নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত, কলকাতা: সপ্তাহের শুরুতেই ফের দুর্যোগের আশঙ্কা দক্ষিণবঙ্গে। উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া নিম্নচাপ আরও শক্তি বাড়িয়ে সোমবার গভীর নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। তার জেরেই সোমবার দক্ষিণবঙ্গের প্রায় সর্বত্র বৃষ্টি, কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস। সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতির আশঙ্কা পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম ও বাঁকুড়ায়। এই তিন জেলায় কোথাও কোথাও ২০ সেন্টিমিটারের বেশি বৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছে আলিপুর আবহাওয়া দফতর।
সাগরে নতুন করে নিম্নচাপ, বাড়ছে শক্তি
আবহাওয়া দফতরের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া নিম্নচাপটি সোমবার আরও শক্তিশালী হতে পারে। এই নিম্নচাপের প্রভাবে দক্ষিণবঙ্গের আকাশ মূলত মেঘলা থাকবে এবং অধিকাংশ জেলাতেই হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি বা বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কয়েকটি জেলায় পরিস্থিতি অনেক বেশি গুরুতর।
পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম এবং বাঁকুড়ায় ৭ থেকে ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। কোথাও কোথাও ২০ সেন্টিমিটারের বেশি ‘অত্যন্ত ভারী’ বৃষ্টিরও আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ, অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টি হয়ে স্থানীয় ভাবে জল জমা বা প্লাবনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
সাত জেলায় কমলা সতর্কতা, কোথায় কতটা বৃষ্টি?
পশ্চিমাঞ্চলের তিন জেলার পাশাপাশি পূর্ব মেদিনীপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পুরুলিয়া, হাওড়া, হুগলি এবং পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমানেও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। আবহাওয়া দফতরের হিসাবে, এই জেলাগুলির কোথাও কোথাও ৭ থেকে ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে।
অন্য দিকে দক্ষিণবঙ্গের বাকি জেলাগুলিতেও সোমবার এক-দু’টি জায়গায় ৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি হতে পারে। ফলে শুধু পশ্চিমাঞ্চল বা উপকূল নয়, গাঙ্গেয় দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকাতেই বর্ষার দাপট দেখা যেতে পারে।
লাল না কমলা? সতর্কতার রঙে বদল কেন
সোমবারের সতর্কতা নিয়ে লাল ও কমলা—দুই ধরনের সতর্কতার উল্লেখ রয়েছে। আলিপুর আবহাওয়া দফতরের বিশেষ বুলেটিনে পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম ও বাঁকুড়ার জন্য ২০ সেন্টিমিটারের বেশি অতিভারী বৃষ্টির সম্ভাবনাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেই কারণেই এই তিন জেলার পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগের।
অন্য কয়েকটি জেলায় ৭-২০ সেন্টিমিটার বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় কমলা সতর্কতা জারি হয়েছে। অর্থাৎ, ‘সাত জেলায় কমলা’ বললেও বাস্তবে পশ্চিমাঞ্চলের তিন জেলায় বৃষ্টির তীব্রতা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সোমবারের পরিস্থিতি তাই নজরে রাখছে প্রশাসন।
কলকাতায় কী পরিস্থিতি?
