বিশেষ প্রতিবেদন: একটি পুরনো বটগাছের ছায়ায় হয়তো বিশ্রাম নিয়েছেন কয়েক প্রজন্মের পথিক। তার ডালে বাসা বেঁধেছে পাখি, শিকড়ের আশপাশে আশ্রয় পেয়েছে নানা প্রাণী। গাছটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে স্থানীয় মানুষের স্মৃতি, লোককথা এবং এলাকার নিজস্ব পরিচয়। অথচ রাস্তা চওড়া করার প্রয়োজন দেখা দিলে সেই গাছের মূল্য অনেক সময় নির্ধারিত হয় তার কাঠের দাম দিয়ে। কয়েক ঘণ্টার করাতের শব্দে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে যায় কয়েক দশক, কখনও কয়েক শতাব্দীর জীবন্ত ইতিহাস।
গাছকে কেবল কাঠের উৎস হিসাবে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গিই পরিবেশ সংরক্ষণের অন্যতম বড় সমস্যা। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছের উপযোগিতা তার কাঠের বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি। সে কার্বন শোষণ করে, বাতাসের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং পাখি, কীটপতঙ্গ-সহ নানা জীবের বাসস্থান তৈরি করে। পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ মানুষের যাত্রাকে আরামদায়ক করে, গ্রাম ও শহরের পরিবেশকে দেয় স্বতন্ত্র পরিচয়। ফলে একটি গাছ কেটে ফেলার অর্থ শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদ হারানো নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু পরিবেশগত ও সামাজিক সুবিধাও হারিয়ে ফেলা।
ইতিহাসের পাতায় গাছের উত্তরাধিকার
ভারতের ইতিহাসে রাস্তার দু’ধারে গাছ লাগানোর ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। অতীতের শাসকেরা শুধু প্রাসাদ, দুর্গ বা স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেই নিজেদের পরিচয় রেখে যাননি। পথের ধারে গাছ লাগানো, যাত্রীদের বিশ্রামের ব্যবস্থা করা এবং যাতায়াতের পথকে ছায়াঘেরা করে তোলার মতো কাজও তাঁদের উত্তরাধিকারের অংশ হয়ে থেকেছে। উত্তর ভারতে শের শাহ সুরির আমলে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের পাশে বৃক্ষরোপণের কথা ঐতিহাসিক আলোচনায় উঠে আসে। দক্ষিণ ভারতেও শাসকদের উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল গাছের সারিতে ঘেরা পথ।
তৎকালীন সময়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া সহজ ছিল না। গাড়ি, মোটরযান বা আধুনিক পরিবহণের সুবিধা না থাকায় মানুষকে অনেকটা পথ হেঁটে কিংবা পশুবাহিত যান ব্যবহার করে যেতে হত। সেই যাত্রায় গাছের ছায়া ছিল অত্যন্ত মূল্যবান। ফলদ গাছ পথিককে খাবার জোগাত, বড় গাছের ছায়া দিত বিশ্রামের সুযোগ। এমন বহু প্রাচীন গাছ আজও অতীতের সঙ্গে বর্তমানের যোগসূত্র হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
রাজা বা শাসকের তৈরি স্থাপত্য সময়ের সঙ্গে ক্ষয়ে যেতে পারে, কোনও কোনও স্থাপনা হারিয়েও যায়। কিন্তু বহু বছর ধরে বেঁচে থাকা একটি গাছ সেই সময়ের ভূদৃশ্য, মানুষের জীবনযাত্রা এবং পরিবেশের পরিবর্তনের সাক্ষ্য বহন করতে পারে। তাই প্রাচীন বৃক্ষকে শুধু উদ্ভিদ হিসাবে দেখলে তার ঐতিহাসিক গুরুত্বও অস্বীকার করা হয়।
উন্নয়নের চাপে বিপন্ন পথের ধারের গাছ
