পটনা: হাতে ডিগ্রি। চোখে সরকারি চাকরির স্বপ্ন। সামনে বছরের পর বছর প্রস্তুতি। আর তার পরেও নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি কবে বেরোবে, পরীক্ষা কবে হবে, ফল কবে প্রকাশিত হবে—তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। কোথাও পরীক্ষার নিয়ম বদল, কোথাও নিয়োগে দেরি, কোথাও অনিয়মের অভিযোগ। সেই জমে থাকা ক্ষোভই এ বার রাস্তায়। পটনার রাজপথে ছাত্র-যুবদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা, জলকামান—সব মিলিয়ে বিহারে চাকরির দাবির আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে।
কিন্তু প্রশ্নটা শুধু BPSC-র একটি পরীক্ষা নিয়ে নয়। আসল প্রশ্ন আরও বড়—বিহারের এত তরুণ সরকারি চাকরির পিছনেই ছুটছেন কেন? আর কেন তাঁদের একটা বড় অংশ এখনও শ্রমবাজারের বাইরে?
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানই সেই ছবির ইঙ্গিত দেয়। বিহারে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণদের বেকারত্বের হার নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল তাঁদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার। অর্থাৎ, যে তরুণদের বয়সে কাজের বাজারে ঢোকার কথা, তাঁদের বড় অংশ কাজ করছেন না, আবার সক্রিয় ভাবে কাজও খুঁজছেন না। কেউ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বছরের পর বছর আটকে থাকছেন, কেউ স্থানীয় ভাবে উপযুক্ত কাজ পাচ্ছেন না, কেউ আবার স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির অপেক্ষায় রয়েছেন। এই ‘অপেক্ষা’টাই বিহারের কর্মসংস্থানের সমস্যার অন্যতম বড় ছবি।
সরকারি চাকরির আকর্ষণ তাই শুধু মাসের শেষে বেতন পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি চাকরি মানে নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, নির্দিষ্ট কর্মজীবন, পেনশন বা অন্যান্য সুবিধার সম্ভাবনা এবং পরিবারের কাছে স্থির ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। বিশেষ করে এমন একটি রাজ্যে, যেখানে বহু পরিবারের কাছে একটি স্থায়ী চাকরি গোটা পরিবারের আর্থিক অবস্থাই বদলে দিতে পারে, সেখানে সরকারি চাকরি পাওয়ার প্রতিযোগিতা স্বাভাবিক ভাবেই তীব্র। আর সেই প্রতিযোগিতার ভয়াবহ ছবিটা দেখা যায় BPSC-র পরীক্ষাগুলিতে।
একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক পদের জন্য আবেদন করেন কয়েক লক্ষ তরুণ। ফলে পরীক্ষা হয়ে ওঠে শুধু একটি নিয়োগ প্রক্রিয়া নয়—হাজার হাজার পরিবারের আশা-ভরসার কেন্দ্র। পরীক্ষায় দেরি হলে প্রস্তুতির সময় বাড়ে, বয়স বেড়ে যায়, আর একের পর এক সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ভয় তৈরি হয়।
এ কারণেই পরীক্ষার পদ্ধতিতে সামান্য পরিবর্তনও বড় বিতর্ক তৈরি করে। সম্প্রতি শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা TRE-4-কে ঘিরে আন্দোলনকারীদের দাবি—পরীক্ষা এক দফায় নেওয়া, নেগেটিভ মার্কিং তুলে দেওয়া-সহ একাধিক বিষয়ে পরিবর্তন আনতে হবে। BPSC, BSSC এবং পুলিশের সাব-ইনস্পেক্টর নিয়োগ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে আন্দোলনকারীদের।
এর মধ্যেই ৭০তম BPSC পরীক্ষা ঘিরে ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে। ২৫ অগস্ট পটনায় গান্ধী ময়দান থেকে রাজভবনের দিকে মিছিল করেন চাকরিপ্রার্থীরা। ডকবাংলো এলাকায় পুলিশি ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। কয়েক জনকে আটকও করা হয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে তাঁদের প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দেওয়া হয়নি।
