কলকাতা, নিউজ ডেস্ক: বিক্ষোভকারীদের হাতে আক্রান্ত হওয়ার পর একবার শিরোনামে এসেছিলেন। এ বার মহিলা সাংবাদিককে হেনস্থার অভিযোগ এবং তাঁকে নিয়ে ভুয়ো এআই ভিডিয়ো তৈরি— এই দুই ঘটনায় ফের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে দিল্লি পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার বিবেক ভগত। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সময় এক মহিলা সাংবাদিক তাঁর বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহার এবং যৌন হেনস্থার অভিযোগ তুলেছেন। ঘটনাটির তদন্তভার ইতিমধ্যেই দিল্লি পুলিশের অপরাধ দমন শাখার হাতে গিয়েছে। অভিযোগের পাশাপাশি, পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য। পুলিশের দাবি, হরিয়ানার নুহের বাসিন্দা নাদিম আহমেদ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বিবেক ভগতকে নিয়ে একটি আপত্তিকর ভুয়ো ভিডিয়ো তৈরি করেছিলেন। পরে সেটি সমাজ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ মনে করছে, উদ্দেশ্য ছিল এই পুলিশকর্তার ভাবমূর্তি নষ্ট করা। ওই ঘটনায় নাদিমকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ফলে একই সময়ে এক দিকে বিবেকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত চলছে, অন্য দিকে তাঁকে নিশানা করে ভুয়ো ভিডিয়ো তৈরির অভিযোগেরও তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ।
ঘটনার সূত্রপাত ২ অক্টোবর। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সংসদ মার্গ থানার বাইরে বিক্ষোভ দেখানো হয়। বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়ায়। সেই সময় কয়েক জন মহিলা নিজেদের সাংবাদিক বলে পরিচয় দিয়ে পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে হেনস্থার অভিযোগ তোলেন। তাঁদের মধ্যে এক মহিলা অভিযোগ করেন, ঘটনাস্থলে মহিলা পুলিশকর্মীদের উপস্থিতি নিয়ে তিনি বিবেক ভগতকে প্রশ্ন করেছিলেন। তাঁর দাবি, প্রশ্ন করার পরেই তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয় এবং তাঁকে পিছনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। মোট ৩ জন মহিলা ৩ জন পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর করার দাবিতে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের তরফেও সংসদ মার্গ থানার বাইরে বিক্ষোভ দেখানো হয়। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখে শেষ পর্যন্ত তদন্তভার তুলে দেওয়া হয় অপরাধ দমন শাখার হাতে। তবে তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে এখনই কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছয়নি পুলিশ। তদন্তে ঠিক কী উঠে আসে, সে দিকেই নজর রয়েছে।
বিবেক ভগতকে ঘিরে বিতর্ক অবশ্য এই প্রথম নয়। ২০২৬ সালের জুনে যন্তর মন্তর এবং কনট প্লেস এলাকায় বিক্ষোভের সময় এক দল মানুষের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। সেই সময় ভিড়ের মধ্যে ঘেরাও হয়ে পড়েছিলেন বিবেক। পুলিশের দাবি, তাঁকে মারধরও করা হয়। গুরুতর আহত হন তিনি। ভেঙে যায় কয়েকটি দাঁত, শরীরের বিভিন্ন অংশে চোট লাগে। পরে চিকিৎসার জন্য বেশ কয়েক সপ্তাহ ছুটিতে ছিলেন। সুস্থ হয়ে ফের কাজে যোগ দিয়ে কনট প্লেস এলাকার সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসাবে দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন। তার মধ্যেই আবার নতুন অভিযোগ। এ বার সেই বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি ভুয়ো ভিডিয়ো। পুলিশের অভিযোগ, নাদিম আহমেদ ইচ্ছাকৃত ভাবে বিবেককে হেয় করার উদ্দেশ্যে ওই ভিডিয়ো তৈরি করেছিলেন এবং তা সমাজ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে, ভিডিয়ো তৈরির পিছনে আরও কেউ ছিল কি না এবং এর নেপথ্যে কোনও বড় ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না। অর্থাৎ অভিযোগের তদন্তের পাশাপাশি ভুয়ো ভিডিয়ো-কাণ্ডের পিছনের চক্রেরও সন্ধান চলছে।
তবে পুলিশের চাকরিতে বিবেক ভগতের অতীত রেকর্ডও যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার পর ২০১৭ সালে কেন্দ্রীয় লোকসেবা কমিশনের পরীক্ষায় সর্বভারতীয় ৯৬৭ নম্বর স্থান পান তিনি। ২০১৮ ব্যাচের দিল্লি, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ পুলিশ পরিষেবার আধিকারিক হিসাবে কর্মজীবন শুরু। বিভিন্ন দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি ২০২২ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে দিল্লি পুলিশের দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। দিল্লি পুলিশের কমিশনারের কাছ থেকে শংসাপত্র ও স্মারক পাওয়ার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সচিবের কাছ থেকেও শংসাপত্র পেয়েছেন। আলিপুর ও বাওয়ানায় সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসাবে থাকার সময় একাধিক খুন, গ্যাং-সংঘর্ষ, ডাকাতি এবং অন্যান্য গুরুতর অপরাধের তদন্তে নেতৃত্ব দিয়েছে তাঁর দল। জিতেন্দর গোগি ও টিল্লু তাজপুরিয়া গোষ্ঠীর সংঘর্ষ এবং নীরজ বাওয়ানা গোষ্ঠী-সংক্রান্ত মামলাতেও তদন্ত করেছে তাঁর দল। বাওয়ানায় একটি ছোট মেয়েকে ধর্ষণ ও খুনের মামলাও ছিল সেই তালিকায়। এর মধ্যেই ৫ অক্টোবর দিল্লি সরকারের একটি নির্দেশে ২০১৭ ও ২০১৮ ব্যাচের আধিকারিকদের অতিরিক্ত ডেপুটি পুলিশ কমিশনারের বর্তমান দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সেই তালিকায় বিবেকের নাম থাকায় নতুন করে প্রশ্ন ওঠে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত চলার মধ্যেই কেন তাঁকে ওই দায়িত্ব দেওয়া হল, তা নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক। শেষ পর্যন্ত বিবেক নিজেই জানান, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ওই দায়িত্ব নিতে চান না। আপাতত তাঁর অতিরিক্ত ডেপুটি পুলিশ কমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণ স্থগিত রাখা হয়েছে।
