কিছু নদী শুধু জল বয়ে নিয়ে যায় না, বয়ে নিয়ে যায় ইতিহাস, স্মৃতি আর মানুষের হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা আবেগ। উত্তর ২৪ পরগনার সীমান্তশহর টাকির বুক চিরে বয়ে চলা ইছামতী যেন তেমনই এক নদী। তার এক পারে ভারত, অন্য পারে বাংলাদেশ। মাঝখানে আন্তর্জাতিক সীমান্তের অদৃশ্য রেখা। অথচ দুর্গাপুজোর বিসর্জনের দিন এই নদীর বুকেই যেন এক মুহূর্তের জন্য মিলেমিশে যায় দুই বাংলার আত্মা। ঢাকের শব্দ, শঙ্খধ্বনি আর উমাবিদায়ের বিষণ্ণ সুরে ইছামতী হয়ে ওঠে দুই বাংলার ভালোবাসার এক অনন্য মঞ্চ।
এক পারে ভারতভূমি, অন্য পারে বাংলাদেশ ,
ইছামতীর ঢেউয়ে জাগে আত্মীয়তার রেশ
বিজয়া দশমী। চার দিনের আনন্দ, উৎসব আর উচ্ছ্বাসের শেষে মায়ের বিদায়ের পালা। কলকাতার রাজপথ থেকে বাংলার প্রত্যন্ত গ্রাম সর্বত্রই তখন বিষাদের সুর। কিন্তু টাকির ইছামতীতে এই বিদায়ের দৃশ্য যেন অন্য এক মাত্রা পায়। নদীর বুকে সারি সারি নৌকা, ট্রলার ও জলযানে সজ্জিত প্রতিমা। একদিকে ভারতের টাকি, অন্যদিকে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জনপদ। দুই পারের মানুষ অপেক্ষা করেন সেই বিশেষ মুহূর্তের, যখন নদীর বুকে ফুটে ওঠে দুই বাংলার দুর্গাপুজোর এক বিরল দৃশ্য।
ঢাকের তালে বিদায়বেলা, চোখে অশ্রুধারা ,
একই সুরে মাকে ডাকে দুই বাংলার তারা
ইছামতীর এই বিসর্জন কেবল একটি ধর্মীয় প্রথা নয়, এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। দেশভাগের মানচিত্র দুই বাংলাকে আলাদা করেছে, তৈরি করেছে আন্তর্জাতিক সীমান্ত। কিন্তু ভাষার টান, মাটির গন্ধ, লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্য কিংবা দুর্গাপুজোর আবেগকে কোনও রেখা দিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা করা যায়নি। টাকির বিসর্জন সেই চিরন্তন সত্যকেই বারবার মনে করিয়ে দেয়।
মানচিত্রে যতই থাকুক সীমারেখার টান ,
সংস্কৃতির শিকড়ে বাঁধা দুই বাংলার প্রাণ
দশমীর বিকেলে নদীর বুকে যখন একের পর এক প্রতিমা এগিয়ে আসে, তখন চারপাশে তৈরি হয় এক অপূর্ব আবহ। কোথাও ঢাকের বাদ্যি, কোথাও শঙ্খের ধ্বনি, কোথাও আবার শেষবারের মতো মাকে প্রণাম জানানোর আকুলতা। নদীর জলে প্রতিমার প্রতিবিম্ব, আকাশে অস্তগামী সূর্যের রং আর মানুষের চোখে বিদায়ের অশ্রু, সব মিলিয়ে যেন প্রকৃতি নিজেই এঁকে দেয় এক আবেগঘন ছবি।
নদীর বুকে প্রতিমা ভাসে, আকাশ রঙিন হয়,
বিদায়ের সেই বিষাদেও মিলনের ছবি রয়
দুই দেশের প্রতিমা একই নদীতে বিসর্জনের জন্য উপস্থিত হওয়ার এই ঐতিহ্য বহু মানুষের কাছে বিশেষ আকর্ষণের। তবে আন্তর্জাতিক সীমান্তের নিরাপত্তাবিধি মেনেই এই আয়োজন সম্পন্ন হয়। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নজরদারি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ঐতিহ্যটি আজও তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধরে রেখেছে।
