দশমীর দিনে আবেগে ভাসে বাঙালির মন। বিসর্জনের বিপুল আয়োজন আসলে ঘরের মেয়ে উমার প্রতি ভালোবাসা, মমতা আর বিদায়ের বেদনারই এক অনন্য প্রকাশ। নবমীর মহারাত্রি পেরিয়ে দশমীর সকালে যখন বিদায়ের সুর বাজতে শুরু করে, তখন বাংলার আকাশজুড়ে যেন নেমে আসে বিষাদের এক মায়াবী আবহ। ঢাকের আওয়াজ, শঙ্খধ্বনি আর সিঁদুরের রঙের আড়ালেও মন জুড়ে থাকে একটাই অনুভূতি,আবার একটা বছরের অপেক্ষা।
বিসর্জনের এই ঐতিহ্যের কথা উঠলে কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়ির নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। রাজা নবকৃষ্ণ দেবের হাত ধরে ১৭৫৭ সালে শুরু হওয়া এই দুর্গাপুজো বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বনেদিয়ানা ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আড়াই শতকেরও বেশি সময় ধরে এই পুজোকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নানা আচার, রীতি ও পারিবারিক পরম্পরা। বিজয়া দশমীর বিদায়বেলায় সেই ঐতিহ্য যেন আরও আবেগময় হয়ে ওঠে।
দর্পণ বিসর্জনে বিদায়ের সূচনা
দশমীর সকালে শাস্ত্রীয় রীতি মেনে দেবীর দর্পণ বিসর্জনের আচার পালিত হয়। আয়নায় দেবীর প্রতিবিম্ব দর্শনের মধ্য দিয়ে প্রতীকী বিসর্জনের এই পর্ব সম্পন্ন হয়। এই আচারের মধ্যেই যেন ধীরে ধীরে শুরু হয় বিদায়ের প্রস্তুতি। যে দেবীকে ঘিরে কয়েক দিন ধরে রাজবাড়ি মুখর হয়ে ছিল, তাঁকেই এবার বিদায় জানানোর পালা।
সিঁদুরের রঙে বরণ, চোখে বিদায়ের জল
দশমীর অন্যতম আবেগঘন পর্ব সিঁদুর খেলা। রাজবাড়ির সধবা মহিলারা দেবীকে সিঁদুর পরিয়ে বরণ করেন। তারপর পরস্পরের কপালে সিঁদুর ছুঁইয়ে শুভকামনা বিনিময় করেন তাঁরা। লাল সিঁদুরের রঙে চারপাশ রঙিন হয়ে উঠলেও মনের কোণে জমতে থাকে উমাকে বিদায় জানানোর বিষাদ।
বাঙালির কাছে দুর্গা কেবল মহিষাসুরমর্দিনী নন, তিনি ঘরের মেয়েও। তাই শাস্ত্রের আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেও বারবার ফিরে আসে মেয়েকে বাপের বাড়ি থেকে বিদায় জানানোর চেনা আবেগ। শোভাবাজার রাজবাড়ির বিসর্জনেও সেই পারিবারিক অনুভূতি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
কনকাঞ্জলি: উমার বিদায়ে মায়ার টান
বাঙালির বিজয়া দশমীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কনকাঞ্জলির প্রথায় রয়েছে মেয়ের বিদায়ের এক আবেগঘন প্রতীকী তাৎপর্য। ঘরের মেয়েকে বিদায় জানানোর সময় যেমন মায়া, ভালোবাসা আর আশীর্বাদ জড়িয়ে থাকে, তেমনই উমার বিদায়েও মিশে থাকে সেই চিরন্তন অনুভূতি।
শোভাবাজার রাজবাড়ির বিসর্জনের আচার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এই ঘরোয়া আবেগের প্রসঙ্গ বিশেষভাবে উঠে আসে। তবে কনকাঞ্জলি-সহ নির্দিষ্ট আচারগুলির বর্তমান রূপ ও ক্রম সম্পর্কে রাজবাড়ির নিজস্ব তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া জরুরি।
রাজকীয় ঐতিহ্যের আড়ালে এক চিরন্তন বাঙালিয়ানা
শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর মাহাত্ম্য শুধু তার প্রাচীনত্বে নয়, বরং ঐতিহ্যকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করে চলার মধ্যেও। সময় বদলেছে, কলকাতার রাস্তাঘাট বদলেছে, উৎসব উদ্যাপনের ধরনেও এসেছে নানা পরিবর্তন। তবু বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো আজও বাঙালির ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দশমীর বিসর্জন তাই এখানে শুধুমাত্র প্রতিমাকে জলে ভাসিয়ে দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের স্মৃতি, পরিবারের উত্তরাধিকার এবং উমাকে ঘিরে বাঙালির চিরন্তন আবেগ।
ঢাকের শেষ বোল মিলিয়ে যায় নদীর জলে। সিঁদুরের রং ধীরে ধীরে ফিকে হয়। রাজবাড়ির উঠোনে ফিরে আসে নীরবতা। কিন্তু উমার বিদায়ের সেই বিষাদ আর আগামী বছরের অপেক্ষা থেকে যায় হৃদয়ের গভীরে। শোভাবাজার রাজবাড়ির আড়াইশো বছরেরও বেশি পুরোনো ঐতিহ্য যেন প্রতি বছর সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়,বিসর্জন মানে শুধু বিদায় নয়, আবার ফিরে আসার আশ্বাসও।





