কলকাতা: দুর্গাপুজো মানেই রাতভর ঠাকুর দেখা, আলোর রোশনাই আর এক মণ্ডপ থেকে অন্য মণ্ডপে ছুটে বেড়ানো। কিন্তু পরিবারের সঙ্গে পুজো দেখতে বেরোনো প্রবীণ সদস্যদের কাছে এই আনন্দ অনেক সময় হয়ে ওঠে ক্লান্তিকর। দীর্ঘ লাইন, কয়েকশো মিটার হাঁটা, রাস্তা বন্ধ থাকায় ঘুরপথে যাতায়াত কিংবা বসার জায়গার অভাব সব মিলিয়ে প্যান্ডেল হপিং তাঁদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তাই এ বছর বয়স্ক বাবা-মা, ঠাকুরদা-ঠাকুমা কিংবা চলাফেরায় অসুবিধা রয়েছে এমন কাউকে নিয়ে ঠাকুর দেখতে বেরোনোর আগে জেনে নেওয়া জরুরি, কোন পথে হাঁটতে হবে এবং কোথায় কী সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
উত্তর কলকাতার পুজোয় সরু গলি, দীর্ঘ হাঁটার প্রস্তুতি
উত্তর কলকাতার বাগবাজার, কুমোরটুলি, আহিরীটোলা ও হাতিবাগান অঞ্চলে রয়েছে একাধিক ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় দুর্গাপুজো। কাছাকাছি অনেক মণ্ডপ থাকলেও সরু রাস্তা, ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যারিকেড এবং একমুখী পথচলাচলের কারণে বাস্তবে হাঁটার দূরত্ব বেড়ে যেতে পারে। একটি মণ্ডপ থেকে বেরিয়ে পরের মণ্ডপে পৌঁছতে মানচিত্রে দেখানো সরল দূরত্বের চেয়ে বেশি পথ হাঁটতে হতে পারে।
প্রবীণদের নিয়ে এই অঞ্চলে প্যান্ডেল হপিংয়ের পরিকল্পনা করলে একসঙ্গে অনেকগুলি মণ্ডপ দেখার বদলে দু-তিনটি পুজো বেছে নেওয়া ভালো। শ্যামবাজার বা শোভাবাজার-সুতানুটি মেট্রো স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু করার পরিকল্পনা করা যেতে পারে। তবে স্টেশন থেকে মণ্ডপের প্রকৃত হাঁটার পথ, লিফটের সুবিধা এবং পুজোর দিনের ব্যারিকেড আগে যাচাই করা উচিত।
দক্ষিণ কলকাতার মণ্ডপে র্যাম্পের সুবিধা কোথায়?
দক্ষিণ কলকাতার কিছু বড় পুজোয় প্রবীণ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন দর্শনার্থীদের কথা মাথায় রেখে বিশেষ প্রবেশপথ বা র্যাম্পের ব্যবস্থা করার নজির রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে হাজরা পার্ক এবং বাগুইআটির রেল পুকুর ইউনাইটেড ক্লাবের মতো পুজোয় অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকাঠামোর কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
২০২৬ সালের জন্য সুরুচি সংঘের একটি পুজো-গাইডে হুইলচেয়ার-উপযোগী র্যাম্প এবং প্রবীণ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন দর্শনার্থীদের জন্য আলাদা লাইনের উল্লেখ রয়েছে। মহম্মদ আলি পার্কের গাইডেও প্রধান প্রবেশপথে র্যাম্পের কথা বলা হয়েছে। তবে এই তথ্যগুলি পুজোর দিন সরেজমিনে যাচাই করে নেওয়াই নিরাপদ, কারণ অস্থায়ী মণ্ডপের প্রবেশপথ ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা বদলাতে পারে।
সকালেই ঠাকুর দেখলে কি সুবিধা হবে?
সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত জনপ্রিয় মণ্ডপগুলিতে ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো এবং ব্যারিকেড ঘুরে হাঁটার চাপও বাড়তে পারে। তাই প্রবীণদের নিয়ে প্যান্ডেল হপিংয়ের ক্ষেত্রে সকাল বা তুলনামূলক কম ভিড়ের সময় বেছে নেওয়া সুবিধাজনক হতে পারে। একটি মণ্ডপে ঢোকার আগে কতটা হাঁটতে হবে, বসার জায়গা আছে কি না এবং হুইলচেয়ার নিয়ে প্রবেশ সম্ভব কি না, তা সংশ্লিষ্ট পুজো কমিটির সঙ্গে কথা বলে জেনে নিন।
মেট্রো, গাড়ি না হেঁটে কোনটি বেছে নেবেন?
পুজোর সময় যান চলাচলের বিধিনিষেধের কারণে গাড়ি বা ট্যাক্সি সব সময় মণ্ডপের একেবারে কাছে পৌঁছতে পারে না। আবার সব মেট্রো স্টেশনে সমানভাবে লিফটের সুবিধাও নেই। তাই শুধু নিকটতম স্টেশনের দূরত্ব দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে, স্টেশনে লিফট আছে কি না, নামার পর কতটা হাঁটতে হবে এবং গাড়ি থেকে নামার উপযুক্ত জায়গা রয়েছে কি না, তা যাচাই করা দরকার।
পুজো হোক সবার, পরিকল্পনাও হোক সবার কথা ভেবে
প্রবীণদের নিয়ে ঠাকুর দেখতে বেরোলে আরামদায়ক জুতো, পানীয় জল, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং বিশ্রামের সময় রাখুন। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন হলে একসঙ্গে অনেক মণ্ডপ দেখার পরিকল্পনা এড়িয়ে চলুন। হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য ঢালু প্রবেশপথ থাকলেও তার সামনে ভিড়, অসমান মেঝে বা সরু ব্যারিকেড সমস্যা তৈরি করতে পারে।
কলকাতার দুর্গাপুজোকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলার জন্য শুধু মণ্ডপের সৌন্দর্য নয়, প্রবেশের সুবিধা, বিশ্রামের জায়গা এবং নিরাপদ যাতায়াতও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পুজোর আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন পরিবারের প্রবীণ সদস্যরাও নিশ্চিন্তে দেবী দর্শনের সুযোগ পান।





