সকালে ঘুম ভেঙে প্রথম কাজ মোবাইল হাতে নেওয়া। খবর পড়া, বার্তা পাঠানো, ভিডিয়ো দেখা, অনলাইন পেমেন্ট, বিদেশে থাকা মানুষের সঙ্গে ভিডিয়ো কল—সব কিছুই কয়েক সেকেন্ডে। আমাদের চোখে এই গোটা ব্যবস্থাটি যেন আকাশে ভাসমান। মোবাইল টাওয়ার আছে, স্যাটেলাইট আছে, ‘ক্লাউড’ আছে। ফলে মনে হয়, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে তথ্য বুঝি বাতাসের পথেই ছুটে যায়। বাস্তব ছবিটি কিন্তু অনেকটাই আলাদা।
সমুদ্রের নীচে, বহু হাজার কিলোমিটার দূরে, অন্ধকার জলের তলায় বিছিয়ে রয়েছে অসংখ্য ফাইবার-অপটিক কেবল। সেই কেবলগুলির মধ্য দিয়েই মহাদেশ থেকে মহাদেশে ছুটে চলে বিপুল পরিমাণ তথ্য। আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সাবমেরিন কেবল তাই আধুনিক ডিজিটাল সভ্যতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ভারতের টেলিকম নিয়ন্ত্রক সংস্থা TRAI-ও বলেছে, এই কেবলগুলি বিশ্ব জুড়ে ডিজিটাল অর্থনীতির ‘ধমনী’র মতো কাজ করে। অর্থাৎ, ইন্টারনেটের যে পৃথিবীকে আমরা ‘অদৃশ্য’ বলে মনে করি, তার পিছনে রয়েছে অত্যন্ত বাস্তব, অত্যন্ত স্পর্শযোগ্য এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিকাঠামো।
কী ভাবে চলে সেই অদৃশ্য যোগাযোগ?
সাবমেরিন কেবলের ভিতরে থাকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম কাচের ফাইবার। বৈদ্যুতিক তারের মতো কেবল দিয়ে বিদ্যুৎ বয়ে যায় না; আলোর সংকেতের মাধ্যমে তথ্য পাঠানো হয়। সেই সংকেত বহন করে কোটি কোটি বিট তথ্য—এক মুহূর্তে এক দেশ থেকে অন্য দেশে। সমুদ্রের তলায় কেবল বসানোর আগে নির্দিষ্ট রুটের সমীক্ষা হয়। সমুদ্রের গভীরতা, ভূপ্রকৃতি, ভূমিকম্পের সম্ভাবনা, মাছ ধরার এলাকা, জাহাজ চলাচলের পথ—সব কিছু বিবেচনা করা হয়।
উপকূলের কাছে কেবল অনেক সময় সমুদ্রের তলায় পুঁতে দেওয়া হয়, যাতে নোঙর বা মাছ ধরার যন্ত্রে ক্ষতি না হয়। গভীর সমুদ্রে অবশ্য অনেক কেবল সমুদ্রতলের উপর দিয়েই চলে। কেবল যত গভীরে যায়, তার সুরক্ষা ব্যবস্থাও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ হাজার হাজার মিটার জলের নীচে গিয়ে একটি কেবল মেরামত করা কোনও সাধারণ বৈদ্যুতিক লাইনের মেরামতির মতো নয়।
এক প্রান্তে ভারত, অন্য প্রান্তে ইউরোপ
ভারতের ডিজিটাল ভবিষ্যতের সঙ্গে এই সমুদ্রের তলার তারের সম্পর্ক ক্রমেই বাড়ছে। মুম্বই ও চেন্নাই দীর্ঘদিন ধরে ভারতের আন্তর্জাতিক ডিজিটাল যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। TRAI-র নথিতে মুম্বই ও চেন্নাইয়ে সাবমেরিন কেবল অবতরণ কেন্দ্রের ঘনত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চে কেন্দ্রীয় সরকার লোকসভায় জানিয়েছে, ভারতে চারটি নতুন সাবমেরিন কেবল ব্যবস্থা বিভিন্ন Cable Landing Station-এ কমিশনিংয়ের পর্যায়ে রয়েছে।
এর মধ্যে India-Europe Xpress মুম্বইয়ে, SEA-ME-WE-6 মুম্বই ও চেন্নাইয়ে, 2Africa মুম্বইয়ে এবং Raman Cable-ও মুম্বইয়ে অবতরণ করার কথা। আরও তিনটি কেবল ব্যবস্থা পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। এর অর্থ খুব স্পষ্ট। ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতি যত বড় হচ্ছে, আন্তর্জাতিক কেবল সংযোগের গুরুত্বও তত বাড়ছে। ডেটা সেন্টার বাড়ছে, ক্লাউড পরিষেবা বাড়ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে—আর তার সঙ্গে বাড়ছে দ্রুত, নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের প্রয়োজন।
একটি তার ছিঁড়লে কী হয়?