আধুনিক ভারতের দ্রুত নগরায়ণ এবং সড়ক পরিকাঠামোর সম্প্রসারণ এই সবুজ উত্তরাধিকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে, শহরের ভিতরে রাস্তা চওড়া হচ্ছে, জাতীয় ও রাজ্য সড়ক সম্প্রসারণের কাজ চলছে। যানজট কমানো এবং যাতায়াতের গতি বাড়ানো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই কাজের পরিকল্পনায় পুরনো গাছের অস্তিত্বকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বেঙ্গালুরু ও দিল্লির মতো শহরে রাস্তার ধারের গাছ কাটা হলে নাগরিকদের মধ্যে প্রতিবাদ দেখা যায়। কিন্তু শহরের বাইরে বিভিন্ন এলাকার মধ্যে সংযোগকারী সড়কের দু’ধারে থাকা গাছের বিপদ অনেক সময় ততটা আলোচনায় আসে না। অথচ সেখানেও শতাব্দীপ্রাচীন বট, তেঁতুল কিংবা অন্য বড় গাছ রাস্তার পরিবেশ ও স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কর্ণাটকের বিভিন্ন সড়কের পাশে থাকা বহু পুরনো বটগাছ কেটে ফেলার ঘটনা পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এই ধরনের গাছ এক দিনে তৈরি হয় না। একটি চারাগাছকে বিশাল বৃক্ষে পরিণত হতে কয়েক দশক সময় লাগে। তাই পুরনো গাছ কেটে তার বদলে নতুন চারা লাগালেই যে ক্ষতি পূরণ হয়ে যাবে, এমন ভাবার কারণ নেই। নতুন চারার পক্ষে বড় গাছের মতো ছায়া দেওয়া, বিপুল পরিমাণ কার্বন সঞ্চয় করা কিংবা দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া বাস্তুতান্ত্রিক সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব হতে সময় লাগে।
রাস্তা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন, প্রকল্পের খরচ এবং প্রশাসনিক জটিলতার মতো বিষয়ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। কখনও গাছ কেটে রাস্তা চওড়া করাকে তুলনামূলক সহজ পথ বলে মনে করা হয়। কিন্তু বিকল্প নকশা, রাস্তার পাশের জমির ব্যবহার এবং গাছ বাঁচিয়ে পরিকাঠামো তৈরির সম্ভাবনা যথাযথ ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে কি না, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
শুধু গাছ লাগালেই কি ক্ষতি পূরণ হবে?
পরিবেশ রক্ষার আলোচনায় প্রায়ই বৃক্ষরোপণের কথা বলা হয়। কিন্তু গাছ লাগানোর পাশাপাশি পুরনো গাছ বাঁচিয়ে রাখাও সমান জরুরি। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ এবং সদ্য লাগানো চারার পরিবেশগত ভূমিকা এক নয়। পুরনো গাছের বিস্তৃত শিকড় মাটিকে ধরে রাখে, ঘন ডালপালা ছায়া তৈরি করে এবং নানা প্রজাতির পাখি ও প্রাণীর আশ্রয় হয়ে ওঠে। দীর্ঘ সময় ধরে তার চারপাশে যে বাস্তুতন্ত্র গড়ে ওঠে, তা নতুন করে তৈরি করতে বহু বছর লেগে যায়।
তাই কোনও সড়ক প্রকল্পের পরিকল্পনা করার সময় প্রথমেই দেখা দরকার, গাছ না কেটেও রাস্তার প্রয়োজন মেটানো সম্ভব কি না। রাস্তার নকশায় পরিবর্তন, বিকল্প পথ, উপযুক্ত জায়গায় জমি অধিগ্রহণ কিংবা মাঝের বিভাজক অংশে গাছ সংরক্ষণের ব্যবস্থা—পরিস্থিতি অনুযায়ী নানা উপায় বিবেচনা করা যেতে পারে। সব ক্ষেত্রে একই সমাধান কার্যকর হবে না। কিন্তু গাছ কাটাকে প্রথম এবং একমাত্র বিকল্প হিসাবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
