বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো। প্রকৃতির রূপ, বাঙালির আবেগ এবং পুজোর ঐতিহ্য শিল্পীর মনকে যেভাবে স্পর্শ করেছে, তার প্রকাশ ঘটেছে বহুকাল ধরে ক্যানভাসে। দুর্গার নানা রূপের ছবি আমরা সকলেই দেখেছি। তবে বাংলায় বিসর্জনকে কেন্দ্র করে আঁকা বেশ কিছু বিখ্যাত ছবির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিশেষ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট। প্রখ্যাত বাঙালি শিল্পী থেকে শুরু করে ব্রিটিশ চিত্রকর,অনেকেই তাঁদের ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন দুর্গাপ্রতিমার বিসর্জন ও তাকে ঘিরে থাকা আবেগের নানা রূপ।
কেউ পুরাণের কাহিনি অবলম্বনে এঁকেছেন দেবীর চিরাচরিত রূপ। কারও ছবির অনুপ্রেরণা এসেছে বাংলার লোকসংস্কৃতি ও ঘরোয়া আখ্যান থেকে। আবার কেউ শিল্পের উপকরণ হিসেবে বেছে নিয়েছেন সাহিত্যের নানা অনুষঙ্গ। এমন ছবিও রয়েছে, যেখানে বছরভর আকুল অপেক্ষার পর ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাপের বাড়িতে আসা আদরের মেয়ে উমাকে নদীর ঘাটে বিদায় জানানোর ব্যস্ততায় মগ্ন মা মেনকার আবেগ ধরা পড়েছে। এইসব চিত্রকর্মে মিশে রয়েছে আপামর বাঙালির চেনা অনুভূতি,মেয়ের ঘরে ফেরার আনন্দ, আর তাকে বিদায় জানানোর বুকভরা বেদনা।
টমাস ডানিয়েলের তুলিতে ঊনবিংশ শতকের বিসর্জন
ব্রিটিশ চিত্রকর টমাস ডানিয়েলের আঁকা দুর্গাপ্রতিমার বিসর্জনের একটি প্রাচীন চিত্র সংরক্ষিত রয়েছে কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে। ১৮১০ সালের বিজয়া দশমীর প্রেক্ষাপটে আঁকা এই ছবিতে ধরা পড়েছে তৎকালীন কলকাতার গঙ্গার ঘাটে দুর্গাপুজো ও বিসর্জনকে ঘিরে থাকা দৃশ্যপট।
সোনালি আলোয় রাঙা আকাশ, দুপুরের মেঘ কেটে যাওয়ার পর উজ্জ্বল হয়ে ওঠা প্রকৃতি,সব মিলিয়ে এক অনন্য পরিবেশ। সেই সময়ের কলকাতার উৎসবমুখর আবহকে নিজের তুলিতে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন শিল্পী। তাঁর ছবিতে কেবল বিসর্জনের দৃশ্যই নয়, ধরা পড়েছে ঔপনিবেশিক আমলের কলকাতার সামাজিক জীবন, ধর্মীয় আচার এবং গঙ্গার ঘাটকে ঘিরে থাকা জনসমাগমের এক ঐতিহাসিক দলিল।
গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিতে আলো-আঁধারির বিষাদ
১৯১৫ সালে আঁকা গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রতিমা বিসর্জন’ ছবিতে ধরা পড়েছে দশমীর রাতের এক রহস্যময় দৃশ্য। মশালের আলোয় আলোকিত উত্তর কলকাতার রাস্তা, বিসর্জনের শোভাযাত্রাকে ঘিরে মানুষের ভিড় এবং উৎসবের ব্যস্ততা,সব মিলিয়ে ছবিটি যেন এক জীবন্ত সময়ের প্রতিচ্ছবি।
শোভাযাত্রার আগে সম্ভবত দেবীবরণ চলছে। অন্ধকারের বুক চিরে ছড়িয়ে পড়েছে মশালের আলো। দোতলা বাড়ির ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে বিসর্জন দেখছেন অন্তঃপুরের মহিলারা। রহস্যময় আলো-আঁধারিতে ঘেরা চিত্রপটের প্রায় কেন্দ্রভাগে সোনালি আলোর আভায় ফুটে উঠেছে প্রতিমার মায়াবী অবয়ব।