এখানেই লুকিয়ে আছে আসল বিপদ। একটি কেবল নষ্ট হলেই পৃথিবীর ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায় না। কারণ সাধারণত একাধিক কেবল এবং বিকল্প রুট থাকে। তথ্য অন্য পথে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু সমস্যা হয় যখন কোনও অঞ্চলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কেবল একই সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অথবা কোনও দেশের আন্তর্জাতিক সংযোগের বড় অংশ কয়েকটি নির্দিষ্ট রুটের উপর নির্ভরশীল থাকে।
তখন ইন্টারনেটের গতি কমতে পারে, লেটেন্সি বাড়তে পারে, আন্তর্জাতিক পরিষেবা ব্যাহত হতে পারে। তার প্রভাব পড়তে পারে ব্যাঙ্কিং, শেয়ার বাজার, অনলাইন ব্যবসা, ক্লাউড পরিষেবা, কল সেন্টার, সরকারি যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই। সেই কারণেই সাবমেরিন কেবলকে শুধু টেলিকম সংস্থার সম্পত্তি হিসেবে দেখার দিন শেষ। এগুলি এখন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো।
সবচেয়ে বড় শত্রু কখনও নোঙর, কখনও মাছ ধরার জাল
সাবমেরিন কেবলের বিপদ মানেই যে গুপ্তচরবৃত্তি বা নাশকতা, তা নয়। বরং দুর্ঘটনাই বহু ক্ষেত্রে বড় কারণ। জাহাজের নোঙর, মাছ ধরার যন্ত্র, সমুদ্রতলের ভূমিকম্প কিংবা ভূমিধস—বিভিন্ন কারণে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আর একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—ইচ্ছাকৃত ভাবে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত করা হলে কী হবে? ২০২৬ সালের অগস্টে অস্ট্রেলিয়ার পার্থের কাছে দুটি সাবমেরিন কেবলে পর পর ত্রুটি ধরা পড়ার ঘটনায় সেই প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে।
কেবলগুলির মালিক সংস্থা সন্দেহজনক জাহাজ চলাচলের কথা জানিয়েছে এবং অস্ট্রেলীয় ফেডারেল পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে। অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল সিকিউরিটি কলেজের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও সাবমেরিন কেবলকে জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো হিসেবে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। কারণ কোনও সংঘাতের সময়ে প্রতিপক্ষের যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল করার অন্যতম উপায় হতে পারে সমুদ্রের তলায় থাকা এই পরিকাঠামোকে নিশানা করা।
যুদ্ধের সংজ্ঞাও কি বদলাচ্ছে?
