নিউজ ডেস্ক: বিমানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, আর তার জেরে আন্তর্জাতিক বিমান পরিষেবায় নতুন বিতর্ক। ইজরায়েলগামী বিমানের পাইলট ও কেবিন ক্রুদের জাতীয়তা নিয়ে জারি করা নতুন বিধি মেনে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফ্রান্সের বিমান সংস্থা এয়ার ফ্রান্স। এর ফলে পাকিস্তান-সহ একাধিক মুসলিম-প্রধান দেশের নাগরিক বিমানকর্মীদের ইজরায়েলগামী উড়ানে কাজ করার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধের মুখে পড়তে হচ্ছে। মোট ৩১টি দেশের নাগরিকদের প্রভাবিত করতে পারে এই নিয়ম। নিরাপত্তার যুক্তিতে এমন পদক্ষেপ করা হলেও জাতীয়তার ভিত্তিতে কর্মীদের বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বৈষম্যের প্রশ্ন উঠেছে।
ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষের নতুন নির্দেশ মেনে চলার কথা জানিয়েছে এয়ার ফ্রান্স। সংস্থার বক্তব্য, যে দেশগুলিতে তারা বিমান চালায়, সেই দেশগুলির প্রবেশ ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়ম মেনে চলা তাদের দায়িত্ব। ফলে ইজরায়েলের বিধিনিষেধের আওতায় পড়া বিমানকর্মীদের সংশ্লিষ্ট উড়ানে দায়িত্ব দেওয়া হবে না। এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে পাইলট থেকে শুরু করে কেবিন ক্রু— বিভিন্ন পদে কর্মরত ব্যক্তিদের উপর।
এই বিতর্কের সূত্রপাত সেপ্টেম্বরের শেষ দিনে দুবাই থেকে তেল আভিভগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি উড়ানে ঘটে যাওয়া গুরুতর ঘটনার পর। অভিযোগ, মাঝআকাশে ওই বিমানের ওমানি সহ-পাইলট ভারতীয় পাইলট স্মিত মাচ্ছরকে আক্রমণ করেন। বিমানটিকে ইজরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে নিয়ে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিমানটিকে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করানো হয়। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির কর্তৃপক্ষ।
এই ঘটনার পরেই ইজরায়েলের বিমান নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিধিতে কড়াকড়ি আনা হয়। নতুন নিয়মে এমন কয়েকটি দেশের নাগরিকদের ইজরায়েলগামী উড়ানে পাইলট বা কেবিন ক্রু হিসেবে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া হচ্ছে, যাদের সঙ্গে ইজরায়েলের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। পাকিস্তান, ইরান, সৌদি আরব, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া এবং ওমান-সহ একাধিক দেশের নাম এই তালিকায় রয়েছে। একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশের সংখ্যা ৩১।
ইজরায়েলের যুক্তি, আন্তর্জাতিক উড়ানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিমানকর্মীদের পরিচয় ও জাতীয়তা যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত, ফ্লাইটের ককপিটে কোনও কর্মীর বিরুদ্ধে গুরুতর হামলার অভিযোগ ওঠার পরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সেই প্রেক্ষিতেই বিদেশি বিমান সংস্থাগুলির কর্মী নির্বাচন ও উড়ানে দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে নতুন বিধি কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে আপত্তিও কম নয়। সমালোচকদের বক্তব্য, কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট নিরাপত্তাজনিত অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত হওয়া উচিত। কিন্তু কেবল নাগরিকত্বের ভিত্তিতে কোনও দেশের সমস্ত বিমানকর্মীকে সন্দেহের চোখে দেখা হলে তা বৈষম্যমূলক হয়ে উঠতে পারে। জাতীয়তার ভিত্তিতে কর্মীদের কাজের সুযোগ সীমিত করার ফলে ইউরোপ-সহ বিভিন্ন দেশের শ্রম আইন ও বৈষম্যবিরোধী বিধির সঙ্গে সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।\
এয়ার ফ্রান্সের মতো আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। বিভিন্ন দেশের নাগরিক পাইলট ও কেবিন ক্রুরা একই সংস্থায় কাজ করেন। তাঁদের মধ্যে কারও দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে, কিংবা কোনও কর্মী আগে থেকেই ইজরায়েলগামী উড়ানে দায়িত্ব পেয়ে থাকলে, নতুন বিধির আওতায় তাঁর কাজের সূচি বদলাতে হতে পারে। ফলে বিমানকর্মীদের দায়িত্ব বণ্টন, উড়ানের সময়সূচি এবং কর্মী ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই বিধির প্রভাব শুধু এয়ার ফ্রান্সের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
ইজরায়েলগামী উড়ান পরিচালনা করা অন্য আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলিকেও একই ধরনের নিয়ম মানতে হতে পারে। কোনও কর্মী নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা দেশের নাগরিক হলে তাঁকে সংশ্লিষ্ট উড়ানে দায়িত্ব দেওয়া যাবে কি না, তা যাচাই করতে হবে। ফলে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহণে নিরাপত্তা এবং কর্মীদের সমান সুযোগের অধিকার— দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্ন সামনে এসেছে।
ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনার তদন্ত এখনও গুরুত্বপূর্ণ। সহ-পাইলটের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পূর্ণ সত্যতা এবং ঘটনার পিছনে উদ্দেশ্য কী ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হওয়ার কথা। কিন্তু সেই একটি ঘটনার পর জাতীয়তার ভিত্তিতে বিস্তৃত বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহণে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনও আপস করা যায় না— এ বিষয়ে দ্বিমত নেই। কিন্তু সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পদ্ধতি কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। এয়ার ফ্রান্স ইজরায়েলের নিয়ম মেনে চলার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বিতর্ক আরও জোরাল হয়েছে। এখন দেখার, অন্য আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলিও একই পথে হাঁটে কি না, এবং এই বিধির বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগে কোনও আইনি পদক্ষেপ করা হয় কি না।