যেখানে গাছ কাটতেই হবে, সেখানে স্বচ্ছ পরিবেশগত মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় অনুমতি এবং ক্ষতিপূরণমূলক বৃক্ষরোপণের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। সেই সঙ্গে নতুন গাছের পরিচর্যা ও বেঁচে থাকার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। শুধু কতগুলি চারা লাগানো হল, সেই হিসাব দিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণের সাফল্য বিচার করা যায় না। কতগুলি গাছ বেঁচে বড় হল এবং স্থানীয় পরিবেশে কী প্রভাব ফেলল, সেটাও দেখতে হবে।
গাছের সঙ্গে জড়িয়ে মানুষের জীবনও
বন ও বৃক্ষের গুরুত্ব শুধু পরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বহু গ্রামীণ ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা, খাদ্য, পশুখাদ্য, ওষুধ এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গাছ ও বনভূমির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ফল, পাতা, ছাল, রজন এবং নানা বনজ উপাদান মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে সাহায্য করে। বিভিন্ন অঞ্চলে নির্দিষ্ট গাছকে ঘিরে ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক রীতি এবং লোকজ ঐতিহ্যও গড়ে উঠেছে।
একই ভাবে রাস্তার ধারের পুরনো গাছ কোনও গ্রামের পরিচিত চিহ্ন হতে পারে। কোনও গাছের নীচে বসে স্থানীয় মানুষ বিশ্রাম নেন, সেখানে বসে বাজার বা গ্রামের নানা বিষয়ে আলোচনা হয়। গাছটি কেটে ফেলা হলে সেই পরিচিত পরিসরও বদলে যায়। এই ক্ষতি সব সময় অর্থের অঙ্কে মাপা সম্ভব নয়।
গাছের কাঠ অবশ্যই মানুষের প্রয়োজন মেটাতে কাজে লাগে। নির্মাণ, আসবাব এবং নানা শিল্পে কাঠের ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু সেই প্রয়োজন মেটানোর জন্য পরিকল্পিত বন ব্যবস্থাপনা, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কাঠের ব্যবহার এবং অপচয় কমানোর দিকে নজর দেওয়া দরকার। প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা প্রতিটি গাছকে নির্বিচারে কেটে কাঠে পরিণত করাই যে সম্পদের সবচেয়ে কার্যকর ব্যবহার, এমন ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়।
আগামী প্রজন্মের কাছে কী রেখে যাব আমরা?
আজকের উন্নয়নমূলক সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন আগামী দিনের মানুষ করবে। তারা দেখবে, আমরা কতগুলি রাস্তা তৈরি করেছি, কত দ্রুত যাতায়াতের ব্যবস্থা করেছি—কিন্তু পাশাপাশি এটাও দেখবে, সেই উন্নয়নের পথে কতগুলি পুরনো গাছ হারিয়ে গিয়েছে এবং প্রকৃতিকে রক্ষা করার জন্য আমরা কী ব্যবস্থা নিয়েছি।
একটি সড়ক কয়েক বছরের মধ্যেই নতুন করে তৈরি বা সম্প্রসারিত করা সম্ভব। কিন্তু কয়েকশো বছরের পুরনো একটি গাছ কেটে ফেললে সেই ক্ষতি দ্রুত পূরণ করা যায় না। তাই উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণকে পরস্পরের বিরোধী হিসাবে না দেখে দু’টির মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা প্রয়োজন।
গাছকে বাঁচিয়ে রাখার অর্থ অতীতকে আঁকড়ে থাকা নয়; বরং ভবিষ্যতের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা। রাস্তা, শহর ও শিল্পের উন্নয়ন প্রয়োজন, কিন্তু সেই উন্নয়ন যেন প্রকৃতির অস্তিত্বকে অস্বীকার করে না এগোয়। কারণ গাছের মূল্য শুধু তার কাঠে নয়—তার ছায়ায়, তার শিকড়ে, তার ডালে আশ্রয় নেওয়া প্রাণে এবং মানুষের স্মৃতিতে। সেই জীবন্ত উত্তরাধিকার রক্ষা করা কোনও ঐচ্ছিক কাজ নয়; সুস্থ পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে তা আমাদের দায়িত্ব।
