ওয়াশিংটন, নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: বাইরে থেকে দেখলে পরিচ্ছন্ন, গোছানো একটি বাড়ি। কিন্তু দরজা পেরোতেই অন্য ছবি। ঘরের ভিতর ছড়িয়ে মল-মূত্র, নোংরা জিনিসপত্র, আবর্জনা। সেই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্যেই আটকে রাখা হয়েছিল ৩৬টি বর্ডার কলি কুকুরকে। শেষ পর্যন্ত আমেরিকার ফ্লোরিডার একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাদের উদ্ধার করল পুলিশ ও পশু-নিয়ন্ত্রণ আধিকারিকেরা। ঘটনায় বাড়ির মালকিন ৬২ বছরের পেজ ও’ডনেলের বিরুদ্ধে মোট ৭২টি অভিযোগ আনা হয়েছে।
ঘটনাটি ফ্লোরিডার পাম সিটির। মার্টিন কাউন্টি শেরিফের দফতর এবং অ্যানিম্যাল সার্ভিসেসের আধিকারিকেরা তল্লাশি পরোয়ানা নিয়ে বাড়িটিতে ঢোকার পর পরিস্থিতি দেখে হতবাক হয়ে যান। তাঁদের দাবি, ৩৬টি কুকুরের শরীর মল ও মূত্রে ঢেকে ছিল। অনেকের লোম এতটাই জট পাকিয়ে গিয়েছিল যে স্বাভাবিক ভাবে হাঁটাচলাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। ঘরের বিভিন্ন জায়গায় ছিল মল, মূত্রে ভেজা সামগ্রী, বাক্স এবং আবর্জনার স্তূপ।
পরিস্থিতি এতটাই খারাপ ছিল যে উদ্ধারকাজে যুক্ত আধিকারিকদের বিশেষ সুরক্ষা পোশাক পরতে হয়। তদন্তকারীদের বক্তব্য, ঘরের ভিতরে এতটাই নোংরা ছিল যে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছিল। কোথাও দেওয়াল ক্ষতিগ্রস্ত, কোথাও আবার সেই ফাঁক দিয়ে একসঙ্গে একাধিক কুকুর বেরিয়ে আসছিল। উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে আধিকারিকদের বার বার বাইরে বেরিয়ে এসে কিছুটা সময় নিয়ে ফের ভিতরে ঢুকতে হয়েছে।
তদন্তকারীদের দাবি, বাড়ির মালকিন প্রথম দিকে জানিয়েছিলেন, সেখানে পাঁচটির বেশি কুকুর নেই। কিন্তু তল্লাশি চালিয়ে একে একে ৩৬টি বর্ডার কলিকে উদ্ধার করা হয়। তাদের অবস্থা দেখে দ্রুত চিকিৎসা এবং পরিচর্যার প্রয়োজন বলে মনে করেন আধিকারিকেরা।
ঘটনায় পেজ ও’ডনেলকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ৩৬টি ফেলনি অ্যানিম্যাল ক্রুয়েলটি এবং ৩৬টি কুকুরকে যথাযথ ব্যায়াম বা বাতাসের সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে—মোট ৭২টি মামলা। আদালত তাঁর জামিনের অঙ্ক ২ লক্ষ ৭৫ হাজার ডলার ধার্য করেছে। জামিনের শর্ত হিসাবে তাঁকে কোনও পশু নিজের কাছে রাখা বা মালিকানা নেওয়া থেকেও বিরত রাখা হয়েছে।
উদ্ধারের পর ৩৬টি কুকুরকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে Humane Society of the Treasure Coast-এ। সেখানে শুরু হয়েছে চিকিৎসা, পরিষ্কার করা এবং পরিচর্যা। আশ্রয়কেন্দ্রের কর্মীদের বক্তব্য, অনেক কুকুর এতটাই ভয় পেয়ে ছিল যে মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগও করছিল না। কয়েকটি প্রায় নিস্তেজ অবস্থায় ছিল।
পরিচর্যার সময় উঠে এসেছে আরও চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। একটি ছোট কুকুরের শরীর থেকে কেটে ফেলা জট পাকানো লোমের ওজনই প্রায় তিন পাউন্ড, অর্থাৎ প্রায় দেড় কিলোগ্রাম। বড় কুকুরগুলির ক্ষেত্রে সেই জট আরও ভারী হতে পারে বলে জানিয়েছেন আশ্রয়কেন্দ্রের কর্মীরা। কয়েকটি কুকুরকে পরিষ্কার ও চিকিৎসার সময় হালকা ঘুমের ওষুধও দিতে হয়েছে।
তবে উদ্ধারের পর ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে তাদের অবস্থা। টিকা, কৃমিনাশক, প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসা এবং বিশেষ পরিচর্যার পাশাপাশি চলছে সম্পূর্ণ গ্রুমিং। আশ্রয়কেন্দ্রের তরফে জানানো হয়েছে, পরিষ্কার করার পর কয়েকটির আচরণে ইতিমধ্যেই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ লেজ নাড়ছে, মানুষের কাছাকাছি আসার চেষ্টা করছে।
কিন্তু স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সময় লাগবে। বিশেষ করে যে কুকুরগুলি দীর্ঘ দিন মানুষের সংস্পর্শ থেকে দূরে এবং ভয় ও অবহেলার মধ্যে ছিল, তাদের মানসিক পুনর্বাসনও জরুরি বলে জানাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
একটি বাড়ির ভিতর এতগুলি কুকুর কী ভাবে এমন অবস্থায় দিনের পর দিন ছিল, তা নিয়েও তদন্ত চলছে। একই সঙ্গে সামনে এসেছে প্রাণী-পালনের নামে ‘অ্যানিম্যাল হোর্ডিং’-এর ভয়াবহ দিক। আপাতত আদালতের আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ৩৬টি প্রাণীর বেঁচে ওঠাই উদ্ধারকর্মীদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। মল-মূত্রে ঢাকা, ভয় আর অবহেলায় বন্দি সেই কুকুরগুলির জন্য তাই শুরু হয়েছে একেবারে নতুন জীবন।