৩৭ দিনের টানা আন্দোলন, যন্তর মন্তরে দিন-রাত অবস্থান, অসুস্থ শরীরেও অনশন, আর শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা। ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়ের পর এবার সামনে এল আন্দোলনের পরবর্তী রূপরেখা। 'ককরোচ জনতা পার্টি' (Cockroach Janta Party বা CJP)-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, “আমাদের লড়াই শেষ হয়ে যায়নি। এটা কেবল শুরু।”
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা করা হলেও রবিবার সকালে সমাজমাধ্যম 'এক্স'-এ প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তায় দীপকে বুঝিয়ে দেন, আন্দোলনের লক্ষ্য শুধু একজন মন্ত্রীর ইস্তফা ছিল না। তাঁর কথায়, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং ছাত্রবান্ধব করে তোলাই আগামী দিনের প্রধান লক্ষ্য।
ভিডিওর শুরুতেই দীপকের কণ্ঠে ধরা পড়ে আবেগ। তিনি বলেন, গত ৩৭ দিন তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলির মধ্যে একটি। এই দীর্ঘ আন্দোলনের সময় হাজার হাজার ছাত্র-যুবক যন্তর মন্তরে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে অবস্থান করেছেন। বহু মানুষ বিভিন্ন রাজ্য থেকে এসে পাশে দাঁড়িয়েছেন। আন্দোলন শেষ হওয়ার পর শনিবার রাতে তিনি অনেক দিন পরে শান্তিতে ঘুমিয়েছেন বলেও জানান।
তবে সেই স্বস্তির মধ্যেও সমর্থকদের উদ্দেশে তাঁর সতর্ক বার্তা, “কোনওভাবেই আত্মতুষ্টির সময় নয়। একটি লড়াই জিতেছি, কিন্তু যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি।”
দীপকে বলেন, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ নিঃসন্দেহে একটি বড় রাজনৈতিক এবং নৈতিক জয়। কিন্তু শুধু একজন মন্ত্রী বদলে গেলেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্ত সমস্যা দূর হয়ে যাবে, এমনটা তিনি বিশ্বাস করেন না। প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা পরিচালনায় গাফিলতি, নিয়োগে অনিয়ম, ছাত্রদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা— এই সমস্ত বিষয়ের স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য পূরণ হবে না বলেই তাঁর দাবি।
ভিডিও বার্তায় তিনি আন্দোলনের প্রতিটি অংশগ্রহণকারীকে ধন্যবাদ জানান। যাঁরা দিনের পর দিন যন্তর মন্তরে বসে থেকেছেন, যাঁরা দেশজুড়ে সমর্থন জানিয়েছেন, এমনকি যাঁরা আর্থিক সাহায্য করেছেন— সকলের প্রতিই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
শুধু সমর্থক নন, সমালোচকদের প্রতিও ধন্যবাদ জানান দীপকে। তাঁর কথায়, আন্দোলনের বিরোধিতাকারীরা যে প্রশ্ন তুলেছেন, যে সমালোচনা করেছেন, তা তাঁদের নিজেদের অবস্থান আরও স্পষ্ট করতে সাহায্য করেছে। বিরোধিতাকেও গণতন্ত্রের অংশ বলেই মনে করেন তিনি।
আন্দোলনের শেষ পর্বে নিজের শারীরিক অবস্থার কথাও তুলে ধরেন দীপকে। তিনি জানান, টানা আন্দোলনের মধ্যে তিনি টাইফয়েডে আক্রান্ত হন। উচ্চ জ্বর থাকা সত্ত্বেও আন্দোলনের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াননি। শারীরিক অসুস্থতার কারণেই আন্দোলন প্রত্যাহারের দিন উপস্থিত প্রত্যেকের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করে ধন্যবাদ জানাতে পারেননি বলে আক্ষেপও প্রকাশ করেন।
এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল নিট-ইউজি-সহ একাধিক সর্বভারতীয় পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে। প্রথমদিকে অনেকেই 'ককরোচ জনতা পার্টি'-কে গুরুত্ব দেননি। কেউ কেউ সামাজিক মাধ্যমের 'ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ' বলেও উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে ছাত্র-যুব সমাজের এক বড় অংশ এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়। যন্তর মন্তরে টানা অবস্থান, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমর্থন, সমাজমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার— সব মিলিয়ে আন্দোলন জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়।
ক্রমশ সরকারের উপর চাপ বাড়তে থাকে। বিরোধী দলগুলিও এই আন্দোলনের পাশে দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার পর CJP আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা করে। তবে সেই ঘোষণার মধ্যেও পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছিল, আন্দোলন স্থগিত হচ্ছে, আদর্শ নয়।
রবিবারের ভিডিও বার্তায় সেই অবস্থানই আরও স্পষ্ট করলেন দীপকে। তাঁর বক্তব্য, “আমরা কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে লড়িনি। আমরা একটি ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি তুলেছি। সেই দাবি এখনও সম্পূর্ণ পূরণ হয়নি। তাই আমাদের পথচলা চলবে।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, গত কয়েক সপ্তাহে অভিজিৎ দীপকে শুধু ছাত্রনেতা হিসেবেই নয়, জাতীয় স্তরে এক নতুন রাজনৈতিক মুখ হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছেন। 'ককরোচ জনতা পার্টি' ভবিষ্যতে শুধুই আন্দোলনের সংগঠন হিসেবে থাকবে, নাকি আরও বড় রাজনৈতিক পরিসরে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করবে— তা নিয়ে ইতিমধ্যেই জল্পনা শুরু হয়েছে।
তবে এই সমস্ত জল্পনার মধ্যে দীপকের বার্তা একটাই— লক্ষ্য এখনও অনেক দূর। একটি ইস্তফা আন্দোলনের সাফল্যের প্রতীক হতে পারে, কিন্তু দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রকৃত পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত তাঁদের সংগ্রাম থামবে না।