কলকাতার জন্য আপাতত হলুদ সতর্কতা। সোমবার শহরের আকাশ মূলত মেঘলা থাকবে। দফায় দফায় বৃষ্টি এবং বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ভারী বৃষ্টির সময় শহরের নিচু এলাকা, আন্ডারপাস এবং জল জমার প্রবণ রাস্তাগুলিতে সমস্যা বাড়তে পারে। শহরে বৃষ্টির পাশাপাশি বজ্রবিদ্যুতের আশঙ্কাও থাকছে। তাই বৃষ্টি শুরু হলে খোলা জায়গায় না থাকার পাশাপাশি গাছ বা বৈদ্যুতিক খুঁটির নীচে দাঁড়ানো এড়াতে বলা হয়েছে।
ঝোড়ো হাওয়া, বজ্রপাতেও সতর্কতা
শুধু বৃষ্টি নয়, সোমবার দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বজ্রবিদ্যুৎ এবং ঝোড়ো হাওয়ারও সতর্কতা রয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও পূর্ব মেদিনীপুরে কোথাও কোথাও ঘণ্টায় ৪০-৫০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া বইতে পারে। অন্য জেলাগুলিতে ঝড়ের গতিবেগ ৩০-৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এর ফলে গাছের ডাল ভেঙে পড়া, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, কাঁচা বাড়ি বা দুর্বল কাঠামোর ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলের গ্রামাঞ্চল ও নিচু এলাকাগুলিতে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
মঙ্গলবারও স্বস্তি নেই
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সোমবারের পরেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে না। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী মঙ্গলবারও দক্ষিণবঙ্গের সব জেলায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি বা বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি হতে পারে। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, ঝাড়গ্রাম এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে এক-দু’টি জায়গায় ৭-১১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে ১৯ থেকে ২২ অগস্টের মধ্যে বৃষ্টির তীব্রতা ধীরে ধীরে কমে এলেও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি চলবে। অর্থাৎ, টানা প্রবল বর্ষণের মূল পর্ব সোমবার ও মঙ্গলবার হলেও সপ্তাহের মাঝামাঝি পর্যন্ত পুরোপুরি শুকনো আবহাওয়া ফেরার সম্ভাবনা কম।
ডিভিসির জল, বাড়ছে প্লাবনের আশঙ্কা
বৃষ্টির সঙ্গে এবার বাড়তি চিন্তা দামোদর অববাহিকা ঘিরেও। ডিভিসির সরকারি ওয়েবসাইটে মাইথন ও পাঞ্চেত নিয়ে ১৭-১৮ অগস্টের জন্য বন্যা-সতর্কতা বার্তা প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে ভারী বৃষ্টির জেরে নদী ও জলাধারের জলস্তর বাড়লে পশ্চিম বর্ধমান, পূর্ব বর্ধমান, হুগলি ও হাওড়ার নিচু এলাকাগুলিতে পরিস্থিতির উপর নজর রাখা জরুরি।
তবে নির্দিষ্ট কত কিউসেক জল ছাড়া হচ্ছে, সেই সংখ্যা না থাকায় তা ধরে অতিরিক্ত আশঙ্কা তৈরি করা ঠিক হবে না। আপাতত ডিভিসির সতর্কবার্তাই পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাচ্ছে।
বন্যা, জল জমা, ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা
আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, প্রবল বৃষ্টিতে নিচু এলাকা সাময়িক ভাবে প্লাবিত হতে পারে। জল জমতে পারে রাস্তা ও আন্ডারপাসে। দাঁড়িয়ে থাকা ফসল ও উদ্যানচাষের ক্ষতির পাশাপাশি কাঁচা রাস্তা এবং দুর্বল কাঁচা বাড়ির ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে। বজ্রপাতের ঝুঁকি বিশেষ করে খোলা মাঠে বেশি। উপকূলবর্তী এলাকায় সমুদ্রও উত্তাল থাকতে পারে। মৎস্যজীবীদের জন্য সতর্কতা জারি রয়েছে এবং ১৯ অগস্ট পর্যন্ত সমুদ্রে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উত্তরবঙ্গেও বৃষ্টি, তবে ছবিটা আলাদা
দক্ষিণবঙ্গের মতো উত্তরবঙ্গেও বৃষ্টি চলবে। মঙ্গলবার কালিম্পং ও জলপাইগুড়িতে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বুধবার দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং ও আলিপুরদুয়ারে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। বজ্রবিদ্যুৎ ও দমকা হাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। সব মিলিয়ে নতুন সপ্তাহের প্রথম ৪৮ ঘণ্টাই দক্ষিণবঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সোমবার সবচেয়ে বেশি নজর পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম ও বাঁকুড়ায়; মঙ্গলবারও পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা। ১৯ অগস্ট থেকে বৃষ্টির তীব্রতা কমার সম্ভাবনা থাকলেও সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত বর্ষার দাপট পুরোপুরি কাটছে না। তাই শহর থেকে গ্রাম—নিচু এলাকা, নদী তীরবর্তী অঞ্চল এবং দুর্বল বাড়ির বাসিন্দাদের এখনই বাড়তি সতর্ক থাকার পরামর্শ।