কলকাতা: ঢাকের বাদ্যি, আলোর রোশনাই আর থিমের চমক দুর্গাপুজো মানেই উৎসবের শহর কলকাতার অন্যরকম ছবি। পুজোর দিনগুলিতে শহরের অলিগলি থেকে বড় রাস্তা, সর্বত্রই নামে মানুষের ঢল। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের ভিড়ে কার্যত জনসমুদ্রে পরিণত হয় তিলোত্তমা। আর সেই বিপুল ভিড় সামলানো, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখাই কলকাতা পুলিশের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই কথা মাথায় রেখেই ২০২৬ সালের দুর্গাপুজো ঘিরে নিরাপত্তার বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে লালবাজার। শহরে মোট ৩,৩১৯টি দুর্গাপুজোর আয়োজনকে সামনে রেখে নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ভিড় সামলাতে বিশেষ নজর পুলিশের
কলকাতার দুর্গাপুজোয় দর্শনার্থীদের ভিড় প্রতি বছরই প্রশাসনের কাছে বড় পরীক্ষা। বিশেষ করে উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার জনপ্রিয় পুজোগুলিতে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বাড়তে থাকে। শ্রীভূমি, সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার, একডালিয়া এভারগ্রিন, চেতলা অগ্রণী কিংবা কলেজ স্কোয়ারের মতো পরিচিত পুজোগুলিতে দর্শনার্থীদের চাপ সামলাতে প্রয়োজন হয় বিশেষ পরিকল্পনা।
ভিড় নিয়ন্ত্রণ, গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পুলিশ মোতায়েন, মণ্ডপের প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ সচল রাখা এবং জরুরি পরিষেবার জন্য রাস্তা খালি রাখার মতো বিষয়গুলিতে নজর দেওয়া হয়। পাশাপাশি, কোনও মণ্ডপের সামনে অতিরিক্ত ভিড় জমলে পরিস্থিতি অনুযায়ী দর্শনার্থীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
যানজট এড়াতে বিশেষ ট্রাফিক পরিকল্পনা
পুজোর সময় শহরের একাধিক রাস্তায় যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ে ভারী যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ, প্রয়োজনে রাস্তার গতিপথ পরিবর্তন এবং জনপ্রিয় মণ্ডপগুলির আশপাশে যানবাহনের চাপ কমানোর মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
কলকাতার বহু রাস্তায় দর্শনার্থীরা পায়ে হেঁটে ঠাকুর দেখতে বেরোন। ফলে সাধারণ যান চলাচলের পাশাপাশি পথচারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করাও পুলিশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জরুরি পরিষেবা, অ্যাম্বুল্যান্স এবং দমকলের গাড়ি যাতে প্রয়োজনের সময় দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারে, সে বিষয়েও নজর রাখা জরুরি।
নজরদারিতে প্রযুক্তির ব্যবহার
বড় পুজোগুলিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল নজরদারি। সিসিটিভি ক্যামেরা, নিয়ন্ত্রণকক্ষ এবং পুলিশকর্মীদের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগের ব্যবস্থা ভিড়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সাহায্য করে। কোনও এলাকায় ভিড় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া, হারিয়ে যাওয়া শিশু বা পরিবারের সদস্যদের খুঁজে পেতে সহায়তা করা এবং সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে নজরদারি চালানো এসব ক্ষেত্রেই সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
দর্শনার্থীদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। ভিড়ের মধ্যে শিশুদের হাত ধরে রাখা, জরুরি যোগাযোগের নম্বর সঙ্গে রাখা এবং পুলিশের নির্দেশ মেনে চলা পুজো ভ্রমণকে আরও নিরাপদ করতে পারে।
উৎসবের আনন্দে নিরাপত্তাই প্রধান
কলকাতার দুর্গাপুজো শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি শহরের অর্থনীতি, পর্যটন এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পুজোর সময় দোকানপাট, রেস্তরাঁ, পরিবহণ এবং বিভিন্ন পরিষেবায় বাড়তি ব্যস্ততা তৈরি হয়। ফলে নিরাপত্তার পাশাপাশি শহরের স্বাভাবিক পরিষেবা সচল রাখাও প্রশাসনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
৩,৩১৯টি পুজোকে ঘিরে শহরজুড়ে মানুষের বিপুল সমাগম সামলাতে পুলিশ, প্রশাসন, পুজো কমিটি এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। মণ্ডপে দর্শনার্থীদের সুশৃঙ্খল প্রবেশ, নিরাপদে বেরিয়ে আসা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা থাকলে উৎসবের অভিজ্ঞতা আরও ভালো হয়।
সব মিলিয়ে, দুর্গাপুজোর মরসুমে কলকাতার নিরাপত্তা ব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করে পরিকল্পনা, নজরদারি এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতার উপর। আলোর শহরে উৎসবের আনন্দ যাতে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনায় ম্লান না হয়, সেই লক্ষ্যেই লালবাজারের প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ। তবে ৩,৩১৯টি পুজোর সংখ্যা ও নিরাপত্তা মোতায়েনের নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান প্রকাশের আগে কলকাতা পুলিশের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।