নিয়মের বাঁধন মানে নদী, মানে না মনের টান,
ঢেউয়ের ভাষায় ভেসে চলে দুই বাংলার গান
বাঙালির দুর্গাপুজোয় দেবী কেবল দেবী নন, তিনি ঘরের মেয়ে উমা। তাঁর আগমন আনন্দের, তাঁর বিদায় হৃদয়ভাঙা বিষাদের। বিসর্জনের মুহূর্তে তাই নদীর জলে শুধু প্রতিমা ভাসে না, ভেসে যায় কয়েক দিনের আনন্দ, অগণিত স্মৃতি আর আগামী বছরের অপেক্ষা।
আগমনে উৎসবের আলো, বিদায়ে অশ্রুজল ,
উমার টানে এক হয়ে যায় দুই বাংলার কোল
টাকির ইছামতীতে সেই আবেগের পরিধি যেন আরও বিস্তৃত। এখানে নদী দুই দেশের সীমানা বহন করেও দুই বাংলার মানুষের কাছে হয়ে ওঠে এক অভিন্ন অনুভূতির প্রতীক। এপার-ওপার আলাদা হতে পারে, কিন্তু মায়ের বিদায়ের বেদনা আলাদা নয়। ভাষা এক, উৎসবের আবেগ এক, আর শারদীয়ার স্মৃতিও যেন একই সুতোয় বাঁধা।
এপার বলে, ‘মা গো যেয়ো’, ওপারেও সেই সুর ,
একই মায়ের বিদায়বেলায় আবেগ ভরপুর
হয়তো এই কারণেই প্রতি বছর ইছামতীর বিসর্জন দেখতে মানুষের এত আগ্রহ। তাঁরা শুধু প্রতিমা নিরঞ্জনের দৃশ্য দেখতে আসেন না; দেখতে আসেন এক আশ্চর্য সাংস্কৃতিক মিলন, যেখানে সীমান্তের কঠোর বাস্তবতার পাশাপাশি বেঁচে থাকে মানুষের সহজাত আত্মীয়তা।
দুই তীরে দুই ঠিকানা, মাঝখানে নদীর গান ,
বিসর্জনের ক্ষণেই বাঁধে হৃদয়ের বন্ধন
নদী তার নিজের নিয়মে বয়ে চলে। সময় বদলায়, সীমান্তের নিয়ম বদলায়, বদলে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তবু ইছামতীর বুকে বিজয়া দশমীর এই দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়,মানুষের সংস্কৃতি কোনও মানচিত্রের গণ্ডিতে সম্পূর্ণ আবদ্ধ নয়।
সময় যায়, দিনও ফুরায়, বদলে যায় কাল,
ইছামতীর বুকে তবু মিলনেরই জোয়ার
প্রতিমা একসময় জলে মিশে যায়। ঢাকের শব্দ স্তিমিত হয়। নৌকাগুলি ফিরে যায় নিজ নিজ ঘাটে। উৎসবের আলো নিভে আসে ধীরে ধীরে। কিন্তু ইছামতীর জলে যে মিলনের ছবি আঁকা হয়, তা মুছে যায় না এত সহজে।
প্রতিমা ডোবে নদীর জলে, স্মৃতি ডোবে না আর,
দুই বাংলার ভালোবাসা থাকে চিরকাল অপার
টাকির ইছামতী তাই শুধুই বিসর্জনের নদী নয়; সে দুই বাংলার স্মৃতির বাহক, আবেগের আশ্রয়, বাঙালিয়ানার এক জীবন্ত প্রতীক। তার ঢেউ যেন নীরবে বলে যায়,সীমানা রাষ্ট্রকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু সংস্কৃতির শিকড় আর মানুষের হৃদয়ের টানকে সহজে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না।
সীমানা শুধু মানচিত্রে, হৃদয়ে নয় দূরত্ব,
ইছামতীর ঢেউয়ে লেখা বাঙালির আত্মীয়ত্ব
ইছামতীর জলে প্রতিমা বিসর্জন হয়, কিন্তু বিসর্জন হয় না দুই বাংলার আত্মীয়তা। উমা ফিরে যান কৈলাসে, আর নদীর বুকে রেখে যান মিলনের এক চিরন্তন আলপনা।
জলে মেশে মাটির প্রতিমা, মুছে না মনের দাগ,
ইছামতীর ঢেউয়ে বেঁচে থাক দুই বাংলার অনুরাগ।





