প্লেটে মাংস নেই। আছে সবুজ লেটুসের পাতা। কিন্তু সেই পাতার মধ্যেই তৈরি হচ্ছে এমন এক প্রোটিন, যা প্রাণীর পেশিতে মাংসের রং, গন্ধ এবং স্বাদের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। বিজ্ঞানীদের এই পরীক্ষাই খুলে দিয়েছে ভবিষ্যতের ‘মাংসের বিকল্প’ তৈরির এক অভিনব দরজা। বিজ্ঞানীরা জিনগত ভাবে পরিবর্তিত লেটুসের পাতায় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন মায়োগ্লোবিন—প্রাণীর পেশিতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রোটিন। মাংসের পরিচিত লালচে রং এবং রান্নার সময় তৈরি হওয়া ‘মাংসের স্বাদ’-এর পিছনে এই প্রোটিনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Frontiers in Plant Science পত্রিকায়। তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা—বিজ্ঞানীরা লেটুসকে মাংসে পরিণত করেননি। তাঁরা গাছকে ব্যবহার করেছেন প্রাণিজ মাংসের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তৈরি করার ‘জৈব কারখানা’ হিসেবে। গবেষণাটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে।
লেটুসের পাতায় এল প্রাণীর মাংসের প্রোটিন কী ভাবে?
গবেষণার মূল কৌশলটি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং। বিজ্ঞানীরা মায়োগ্লোবিন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় জিন উদ্ভিদের কোষে প্রবেশ করান। বিশেষ ভাবে নজর দেওয়া হয় ক্লোরোপ্লাস্টে—উদ্ভিদ কোষের সেই অংশে, যেখানে সালোকসংশ্লেষের কাজ হয় এবং যার নিজস্ব জিনগত ব্যবস্থা রয়েছে। ক্লোরোপ্লাস্টে একটি নির্দিষ্ট জিনের বহু কপি রাখা সম্ভব হওয়ায় সেখানে প্রয়োজনীয় প্রোটিন তুলনামূলক বেশি পরিমাণে তৈরি করানোর সম্ভাবনা থাকে। গবেষণায় জিনটি উদ্ভিদের কোষে পৌঁছে দিতে ব্যবহার করা হয় ‘জিন গান’ প্রযুক্তি। ক্ষুদ্র সোনার কণার সঙ্গে জিন যুক্ত করে তা উদ্ভিদের কোষে প্রবেশ করানো হয়। তামাক গাছের পাশাপাশি মানুষের খাবার হিসেবে পরিচিত লেটুসেও এই পরীক্ষা চালানো হয়।
মায়োগ্লোবিনই বা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
মাংসের লালচে রং দেখলে অনেকেই হিমোগ্লোবিনের কথা ভাবেন। কিন্তু প্রাণীর পেশিতে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন কাজ করে—মায়োগ্লোবিন। মায়োগ্লোবিন পেশিতে অক্সিজেন ধরে রাখতে সাহায্য করে। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে ‘হিম’ নামের আয়রন-সমৃদ্ধ একটি অণু। মাংসের রং এবং রান্নার সময় তৈরি হওয়া বহু স্বাদ-গন্ধের রাসায়নিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে এই হিমের সম্পর্ক রয়েছে। সেই কারণেই উদ্ভিদ থেকে তৈরি ‘মাংসের বিকল্প’ যতই দেখতে মাংসের মতো হোক, আসল মাংসের অনুভূতি তৈরি করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। বিজ্ঞানীরা সেই জায়গাতেই আঘাত করতে চাইছেন।
পরীক্ষায় ধরা পড়ল বড় সমস্যা
মায়োগ্লোবিন তৈরি করা গেলেও বিজ্ঞানীরা দেখলেন, সব মায়োগ্লোবিনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় ‘হিম’ ঠিক ভাবে যুক্ত হচ্ছে না।
গবেষণার ফল অনুযায়ী, উদ্ভিদে তৈরি মায়োগ্লোবিনের মাত্র প্রায় ৩৫ শতাংশের সঙ্গে হিম সঠিক ভাবে যুক্ত ছিল। তুলনায় ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে একই প্রোটিন তৈরি করলে সেই হার প্রায় ৮০ শতাংশ। অর্থাৎ, গাছকে দিয়ে প্রোটিন বানানো সম্ভব হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই প্রোটিনকে মাংসের মতো কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় হিম তৈরির ক্ষমতা এখনও যথেষ্ট নয়। এটাই এখন গবেষকদের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
