নিউজ ডেস্ক: দুর্গাপুজো মানেই আলোর রোশনাই, ঢাকের বাদ্যি, নতুন পোশাক আর প্যান্ডেল হপিং। কিন্তু এই উৎসবের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে, যা অনেক সময় চোখের আড়ালেই থেকে যায়। তা হল অর্থনীতি। পুজোর কয়েকটি দিনকে কেন্দ্র করে কলকাতা ও গোটা বাংলায় সক্রিয় হয়ে ওঠে খুচরো বাজার, রেস্তরাঁ, হোটেল, পরিবহণ, পর্যটন, বিজ্ঞাপন এবং অসংখ্য ছোট ব্যবসা। প্রতিমাশিল্পী থেকে ফুটপাতের খাবার বিক্রেতা বহু মানুষের কাছে দুর্গাপুজো বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়ের সময়।
২০২৫ সালের দুর্গাপুজোকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির আকার প্রায় ৪৬,০০০–৫০,০০০ কোটি টাকা হতে পারে বলে শিল্পমহলের একাংশের অনুমান প্রকাশিত হয়েছিল। অন্য একটি প্রতিবেদনে প্রায় ৬৫,০০০ কোটি টাকার হিসাব দেওয়া হয়েছিল। এই পরিসংখ্যানগুলি আলাদা অনুমান ও হিসাবপদ্ধতির ভিত্তিতে তৈরি; তাই এগুলিকে একটিমাত্র নিশ্চিত অঙ্ক হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
পোশাকের বাজারে উৎসবের আমেজ
পুজোর কেনাকাটা কলকাতার অর্থনীতির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি। গড়িয়াহাট, হাতিবাগান, নিউ মার্কেট থেকে শুরু করে বড় শপিং মল সর্বত্রই উৎসবকে ঘিরে কেনাকাটার চাহিদা বাড়ে। শাড়ি, জামাকাপড়, জুতো, প্রসাধনী, গয়না ও উপহারের সামগ্রী বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা এই সময়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন। ব্রিটিশ কাউন্সিলের ২০১৯ সালের একটি সমীক্ষায় দুর্গাপুজোকে ঘিরে সৃজনশীল অর্থনীতির মধ্যে খুচরো ব্যবসার আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছিল ২৭,৩৬৪ কোটি টাকা। এই হিসাবটি সেই সময়ের, ২০২৬ সালের বর্তমান বাজারের পরিমাপ নয়।
স্ট্রিট ফুড থেকে রেস্তরাঁ,খাবারের ব্যবসায় বাড়তি চাহিদা
কলকাতার পুজো আর স্ট্রিট ফুড যেন একে অপরের পরিপূরক। ফুচকা, রোল, মোগলাই পরোটা, বিরিয়ানি, মোমো, মাছভাজা থেকে শুরু করে মিষ্টি প্যান্ডেল ঘোরার পাশাপাশি খাবারের দোকানগুলিতেও ভিড় করেন মানুষ। বড় রেস্তরাঁর পাশাপাশি ছোট খাবারের দোকান, অস্থায়ী স্টল এবং রাস্তার বিক্রেতারাও এই সময় বাড়তি ক্রেতা পান। তবে বিক্রি বাড়লেই যে লাভ বাড়বে, তা নয়। রান্নার গ্যাস, কাঁচামাল, দোকানভাড়া এবং কর্মীদের মজুরির খরচও ব্যবসার লাভের অঙ্কে প্রভাব ফেলে।
হোটেল ও পর্যটনে বাড়তি গতি
দুর্গাপুজো দেখতে কলকাতায় আসেন রাজ্যের বিভিন্ন জেলা, দেশের অন্য প্রান্ত এবং বিদেশের বহু পর্যটক। ফলে হোটেল, গেস্ট হাউস, রেস্তরাঁ ও পর্যটন পরিষেবার চাহিদা বাড়তে পারে। পর্যটকেরা শুধু হোটেলে খরচ করেন না, কেনাকাটা, খাবার, গাড়ি ভাড়া এবং অন্যান্য পরিষেবাতেও অর্থ ব্যয় করেন। এই পর্যটন-নির্ভর খরচ স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আয়ের সুযোগ তৈরি করে। তবে কতটা ব্যবসা বাড়ল, তা জানতে হোটেলের দখল, পর্যটকের সংখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির প্রকৃত হিসাব দেখা জরুরি।
পরিবহণেও বাড়ে ব্যস্ততা
প্যান্ডেল হপিংয়ের জন্য মেট্রো, বাস, ট্যাক্সি, অ্যাপ-ক্যাব এবং অটো সব ধরনের পরিবহণের উপরই বাড়তি চাপ পড়ে। যাতায়াতের চাহিদা বাড়লে চালক ও পরিবহণ পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত মানুষের অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, যানজট এবং নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করাও প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
মণ্ডপশিল্পী থেকে ছোট ব্যবসায়ী! উৎসবের আসল কারিগর
দুর্গাপুজোর অর্থনীতির বড় অংশ জুড়ে রয়েছেন মৃৎশিল্পী, বাঁশশিল্পী, আলোকসজ্জার কারিগর, কাঠমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, ঢাকি, ফুল বিক্রেতা ও অস্থায়ী শ্রমিকেরা। পুজোর কয়েক দিন দৃশ্যমান হলেও তাঁদের কাজ শুরু হয় বহু মাস আগে। ব্রিটিশ কাউন্সিলের সমীক্ষায় প্রতিমা নির্মাণশিল্পের বার্ষিক অর্থনৈতিক মূল্য আনুমানিক ২৬০–২৮০ কোটি টাকা ধরা হয়েছিল। এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বহু কারিগর ও সহায়ক কর্মীর জীবিকা। তবে উৎসবের অর্থনীতি সবার কাছে সমান সুবিধা নিয়ে আসে না। বড় সংস্থা ও সংগঠিত ব্যবসার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও যাতে ন্যায্য আয়, প্রয়োজনীয় ঋণ এবং নিরাপদ কাজের সুযোগ থাকে, সেই দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্গাপুজোর অর্থনীতির সামনে বড় প্রশ্ন
দুর্গাপুজো বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও ব্যবসারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। কিন্তু অর্থনীতির প্রকৃত ছবি বুঝতে শুধু মোট লেনদেনের অঙ্ক যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে, কত মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হল, ছোট ব্যবসায়ীদের প্রকৃত লাভ কতটা বাড়ল এবং উৎসবের আয় কতটা বিস্তৃতভাবে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। উৎসবের সাফল্য শুধু আলোকসজ্জা বা মণ্ডপের জাঁকজমকে নয় সেই উৎসব কত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারল, তার মধ্যেও লুকিয়ে রয়েছে তার আসল অর্থনৈতিক মূল্য।





