বিশেষ প্রতিবেদন: দিনের আলোয় দিগন্তজোড়া সাদা প্রান্তর। সূর্যের আলো পড়লে মনে হয়, মাটি যেন সাদা চাদরে ঢাকা। আর রাত নামতেই বদলে যায় গোটা দৃশ্য। পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় সেই সাদা প্রান্তর ঝলমল করে ওঠে রুপোলি আভায়। চারদিকে যত দূর চোখ যায়, শুধু সাদা নুনের বিস্তার আর আকাশভরা চাঁদের আলো। কোনও বরফে ঢাকা উপত্যকা নয়, এ দৃশ্য ভারতেরই এক প্রান্তে। গুজরাতের কচ্ছের রণ— বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়কর নোনা মরুভূমি। শীতকালে এই জায়গার সৌন্দর্য যেমন বেড়ে যায়, তেমনই শুরু হয় স্থানীয় সংস্কৃতি, লোকসঙ্গীত ও হস্তশিল্পের উৎসব ‘রণ উৎসব’। প্রকৃতি ও সংস্কৃতির এমন মেলবন্ধন দেখতে শীতই আদর্শ সময়।
কচ্ছের রণ আসলে মরুভূমির মতো দেখতে একটি বিশাল নোনা জলাভূমি। বর্ষাকালে বিস্তীর্ণ এলাকা জলে ডুবে যায়। বর্ষা কেটে গেলে জল শুকিয়ে মাটির উপর জমে থাকে সাদা নুনের আস্তরণ। শুষ্ক মরসুমে সেই নোনা প্রান্তর দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত সাদা ভূমির চেহারা নেয়। দিনের বেলায় সূর্যের আলোয় ঝলসে ওঠে সেই সাদা জমি। আর পূর্ণিমার রাতে চাঁদের আলোয় তৈরি হয় অন্য রকম এক দৃশ্য— মনে হয়, রুপোলি আলোয় ভেসে রয়েছে গোটা মরুভূমি।
এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে শীতের মাসগুলিতে দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা ভিড় করেন কচ্ছের রণে। সাধারণত অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময় এই অঞ্চল ঘুরে দেখার পক্ষে উপযুক্ত। বর্ষার জল সরে যাওয়ার পর নোনা প্রান্তরের বিস্তার আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গরমের তীব্রতা কম থাকায় দিনের বেলায় ঘোরাঘুরি করাও তুলনামূলকভাবে আরামদায়ক। তবে রাতের দিকে তাপমাত্রা অনেকটা নেমে যেতে পারে। তাই শীতের পোশাক সঙ্গে রাখা জরুরি।
কচ্ছের রণ ঘুরতে যাওয়ার অন্যতম আকর্ষণ ‘রণ উৎসব’। গুজরাতের ধোরদো এলাকায় এই উৎসবকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় অস্থায়ী তাঁবুর শহর। সেখানে স্থানীয় লোকসঙ্গীত, নাচ, ঐতিহ্যবাহী খাবার ও হস্তশিল্পের নানা আয়োজন থাকে। কচ্ছের নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ মেলে পর্যটকদের। সাদা মরুভূমির সৌন্দর্য দেখার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা ও শিল্পকলার সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন তাঁরা।
২০২৬-২৭ মরসুমে রণ উৎসবের সূচি অনুযায়ী, উৎসব চলবে ১ নভেম্বর ২০২৬ থেকে ৭ মার্চ ২০২৭ পর্যন্ত। পূর্ণিমার রাতগুলিতে সাদা নোনা প্রান্তরের সৌন্দর্য বিশেষ ভাবে উপভোগ করা যায়। তবে চাঁদের আলোয় মরুভূমি দেখার পরিকল্পনা থাকলে আগে থেকেই নির্দিষ্ট তারিখ, প্রবেশের নিয়ম এবং থাকার ব্যবস্থা যাচাই করে নেওয়া ভাল। পূর্ণিমার সময় পর্যটকের ভিড় বাড়তে পারে, ফলে জনপ্রিয় থাকার জায়গাগুলিতে আগাম বুকিংয়ের প্রয়োজন হতে পারে।
কী ভাবে পৌঁছবেন কচ্ছের রণে?