এক সময় যুদ্ধ মানেই ছিল সীমান্তে সেনা, আকাশে যুদ্ধবিমান, সমুদ্রে যুদ্ধজাহাজ। এখন যুদ্ধের একটি বড় অংশ চলে পরিকাঠামোর উপর। বিদ্যুৎ গ্রিড, স্যাটেলাইট, ডেটা সেন্টার, ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক এবং সাবমেরিন কেবল—সবই কৌশলগত সম্পদ। একটি দেশের ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থা যদি দুর্বল করা যায়, তার অর্থনীতি এবং প্রশাসনের উপরও চাপ তৈরি হতে পারে। সেই কারণেই সমুদ্রের তলার কেবল এখন শুধু প্রযুক্তির বিষয় নয়, ভূ-রাজনীতির বিষয়ও।
ভারতের সামনে নতুন সুযোগ, সঙ্গে নতুন ঝুঁকি
ভারতের অবস্থান এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ভারত মহাসাগরের মাঝামাঝি অবস্থান ভারতকে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সেতু হয়ে ওঠার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু সুযোগের সঙ্গে ঝুঁকিও আছে। ভারতের আন্তর্জাতিক কেবল অবতরণ কেন্দ্রগুলির একটি বড় অংশ কয়েকটি উপকূলীয় অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত। Carnegie Endowment-এর ২০২৬ সালের বিশ্লেষণ বলছে, ভারতের আন্তর্জাতিক সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্ক দ্রুত বাড়লেও এখনও নির্দিষ্ট কিছু উপকূলীয় অঞ্চলের উপর নির্ভরতা যথেষ্ট বেশি।
একই সঙ্গে কেবল মেরামতির ক্ষেত্রেও বিদেশি পরিষেবা ও জাহাজের উপর নির্ভরতা রয়েছে। অর্থাৎ কেবল ছিঁড়লে শুধু ‘কেবল মেরামত’ করলেই সমস্যা মেটে না। কোথায় ছিড়েছে তা খুঁজে বার করতে হবে, বিশেষ জাহাজ পাঠাতে হবে, সমুদ্রের তলা থেকে কেবল তুলে আনতে হবে, ক্ষতিগ্রস্ত অংশ বাদ দিয়ে নতুন অংশ জুড়তে হবে। প্রতিকূল আবহাওয়া থাকলে সময় আরও বাড়তে পারে।
দরকার একাধিক রাস্তা
একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানেই। ডিজিটাল দুনিয়ায় শুধু বেশি কেবল থাকলেই হবে না, বিকল্প রুটও থাকতে হবে।
একই সঙ্গে মুম্বই, চেন্নাই বা অন্য কোনও একটি উপকূলীয় অঞ্চলের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো প্রয়োজন। পূর্ব ও পশ্চিম—দুই উপকূলেই আন্তর্জাতিক সংযোগ বাড়ানো, কেবল ল্যান্ডিং স্টেশনের নিরাপত্তা জোরদার করা, দ্রুত মেরামতির ক্ষমতা তৈরি করা এবং সমুদ্রের কেবল রুট সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। TRAI-ও ভারতের জলসীমায় কেবল ক্ষতির ঝুঁকি কমাতে বিশেষ সামুদ্রিক করিডর, সংশ্লিষ্ট দফতরগুলির মধ্যে সমন্বয় এবং মৎস্যজীবীদের কেবল রুট সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার মতো পদক্ষেপের কথা বলেছে।
‘ক্লাউড’-এর নীচে যে সমুদ্র
প্রযুক্তি আমাদের এমন এক পৃথিবী দিয়েছে যেখানে দূরত্বের গুরুত্ব কমে এসেছে। কলকাতা থেকে লন্ডন, দিল্লি থেকে সিঙ্গাপুর, মুম্বই থেকে নিউ ইয়র্ক—সব যেন একই পর্দার মধ্যে। কিন্তু সেই দূরত্ব আসলে মুছে যায়নি। হাজার হাজার কিলোমিটার সমুদ্রের তলা দিয়ে একটি সরু কেবল সেই দূরত্বকে পেরিয়ে যায়।
আমরা যখন একটি ছবি পাঠাই, একটি ভিডিয়ো কল করি, বিদেশে টাকা পাঠাই কিংবা কয়েক সেকেন্ডে কোনও ওয়েবসাইট খুলে ফেলি, তখন সেই অদৃশ্য যাত্রার কথা মনে থাকে না। চোখের সামনে শুধু মোবাইলের পর্দা। চোখের আড়ালে সমুদ্রের অন্ধকারে চলতে থাকে আলোর স্রোত। সভ্যতার ইতিহাসে রাস্তা, রেলপথ, বন্দর, বিদ্যুৎলাইন যেমন অর্থনীতির প্রাণরেখা তৈরি করেছে, ডিজিটাল যুগে সাবমেরিন কেবলও তেমনই এক নতুন প্রাণরেখা।
তফাত শুধু একটাই, এটি আমাদের চোখের সামনে নেই। আর সম্ভবত সেই কারণেই এর গুরুত্বও আমরা সবচেয়ে কম বুঝি। যে দিন সমুদ্রের তলায় কোনও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেবল হঠাৎ থেমে যাবে, সে দিন হয়তো প্রথম বার মনে হবে—ইন্টারনেট কোনও আকাশে ভাসা জাদু নয়। তারও শিকড় আছে। সেই শিকড়ের অনেকটাই লুকিয়ে রয়েছে সমুদ্রের গভীরে, আমাদের চোখের আড়ালে।