকে যদি কঠোর পরিশ্রম দিয়ে ঘষে মেজে ধারালো করা যায়, তবে সেই প্রতিভাকে ছাপিয়ে যাওয়া সম্ভব। লিওনেল মেসির সঙ্গে তোমার সেই মহাকাব্যিক দ্বৈরথ বিশ্ব ফুটবলে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তোমরা দুজনে মিলে ফুটবলকে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলে, তা এক অকল্পনীয় রূপকথা। তোমার ঘাম, রক্ত, তোমার একনিষ্ঠ সাধনা, এ সব কিছুই তোমাকে ‘সিআরসেভেন’ (CR7) বানিয়েছে। রাত তিনটের সময় যখন সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন তুমি জিমে ঘাম ঝরিয়েছ। নিজের শরীরকে তুমি পরিণত করেছিলে ইস্পাতের দুর্গে। তোমার এই স্পার্টান জীবনযাপন আমাকে শিখিয়েছে, জীবনে যদি কিছু পেতে হয়, তবে তার জন্য নিজের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করতে হয়। তোমার সেই বিখ্যাত ‘নাকলবল’ ফ্রি-কিক! পোর্টসমাউথের বিরুদ্ধে সেই রকেট শট কিংবা ২০১৮ বিশ্বকাপে স্পেনের বিরুদ্ধে শেষ মুহূর্তে সেই জাদুকরী গোল, এসব কি কখনও ভোলার? যখন তুমি বিদায় নিচ্ছ, তখন মনে হচ্ছে ফুটবলের একটা ডানা যেন ভেঙে পড়ল। সেই উত্তেজনা, সেই উন্মাদনা সব যেন ইতিহাস হয়ে গেল। আজ আমি, শুধু একজন সাধারণ ফুটবল ভক্ত হিসেবে তোমাকে চিঠি লিখছি না।
আমি লিখছি এমন একজন মানুষ হিসেবে, যার জীবনের বহু অন্ধকার রাতে তোমার খেলা, তোমার লড়াই আমাকে বেঁচে থাকার রসদ জুগিয়েছে। যখন নিজের জীবনে ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছি, যখন মনে হয়েছে আর পারব না, তখন তোমার ওই শূন্যে লাফিয়ে উঠে দু’হাত ছড়িয়ে ‘সিউউউ’ (Siuuu) করার দৃশ্য আমার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। মনে হয়েছে, ক্রিশ্চিয়ানো যদি মাদেইরার ওই ছোট্ট কুঁড়েঘর থেকে উঠে এসে বিশ্বকে শাসন করতে পারে, বাবার মৃত্যুশোক বুকে চেপে মাঠে নেমে গোল করতে পারে, তবে আমি কেন পারব না? তুমি আমার কাছে শুধু একজন ক্রীড়াবিদ নও, তুমি আমার জীবনের এক নীরব শিক্ষকও। আমার ঘরের দেওয়ালে সাঁটানো তোমার সেই বিশাল পোস্টারটার দিকে আজ যখন তাকাচ্ছি, তখন চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। কত রাত জেগেছি শুধু তোমার খেলা দেখব বলে। জানি, পরদিন সকালে অফিস যাওয়ার তাড়া থাকবে, তবুও আগের রাতে টিভির সামনে বসে পড়েছি, শুধু তোমার ওই পায়ের জাদু দেখার জন্য।
এখন উইকএন্ডের রাতগুলো বড্ড বেশি নিস্তব্ধ হয়ে যাবে। ধারাভাষ্যকারের গলায় আর শোনা যাবে না, ‘হিয়ার কামস ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোওওও!’ এই নিস্তব্ধতা আমি, আমরা কীভাবে মেনে নেব? শেষের দিকে হয়ত তোমার সেই আগের মতো গতি ছিল না, সমালোচকদের তীক্ষ্ণ বাণ বারবার তোমাকে বিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আমরা, তোমার সত্যিকারের ভক্তরা, তোমাকে কখনই তোমার পরিসংখ্যান বা বয়স দিয়ে বিচার করিনি। আমরা তোমাকে ভালবেসেছি তোমার প্যাশনের জন্য। মাঠে নামার আগে তোমার চোখে যে জয়ের আগুন জ্বলত, সেই আগুনের জন্য। তোমার অবসরের সঙ্গে সঙ্গে ফুটবল মাঠের সেই আগুনটাও যেন চিরকালের মতো নিভে গেল।
আগামী দিনে হয়ত ফুটবলে আরও অনেক নতুন তারকার জন্ম হবে। হয়ত কেউ তোমার চেয়েও বেশি গোল করবে, হয়ত কেউ আরও বেশি ট্রফি জিতবে। কিন্তু ফুটবল দ্বিতীয় ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো পাবে না।
ফুটবলের সবুজ গালিচায় তোমার মতো রাজকীয় পদচারণা আর কারও হবে না। রবিবার রাতের টিভিতে আর তোমার জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকব না ভেবেই বুকের ভেতরটা শূন্যতায় হাহাকার করে উঠছে। ভালো থেকো ক্রিশ্চিয়ানো। ফুটবলকে তুমি যা দিয়েছ, তার জন্য আমরা চিরকৃতজ্ঞ। তোমার আগামী জীবন তোমার পরিবারের সঙ্গে সুন্দর হোক, শান্তিময় হোক। আমাদের মতো কোটি কোটি ভক্তের হৃদয়ে তুমি চিরকাল ‘গোট’ (Greatest Of All Time) হয়েই থাকবে। বিদায়, হে ফুটবলের রাজপুত্র। বিদায়, আমার যৌবনের নায়ক। তুমি না থাকলেও, তোমার কীর্তি, তোমার আবেগ, আর ওই ‘সিউউউ’ চিৎকার আমাদের হৃদয়ে আজীবন প্রতিধ্বনিত হবে।
ইতি, তোমার একনিষ্ঠ ভক্ত ও অনুরাগী,
দিব্যেন্দু ঘোষ