‘গাছের মাংস’ নয়, আসলে ‘মাংসের উপাদান’
এই জায়গাটা পরিষ্কার করা জরুরি। এটি cultivated meat বা lab-grown meat নয়। ল্যাব-গ্রোন মিটে প্রাণীর কোষকে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বাড়িয়ে মাংসের টিস্যু তৈরি করা হয়। এখানে পদ্ধতিটা সম্পূর্ণ আলাদা। গবেষকেরা চাইছেন, উদ্ভিদকেই এমন একটি ‘বায়োফ্যাক্টরি’ বানাতে, যার পাতায় মাংসের গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন তৈরি হবে। পরে সেই প্রোটিন ব্যবহার করা যেতে পারে উদ্ভিদ-ভিত্তিক মাংসের বিকল্প খাবারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের বার্গারের প্যাটি হয়তো গাছের পাতা থেকে সরাসরি তৈরি হবে না, কিন্তু সেই প্যাটিকে মাংসের মতো রং, স্বাদ ও অনুভূতি দিতে লেটুসে তৈরি প্রোটিন কাজে লাগতে পারে।
বড় শিল্পে পৌঁছলে বদলাতে পারে হিসাব
উদ্ভিদ-ভিত্তিক মাংসের বাজারে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হল—শুধু প্রোটিন দিলেই আসল মাংসের অভিজ্ঞতা পাওয়া যায় না। রং চাই। গন্ধ চাই। রান্নার সময় মাংসের মতো রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া চাই। মুখে কামড় দেওয়ার পর সেই পরিচিত অনুভূতিও চাই। মায়োগ্লোবিন ও হিম এই সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সমাধান করতে পারে। আর এখানেই এই গবেষণার সম্ভাবনা। আজ যে উপাদান তৈরির জন্য বিশেষ শিল্প-প্রক্রিয়া প্রয়োজন, ভবিষ্যতে যদি তা ফসলের মধ্যেই উৎপাদন করা যায়, তবে বিকল্প প্রোটিন শিল্পের উৎপাদন-পদ্ধতিই বদলে যেতে পারে। তবে সেই পর্যায়ে পৌঁছতে এখনও অনেক পথ বাকি।
আয়রনের উৎস হিসাবেও কি ব্যবহার করা যাবে?
গবেষণার আরও একটি সম্ভাব্য দিক রয়েছে। মায়োগ্লোবিনের সঙ্গে যুক্ত হিম আয়রন শরীরে উদ্ভিদজাত নন-হিম আয়রনের তুলনায় সহজে শোষিত হয়। তাই ভবিষ্যতে এই ধরনের জেনেটিক ভাবে পরিবর্তিত গাছকে শুধু মাংসের বিকল্প তৈরির উপাদান নয়, হিম-আয়রন সমৃদ্ধ খাদ্য তৈরির মাধ্যম হিসাবেও ব্যবহার করা যেতে পারে কি না, তা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে এই সম্ভাবনা এখনও গবেষণার স্তরে। খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের আগে নিরাপত্তা, পুষ্টিমান, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের মতো একাধিক ধাপ পেরোতে হবে।
আজ লেটুস, কাল কি ‘সবুজ কারখানা’?
এই গবেষণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক এখানেই। বিজ্ঞানীরা কোনও প্রাণীকে মাংসের জন্য ব্যবহার না করে, কোনও বিশাল শিল্পকারখানার বদলে গাছের কোষকে প্রোটিন তৈরির কারখানা হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনা দেখছেন। তবে এটাও ঠিক, একটি গবেষণাগারে মায়োগ্লোবিন তৈরি হওয়া আর বাজারে সস্তায়, নিরাপদে এবং বিপুল পরিমাণে উৎপাদন করা—দুই সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। উৎপাদনের মাত্রা বাড়াতে হবে। হিমের ঘাটতি কাটাতে হবে। খাবারের স্বাদ ও নিরাপত্তা পরীক্ষা করতে হবে। তার পর আসবে বাণিজ্যিক উৎপাদন ও সরকারি অনুমোদনের প্রশ্ন।
তাই এখনই বলা যাবে না যে “লেটুস থেকে মাংস তৈরি হয়ে গেল”। বরং বলা যায়, মাংসের বিকল্প তৈরির লড়াইয়ে বিজ্ঞানীরা এ বার গাছের পাতাকেও নামিয়ে দিলেন। আজ লেটুসের পাতায় তৈরি হচ্ছে মাংসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন। আগামী দিনে সেই প্রযুক্তি কত দূর যায়, তার উপরই নির্ভর করতে পারে—মাংসের স্বাদ পেতে ভবিষ্যতের মানুষকে আদৌ মাংসের উপর কতটা নির্ভর করতে হবে।