নিউজ ডেস্ক: বাবা নারকেল চাষি। সংসার চলে নারকেল আর তার শাঁস বিক্রি করে। প্রত্যন্ত দ্বীপের ছোট্ট গ্রাম কিণিউকা থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন দেখছে ১৬ বছরের এক কিশোরী। নাম আই এস ব্রিডনি। আর্থিক অনটন, অনুশীলনের উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাব, ভেলোড্রোম না থাকা—কোনও কিছুই আটকে রাখতে পারেনি তাকে। ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে সাইক্লিংয়ের জাতীয় প্রতিযোগিতায় সোনা জয়ের পাশাপাশি জাতীয় রেকর্ড গড়ে এখন দেশের ক্রীড়ামহলের নজর কেড়েছে নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের এই প্রতিভা।
গত ৩ নভেম্বর রাঁচির খেলগাঁওয়ে আয়োজিত ৭৮তম সিনিয়র, ৫৫তম জুনিয়র এবং ৪১তম সাব-জুনিয়র জাতীয় ট্র্যাক সাইক্লিং প্রতিযোগিতায় নতুন ইতিহাস লিখেছে ব্রিডনি। সাব-জুনিয়র মহিলা বিভাগের ৫০০ মিটার ব্যক্তিগত টাইম ট্রায়ালে সময় করেছে ৩৭.৪৭৯ সেকেন্ড। ভেঙে দিয়েছে তৃষা পালের গড়া ৩৮.৭০০ সেকেন্ডের জাতীয় রেকর্ড। এশীয় প্রতিযোগিতায় পদকজয়ী তৃষার রেকর্ড ভেঙে সোনা জেতা যে কোনও কিশোরীর কাছেই বড় কৃতিত্ব। কিন্তু ব্রিডনির লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট জানলে এই সাফল্যের মাহাত্ম্য আরও বেড়ে যায়।
নিকোবরের কিণিউকা গ্রামের বাসিন্দা ব্রিডনির বাবা রুথার নারকেল চাষ করেন। নারকেলের শাঁস বিক্রি করেই চলে সংসার। মা জুনিয়া গৃহবধূ। এমন পরিবারের পক্ষে মেয়ের খেলাধুলোর স্বপ্ন পূরণ করা সহজ ছিল না। প্রথমে ফুটবল এবং ১০০ মিটার দৌড়ে আগ্রহ ছিল ব্রিডনির। ২০২২ সালের নভেম্বরে বাছাই পর্বে তার সাইক্লিংয়ের প্রতিভা নজরে পড়ে প্রশিক্ষক বিশ্বজিৎ বালকৃষ্ণ সুতারের। তাঁর উৎসাহেই নতুন খেলায় পা রাখা। ২০২৩ সালে ভারতীয় ক্রীড়া কর্তৃপক্ষের কার নিকোবর প্রশিক্ষণকেন্দ্রে যোগ দেয় সে।
কিন্তু সেখানে সাইক্লিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ভেলোড্রোম কিংবা প্রতিযোগিতার উপযুক্ত সরঞ্জাম ছিল না। হাল ছাড়েননি প্রশিক্ষক। তিরুঅনন্তপুরম ও মহারাষ্ট্রের কোলাপুরে নিজের পুরনো প্রশিক্ষণার্থীদের সাহায্যে প্রতিযোগিতার উপযুক্ত সরঞ্জাম জোগাড় করেন তিনি। কলকাতার জাতীয় উৎকর্ষ কেন্দ্রও আর্থিক, প্রশাসনিক ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে পাশে দাঁড়ায়। তিরুঅনন্তপুরম ও রাঁচিতে প্রশিক্ষণ শিবির, পুষ্টি সংক্রান্ত পরামর্শ এবং বিশেষজ্ঞদের সাহায্য ব্রিডনির প্রস্তুতিকে আরও মজবুত করে।
এটাই অবশ্য তার প্রথম সাফল্য নয়। ২০২৪-২৫ মরশুমে চেন্নাইয়ে জাতীয় ট্র্যাক সাইক্লিং প্রতিযোগিতায় সোনা জিতেছিল সে। স্কুল জাতীয় প্রতিযোগিতার দলগত স্প্রিন্টেও সাফল্য পেয়েছে। ২০২৫-২৬ মরশুমে রুদ্রপুরে অনূর্ধ্ব-১৬ বিভাগে জিতেছিল রুপো। এ বার রাঁচিতে মণিপুরের ফ্লোরেন্স দেবী, মহারাষ্ট্রের গায়ত্রী তাম্বেভকরদের পিছনে ফেলে জাতীয় রেকর্ড গড়েছে সে।
প্রায় তিন মাস আগে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী স্টেডিয়ামে জাতীয় উৎকর্ষ কেন্দ্রের প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত হয়েছে ব্রিডনি। বিদেশি প্রশিক্ষক মার্ক প্যাকারের তত্ত্বাবধানে চলছে অনুশীলন। এবার লক্ষ্য এশিয়ান গেমসে দেশের হয়ে পদক জয়। প্রশিক্ষক সুতারের বিশ্বাস, সঠিক সুযোগ ও ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ পেলে একদিন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপেও পদক জিততে পারে তাঁর ছাত্রী।
নারকেল বাগানের ছোট্ট গ্রাম থেকে জাতীয় রেকর্ডের মঞ্চে পৌঁছনোর এই কাহিনি শুধু এক কিশোরীর সাফল্যের নয়। স্বপ্ন দেখার সাহস, পরিবারের ত্যাগ আর একজন প্রশিক্ষকের বিশ্বাস কীভাবে প্রতিকূলতাকে হার মানাতে পারে, ব্রিডনি তারই উদাহরণ। এবার ৫০০ মিটারের গণ্ডি পেরিয়ে আরও বড় দৌড়ের অপেক্ষায় সে। লক্ষ্য, দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্যের পতাকা ওড়ানো।




