কলকাতা: দুর্গাপুজো মানেই শুধু প্রতিমা দর্শন নয়, শিল্প, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সামাজিক বার্তার এক অনন্য মেলবন্ধন। প্রতি বছরই নতুন নতুন ভাবনায় দর্শকদের চমকে দেন কলকাতার পুজো উদ্যোক্তারা। ২০২৬ সালের দুর্গাপুজোতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কোথাও জলাশয় সংরক্ষণের বার্তা, কোথাও বাংলার হারিয়ে যেতে বসা পুতুলনাচ, আবার কোথাও ইতিহাস ও সমাজের নানা প্রশ্ন উঠে এসেছে মণ্ডপসজ্জায়। কলকাতার এমনই ছয়টি অভিনব থিম পুজো এবার নজর কাড়ছে।
১. তেলিপুকুর নাগেরবাজার যুবক সংঘ: ‘এক পুকুর ভালোবাসা’
পুকুরের জলের নীচে কী ঘটে, সেই অজানা জগতের অনুভূতি দর্শকদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে এই মণ্ডপ। শিল্পী ভাবতোষ সুতারের পরিকল্পনায় তৈরি এই থিমে জলাশয়ের পরিবেশ, জলজ প্রাণীর জীবন এবং দূষণের প্রভাব বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। পুকুরের তলায় বসানো ১৮টি মাইক্রোফোনের সাহায্যে জলতলের নানা শব্দ তুলে ধরা হচ্ছে। জলাশয় সংরক্ষণের বার্তাকে এভাবেই এক অভিনব অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছে এই পুজো।
২. দমদম পার্ক তরুণ সংঘ: প্রাচীন সামুদ্রিক বাণিজ্যের গল্প
বাংলার বাণিজ্যিক ইতিহাসের সঙ্গে ভারতের প্রাচীন সামুদ্রিক যোগাযোগের কাহিনি তুলে ধরার ভাবনায় তৈরি হয়েছে এই মণ্ডপ। ‘বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী’ ভাবনার মাধ্যমে শিল্প ও ইতিহাসের মেলবন্ধন ঘটানোর চেষ্টা রয়েছে এখানে। অতীতের বাণিজ্যপথ কীভাবে মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছে, সেই গল্পই মণ্ডপসজ্জায় নতুনভাবে ফুটে উঠেছে।
৩. দমদম পার্ক সর্বজনীন: ‘পঞ্চালতিকা’য় পুতুলনাচের প্রত্যাবর্তন
একসময় বাংলার গ্রামবাংলার বিনোদনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল পুতুলনাচ। কিন্তু আধুনিক বিনোদনের ভিড়ে এই লোকশিল্প ক্রমশ হারিয়ে যেতে বসেছে। পুজোর ৭৫তম বর্ষে দমদম পার্ক সর্বজনীন ‘পঞ্চালতিকা’ থিমের মাধ্যমে সেই শিল্পকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরছে। মণ্ডপে থাকছে সুতো ও দণ্ডচালিত পুতুলের পরিবেশনা। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এই বিশেষ আয়োজন দর্শকদের বাংলার লোকসংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
৪. সল্টলেক ইসি ব্লক: মহাভারতের আখ্যান
মহাভারতের কাহিনি ও শ্রীকৃষ্ণের ভাবনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এই মণ্ডপের বিশেষ আকর্ষণ। বিশাল ভাস্কর্য ও শিল্পসম্মত উপস্থাপনার মাধ্যমে ভারতীয় মহাকাব্যের পরিচিত আখ্যানকে নতুনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে। পুরাণের কাহিনি কীভাবে আজও মানুষের কল্পনা ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে, এই থিম সেই দিকটিকেই সামনে আনে।
৫. নিউ আলিপুর সুরুচি সংঘ: ‘উৎস’
নিউ আলিপুরের সুরুচি সংঘের এবারের থিম ‘উৎস’। ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে তাঁর জীবন, কর্ম ও চিন্তাভাবনা তুলে ধরা হয়েছে এই আয়োজনে। সংরক্ষিত ছবি ও ঐতিহাসিক নথির মাধ্যমে দর্শকদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে তাঁর জীবনের নানা অধ্যায়।
৬. সাদাঙ্গা দুর্গোৎসব সমিতি: ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’
উত্তর কলকাতার সাদাঙ্গা দুর্গোৎসব সমিতির মণ্ডপে উঠে এসেছে কালিপ্রসন্ন সিংহের বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’-র অনুপ্রেরণা। এই থিমের মাধ্যমে সমাজের নানা অসংগতি, মানুষের উদাসীনতা এবং নারীর নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। শুধু বাহ্যিক জাঁকজমক নয়, দর্শকদের ভাবতে বাধ্য করাও যে মণ্ডপশিল্পের একটি বড় উদ্দেশ্য হতে পারে, এই আয়োজন সেই বার্তাই দেয়।
শিল্পের সঙ্গে সচেতনতার মেলবন্ধন
কলকাতার এই ছয়টি থিম পুজো দেখিয়ে দিচ্ছে, দুর্গাপুজোর মণ্ডপ এখন শুধু উৎসবের সাজসজ্জার জায়গা নয়; তা হয়ে উঠছে ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি, পরিবেশ সচেতনতা এবং সামাজিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার এক শক্তিশালী মাধ্যম। কোথাও জলাশয় বাঁচানোর আবেদন, কোথাও হারিয়ে যাওয়া শিল্পকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা, আবার কোথাও অতীতের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ। দুর্গাপুজোর এই বৈচিত্র্যই কলকাতার উৎসবকে অন্য মাত্রা দেয়। প্রতিটি মণ্ডপ যেন এক একটি গল্প যে গল্পে রয়েছে বাংলার অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের ভাবনা।





