কলকাতা: রাতের আকাশে আলোর ঝলকানি, মণ্ডপের গায়ে ফুটে ওঠা শিল্পের কারুকাজ আর আলোকসজ্জার মায়াবী আবহ দুর্গাপুজোর কলকাতাকে অন্য রূপ দেয় এই আলোই। কিন্তু যে আলোয় মুগ্ধ হন লক্ষ লক্ষ দর্শনার্থী, তার নেপথ্যে রয়েছে বিপুল বিদ্যুতের চাহিদা। প্রশ্ন উঠছে, LED-র ব্যবহার বাড়লেও পুজোর বিদ্যুৎ খরচ কি সত্যিই কমছে? ২০২৬ সালের দুর্গাপুজোর আগে প্রকাশিত বিদ্যুৎ দফতর ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য সেই হিসাবেরই এক গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে।
১২ বছরে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে ৪২৭ শতাংশ
২০২৪ সালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুজো মণ্ডপগুলির জন্য অস্থায়ী বিদ্যুৎ সংযোগের আবেদন ২০১১ সালের ২০,৯৭০টি থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ৪৭,২৭৫টিতে পৌঁছেছিল। একই সময়ে পুজো মণ্ডপগুলির সম্মিলিত বিদ্যুৎ চাহিদা ২১০ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে ১,১০৭ মেগাওয়াট হয়েছিল—বৃদ্ধির হার প্রায় ৪২৭ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যানের গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, LED আলো ব্যবহারের মতো শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি জনপ্রিয় হলেও মণ্ডপের আকার, আলোকসজ্জার ব্যাপ্তি, সিসিটিভি, মনিটর এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে প্রতি আলোয় বিদ্যুৎ সাশ্রয় হলেও সামগ্রিক চাহিদা বেড়ে যেতে পারে। তবে মেগাওয়াটে প্রকাশিত এই পরিসংখ্যান বিদ্যুতের চাহিদা বা লোড বোঝায়, মোট ব্যবহৃত ইউনিট নয়।
২০২৬ সালে কলকাতার বিদ্যুতের চাহিদা কত?
২০২৬ সালের পুজোর আগে প্রকাশিত পূর্বাভাস অনুযায়ী, কলকাতা ও সংলগ্ন CESC এলাকায় তৃতীয়ার দিনে সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২,০৫০ মেগাওয়াট হতে পারে। ২০২৫ সালে একই সময়ে সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ২,১২৬ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, এ বছর চাহিদা প্রায় ৩.৬ শতাংশ কম হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে।
অন্যদিকে, WBSEDCL-র আওতাধীন এলাকায় পুজোর সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১২,০০০ মেগাওয়াটে পৌঁছতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। গোটা রাজ্যে পুজোর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনাও এই চাহিদার হিসাবের সঙ্গে যুক্ত।
তবে কলকাতার সামগ্রিক বিদ্যুতের চাহিদাকে শুধু মণ্ডপের আলোর খরচ বলে ধরে নেওয়া যাবে না। বাড়ি, দোকান, রেস্তরাঁ, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য পরিষেবার বিদ্যুৎ ব্যবহারও এই মোট চাহিদার অন্তর্ভুক্ত।
LED আলোয় কি সত্যিই সাশ্রয় হচ্ছে?
LED প্রযুক্তি সাধারণত প্রচলিত ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্বের তুলনায় কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে একই ধরনের আলোকসজ্জা দিতে পারে। কিন্তু পুজো মণ্ডপে আলোর সংখ্যা, উজ্জ্বলতা, ব্যবহারের সময় এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের পরিমাণ বেড়ে গেলে সেই সাশ্রয়ের একটা অংশ নষ্ট হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, একটি ১০০ ওয়াটের আলো প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা জ্বললে ১ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ করে। একই সময়ে ২০ ওয়াটের LED আলো জ্বললে খরচ হয় ০.২ ইউনিট। কিন্তু ২০ ওয়াটের এমন ১০০টি আলো একসঙ্গে জ্বললে প্রতিদিন খরচ হবে ২০ ইউনিট। অর্থাৎ, আলো কতটা শক্তি সাশ্রয়ী, তার পাশাপাশি কতগুলি আলো কতক্ষণ জ্বলছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
পুজোর বিদ্যুৎ বিল কে দেয়?
পুজো মণ্ডপের বিদ্যুতের খরচ নির্ভর করে অনুমোদিত সংযোগ, ব্যবহৃত বিদ্যুৎ, প্রযোজ্য ট্যারিফ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি ছাড় বা অনুদানের উপর। ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ছোট ও কম বাজেটের পুজো কমিটিগুলির জন্য বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘোষণা করেছে। তবে এই সুবিধার যোগ্যতা ও প্রযোজ্য শর্ত সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশিকা থেকে যাচাই করা দরকার।
অন্যদিকে, CESC এবং WBSEDCL-র পুজো সংযোগ ও বিল সংক্রান্ত পরিষেবায় ব্যবহারকারীরা নিজেদের সংযোগের বিল ও পেমেন্টের তথ্য দেখতে পারেন।
আলোর উৎসব, সঙ্গে শক্তি সাশ্রয়ের চ্যালেঞ্জ
দুর্গাপুজোর আলোকসজ্জা কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই আলো কমানোই একমাত্র সমাধান নয়; বরং দক্ষ LED প্রযুক্তি, অপ্রয়োজনীয় আলো বন্ধ রাখা, টাইমার ব্যবহার এবং সঠিক বৈদ্যুতিক লোড পরিকল্পনার মাধ্যমে শক্তির অপচয় কমানো সম্ভব।
পুজোর আলোর প্রকৃত খরচ জানতে হলে মণ্ডপভিত্তিক বিদ্যুৎ বিল, ব্যবহৃত ইউনিট এবং আলোকসজ্জার সময়ের তথ্য প্রয়োজন। কারণ, বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা আর মোট বিদ্যুৎ খরচ এক বিষয় নয়। এই পার্থক্য বুঝলেই স্পষ্ট হবে, কলকাতার আলোর উৎসব কতটা শক্তি ব্যবহার করছে এবং কোথায় আরও সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে।