কচ্ছের রণ ভ্রমণের জন্য ভুজ শহরকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করা সবচেয়ে সুবিধাজনক। ট্রেন, বিমান কিংবা সড়কপথে গুজরাতের বিভিন্ন বড় শহর থেকে ভুজে পৌঁছনো যায়। ভুজ থেকে রণ উৎসবের মূল কেন্দ্র ধোরদোর দূরত্ব প্রায় ৮৫ থেকে ৯৫ কিলোমিটার। গাড়িতে যেতে সাধারণত দেড় থেকে দু’ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। রাস্তার পরিস্থিতি ও যান চলাচলের উপর অবশ্য সময়ের তারতম্য হয়।
ভুজ থেকে গাড়ি ভাড়া করে ধোরদো যাওয়া যায়। রণ উৎসবের কিছু প্যাকেজে যাতায়াতের ব্যবস্থাও থাকে। তবে সাদা রণ আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় সেখানে প্রবেশের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অনুমতিপত্রের প্রয়োজন হতে পারে। যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমে অনুমতির নিয়ম যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে উৎসবের ব্যস্ত সময়ে শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনা করলে সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
রণ দেখেই ফিরবেন না, ঘুরে দেখুন কচ্ছও
কচ্ছের সৌন্দর্য শুধু সাদা মরুভূমিতে সীমাবদ্ধ নয়। হাতে তিন-চার দিন সময় থাকলে আশপাশের আরও কয়েকটি জায়গা ঘুরে দেখা যায়। তার মধ্যে অন্যতম কালো ডুংগর। কচ্ছের এই উঁচু এলাকা থেকে বিস্তীর্ণ নোনা প্রান্তরের দৃশ্য দেখা যায়। সূর্যাস্তের সময় বদলে যাওয়া আলোয় মরুভূমির রং ও বিস্তার আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
এ ছাড়া ভুজ শহরের ঐতিহাসিক স্থাপত্য, প্রাগ মহল, ছত্তরডি এবং ভুজিয়া পাহাড় ঘুরে দেখা যেতে পারে। কচ্ছের গ্রামগুলিতে রয়েছে সমৃদ্ধ হস্তশিল্পের ঐতিহ্য। স্থানীয় শিল্পীরা সূচিশিল্প, আয়না বসানো কাজ, বস্ত্রবয়ন এবং ব্লক প্রিন্টিংয়ের মতো শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে অজরখ ছাপাই ও কচ্ছের ঐতিহ্যবাহী সূচিশিল্পের খ্যাতি রয়েছে। স্থানীয় শিল্পীদের কাছ থেকে সরাসরি হস্তশিল্প কেনা যেমন স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হতে পারে, তেমনই তাঁদের জীবিকা ও ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতেও সাহায্য করে।
থাকবেন কোথায়, কী প্রস্তুতি নেবেন?
রণ উৎসবের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভাবে উপভোগ করতে চাইলে ধোরদোর তাঁবুর শহরে থাকার ব্যবস্থা করা যায়। সেখানে উৎসবের আয়োজন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও অন্যান্য পরিষেবার কাছাকাছি থাকা সম্ভব। অন্য দিকে, ভুজে থেকে প্রতিদিন গাড়িতে যাতায়াত করেও কচ্ছের বিভিন্ন জায়গা ঘোরা যায়। কোন ধরনের ভ্রমণ পছন্দ, কত দিন সময় রয়েছে এবং বাজেট কত— তার উপর নির্ভর করবে থাকার জায়গা নির্বাচন।
শীতকালে দিনের বেলায় আবহাওয়া মনোরম হলেও রাতের ঠান্ডাকে অবহেলা করা ঠিক নয়। গরম পোশাক, আরামদায়ক জুতো এবং পর্যাপ্ত পানীয় জল সঙ্গে রাখা ভাল। নোনা জমির উপর হাঁটার সময় স্থানীয় নির্দেশ মেনে চলা জরুরি। মরুভূমির পরিবেশের ক্ষতি হয়, এমন কোনও কাজ করা উচিত নয়। পাশাপাশি, ভ্রমণের আগে আবহাওয়া ও স্থানীয় যাতায়াতের পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন।
কচ্ছের রণের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অবশ্য কোনও নির্দিষ্ট পর্যটন কার্যকলাপ নয়। কখনও সূর্যাস্তের রং বদলাতে দেখা, কখনও পূর্ণিমার আলোয় নোনা প্রান্তরের নীরবতা অনুভব করা, আবার কখনও স্থানীয় শিল্পীদের তৈরি সামগ্রীর মধ্যে খুঁজে পাওয়া বহু প্রজন্মের ঐতিহ্য— এই সব মিলিয়েই কচ্ছের অভিজ্ঞতা। প্রকৃতির অপার বিস্তার আর মানুষের সংস্কৃতির এমন মেলবন্ধন খুব বেশি জায়গায় দেখা যায় না।
শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে কয়েকটা দিন কাটাতে চাইলে কচ্ছের রণ হতে পারে অন্য রকম গন্তব্য। দিনের সাদা প্রান্তর আর রাতের রুপোলি মরুভূমি— একই জায়গার দুই রূপ যেন চোখের সামনে খুলে দেয় প্রকৃতির এক আশ্চর্য জগৎ। আর শীতের পূর্ণিমায় সেই দৃশ্য দেখার সুযোগ পেলে ভ্রমণের স্মৃতি দীর্ঘ দিন মনে থেকে যাওয়ারই কথা।