ছবিটি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবের দৃশ্য তুলে ধরে না, বরং সমকালীন কলকাতার সামাজিক জীবন ও পরিবর্তনশীল নগরসংস্কৃতিরও ইঙ্গিত দেয়। গগনেন্দ্রনাথের আরেকটি বিসর্জনচিত্রে দেখা যায়, ঘন অন্ধকারের মধ্যে গঙ্গার বুকে নৌকায় ভাসানো হয়েছে দুর্গাপ্রতিমা। স্নিগ্ধ, ম্লান আলোয় আঁকা সেই ছবিতে আলোর সঙ্গে মিশে রয়েছে বিদায়ের বিষাদ, যেন বিসর্জনের মুহূর্তে জলের সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে উৎসবের আনন্দও।
বিকাশ ভট্টাচার্যের ছবিতে নাগরিক দুর্গা ও বিসর্জনের অন্য আখ্যান
বিকাশ ভট্টাচার্যের ছবিতে বিসর্জন ও দুর্গার উপস্থাপনা এসেছে সম্পূর্ণ অন্য আঙ্গিকে। তাঁর দুর্গা কেবল মণ্ডপের প্রতিমা নন, তিনি যেন আমাদের চারপাশের চেনা নাগরিক নারী। কাঠামো ও চালচিত্রের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি রক্তমাংসের মানুষ সবজির ব্যাগ হাতে ট্রামলাইনের পাশ দিয়ে হেঁটে চলেন। এই দুর্গাকে আঁকতে গিয়ে শিল্পী আসলে এঁকেছেন আমাদের ঘরের মা, মেয়ে ও বোনদেরই নানা রূপ।
দশমীর সকালে দেবীর চরণে সিঁদুর দিয়ে প্রণাম, তারপর নারীদের পরস্পরের মধ্যে সিঁদুর খেলা,এই পরিচিত দৃশ্যও তাঁর শিল্পে পেয়েছে এক অনন্য মাত্রা। পরাবাস্তবের আলো-আঁধারিতে সিঁদুরমাখা নারীদের মুখ যেন হয়ে ওঠে দেবীপ্রতিমারই প্রতিচ্ছবি। দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত নারীদের মধ্যেই শিল্পী খুঁজে পেয়েছেন দেবীত্বের উপস্থিতি।
আবার অন্য একটি ছবিতে বিকাশ ভট্টাচার্য দেখিয়েছেন বনেদি বাড়ির পিছনের পুকুরে দুর্গাপ্রতিমার বিসর্জনের দৃশ্য। ঘোলা জলে ভাসছে কচুরিপানা, আর সেই জলের মধ্যেই ভেসে রয়েছে বাড়ির এক গৃহবধূর নিথর দেহ। তাঁর কপালে তৃতীয় নয়নের উপস্থিতি ছবিটিকে দিয়েছে এক অস্বস্তিকর, রহস্যময় মাত্রা। পরিচিত দুর্গোৎসবের আবহের আড়ালে যেন উঁকি দিয়েছে সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার ও নারীর যন্ত্রণার এক মর্মান্তিক আখ্যান।
উমার বিদায়ে আনন্দের আড়ালে বেদনার সুর
দুর্গাপুজোর আনন্দের আড়ালে বাঙালির যে বেদনা লুকিয়ে থাকে, তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে উমার ফিরে যাওয়ার চিরচেনা কাহিনি। বছরের মাত্র কয়েকটি দিন মেয়েকে কাছে পাওয়া যায়। তারপর আসে বিদায়ের পালা। ঢাকের শব্দ, শঙ্খধ্বনি, সিঁদুর খেলা আর বিসর্জনের আচার পেরিয়ে মন জুড়ে থেকে যায় শূন্যতা।
এই বিদায়ের বেদনাই বিভিন্ন সময়ে শিল্পীদের তুলিতে নানা রূপে ধরা পড়েছে। কোথাও তা ইতিহাসের দলিল, কোথাও নগরজীবনের প্রতিচ্ছবি, আবার কোথাও একেবারে ঘরের মেয়েকে হারানোর ব্যক্তিগত হাহাকার। শিল্পীর ক্যানভাসে তাই বিসর্জন শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, এ যেন বাঙালির স্মৃতি, সংস্কৃতি, সম্পর্ক ও আবেগের এক চিরন্তন আখ্যান।





