নিউজ ডেস্ক: বাঙালির ঐতিহ্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে দুর্গোৎসবের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গরিমা। পারিবারিক দুর্গাপূজার সূচনা হয়েছিল কলকাতার সাবর্ণ রায়চৌধুরী বাড়ির আটচালায় আর জৌলুসের গোড়াপত্তন ঘটেছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজোয়। সেই আমলে কোথাও সাজে আবার কোথাও নাচগানের আসরের জৌলুসে প্রত্যেক বাড়িতে চলতো বৈভবের প্রতিযোগিতা। বেশিরভাগ বনেদি বাড়িতে দেবীর গাত্রবর্ণ হলুদ রঙের হয়ে থাকে। তবে কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান রয়েছে কালীমোহন ঘোষ রায় পরিবারের নীল দুর্গার।
খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীতে মহারাজ আদিশূর পুত্রেষ্টি যজ্ঞ করার জন্য কনৌজ থেকে পাঁচজন ব্রাহ্মণ ও পাঁচজন কায়স্থ সন্তান নিয়ে আসেন। এই পাঁচজন কায়স্তের মধ্যে সৌকালীন গোত্রীয় মকরন্দ বাংলায় এসেছিলেন। এই মকরন্দ হলেন ঘোষ বংশের প্রথম সন্তান। পরে ঘোষ বংশের একটা শাখা বাংলার নবাবের নিকট হতে অধুনা বাংলাদেশের বরিশালের নরোত্তমপুর গ্রামের জমিদারি পান এবং সাথে 'রায়' উপাধি পান। সেই সময় থেকে এই শাখাটি 'ঘোষ রায়' নাম পরিচিতি লাভ করে।
এই বংশের সন্তান কালীমোহন রায়ের স্ত্রী সারদাময়ী ঘোষ রায় স্বপ্নাদেশে শ্যামারূপী দুর্গা পুজো করার আদেশ পান ১৮২৭ সালে। সেই স্বপ্নাদেশ মেনে দেবীর রং হয় নীল। এরপর ১৯৩৪ সালে বংশের পুত্র অবনীমোহন রায় কলকাতায় চলে আসেন। তখনও এই পুজো বাংলাদেশে নরোত্তমপুর অনুষ্ঠিত হত। ১৯৩৮ সালে অবনীমোহনের চতুর্থ ভ্রাতা রোহিনীমোহন পরিবার নিয়ে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। সাদার্ন এভিনিউতে তিনি বাড়ি নির্মাণ করেন।
অবনীমোহনের তৃতীয় ভাই মোহিনীমোহন ও ছোটভাই নলিনীমোহন কলকাতার প্রতাপাদিত্য প্লেসে ১৯৪৬ সালে নিজের একটি বাড়ি নির্মাণ করেন। ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত পুজোটি বাংলাদেশে হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে পুজো স্থানান্তরিত হয়ে কলকাতার প্রতাপাদিত্য প্লেসের বাড়িতে শুরু হয়। ১৯৭৭ সালে এই পুজোটি আবার স্থানান্তরিত হয়ে আসে সাদার্ন এভিনিউ-এর বাড়িতে। সেই থেকে আজও নীল দুর্গার আরাধনা এখানেই বেশ আড়ম্বরের সাথে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
এই প্রতিমায় একই দেহে দুর্গা ও শ্যামার অবস্থান। এখানে কার্তিক-গণেশের অবস্থান বিপরীত। অর্ধগোলাকৃতি চালচিত্রে আঁকা থাকে রামায়ণ। একচালা ডাকের সাজে পারিবারিক গহনায় দেবী সজ্জিত। পঞ্চমীর দিন কালীঘাটের পটুয়াপাড়া থেকে সকালে প্রতিমা নিয়ে আসা হয়। ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় বোধন হয়। সপ্তমীর সকালে নবপত্রিকা স্নানের পর দেবীর চক্ষুদান ও মূল পুজো শুরু হয়। ঘোষ রায় পরিবার কায়স্থ বলে অন্নভোগ দেওয়া হয় না তবে অন্নভোগ রান্না করার জন্য যেসব উপাদান প্রয়োজন হয় সেইসব উপাদান দেবীকে নিবেদন করা হয়।
বাইরের কোন প্রকার মিষ্টান্ন দেবীকে দেওয়া হয় না তবে মহাষ্টমীর সন্ধ্যারতির সময় লুচি, মিষ্টি, সুজি ইত্যাদি তৈরী করে মাকে নিবেদন করা হয়। সপ্তমীর দিন ২৭টি, অষ্টমীর দিন ৬৪টি এবং মহানবমীর দিন ২৭টি ভাগে নৈবেদ্য ভোগ নিবেদন করা হয়। এইসব ভোগে নানা রকমের ফলের সাথে বাড়ির তৈরী নারকেল নাড়ু থাকে। মহানবমীর দিন হোম হয়। পূর্বে পশুবলি দেওয়া হলেও বর্তমানে প্রতীকী বলিদানের প্রথা রয়েছে।
পরিবারের রীতি মেনে নিজস্ব পুঁথিতে আজও পুজোটি হয়ে আসছে। দশমীর দিন সকালে দেবীর দর্পন বিসর্জনের পর অপরাজিতা পুজোর চল রয়েছে। অপরাজিতা পুজোরর পর বাড়ির মহিলারা মাছ খেয়ে তবেই দেবীবরণ করতে পারেন।
দক্ষিণ কলকাতার এই ঘোষ রায় বাড়ির পুজোর আকর্ষণ কেবল তার প্রাচীনত্বে নয়, বরং একটি পারিবারিক স্বপ্নাদেশকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঁচিয়ে রাখার ঐতিহ্যে। কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোর ভিড়ে নীল দুর্গা তাই এক অনন্য ব্যতিক্রম।