এই আন্দোলনে আগুনে ঘি পড়ে BPSC-র এক আধিকারিকের বিতর্কিত মন্তব্যকে ঘিরে। প্রতিবাদীদের উদ্দেশে কথিত ‘কুকুর’ সংক্রান্ত প্রবাদ ব্যবহারের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। সরকার পরে ওই আধিকারিককে সাসপেন্ড করার নির্দেশ দেয়।
তবে আন্দোলনের পরিধি শুধু একটি পরীক্ষায় আটকে নেই। ছাত্রদের ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা। তাঁদের বক্তব্য, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে পরীক্ষা, ফলপ্রকাশ থেকে নিয়োগ—প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা এবং সময়সীমা থাকা প্রয়োজন। কারণ, একজন পরীক্ষার্থীর কাছে একটি বছর মানে শুধু ক্যালেন্ডারের বারো মাস নয়। সেই এক বছরে তাঁর বয়সসীমা পার হয়ে যেতে পারে, পরিবারের আর্থিক চাপ বাড়তে পারে, অন্য চাকরির সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে। আর এখানেই বিহারের যুবসমাজের সমস্যাটা অন্য মাত্রা পায়।
যে রাজ্যে বিপুল সংখ্যক তরুণ প্রতি বছর শ্রমবাজারে ঢোকার বয়সে পৌঁছন, সেখানে সরকারি চাকরির পদ স্বাভাবিক ভাবেই তাঁদের সবার চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। কয়েক হাজার বা কয়েক দশ হাজার পদ তৈরি করলেও আবেদনকারীর সংখ্যা তার বহু গুণ হতে পারে। ফলে সরকারি চাকরি যতটা সমাধান, তার চেয়ে বেশি হয়ে উঠছে প্রতিযোগিতার কেন্দ্র।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—সরকারি চাকরির বাইরের কর্মসংস্থান কোথায়?
শিল্প, পরিষেবা, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ, প্রযুক্তিনির্ভর কাজ, দক্ষতা-ভিত্তিক কর্মসংস্থান—এই ক্ষেত্রগুলিতে পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি না হলে তরুণরা বার বার সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার দিকেই ফিরবেন। একটি পরীক্ষা শেষ হবে, আরেকটি পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষা শুরু হবে। বছরের পর বছর ধরে ‘প্রস্তুতি’ই হয়ে উঠতে পারে কর্মজীবনের বিকল্প।
এই কারণেই বিহারের বর্তমান আন্দোলনকে শুধু ‘BPSC পরীক্ষা নিয়ে ছাত্র অসন্তোষ’ বলে দেখলে ছবির বড় অংশটাই অদৃশ্য থেকে যাবে। এটি আসলে কর্মসংস্থানের প্রশ্নে এক প্রজন্মের অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ।
সরকার অবশ্য আন্দোলনের চাপের মধ্যে কিছু পদক্ষেপ করেছে। সাম্প্রতিক ঘোষণায় মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী জানিয়েছেন, আগামী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা এক দফায় নেওয়া হবে। দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর এই সিদ্ধান্তকে ছাত্রদের অন্যতম দাবির প্রতি সরকারের সাড়া হিসাবেই দেখা হচ্ছে। কিন্তু তাতে কি সমস্যার মূলে পৌঁছনো যাবে? সম্ভবত না।
কারণ, একজন তরুণের সামনে যদি দশটি সরকারি পদের জন্য হাজার হাজার প্রতিযোগী থাকেন, অথচ তাঁর নিজের জেলায় বা রাজ্যে সরকারি চাকরির বাইরে স্থায়ী, সম্মানজনক এবং যথেষ্ট বেতনের কাজ না থাকে, তা হলে নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে ক্ষোভ ফের ফিরে আসবেই। আজ BPSC। কাল BSSC। তার পর শিক্ষক নিয়োগ। আবার পুলিশ বা অন্য কোনও সরকারি পরীক্ষা।
পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি আসবে, লক্ষ আবেদন জমা পড়বে, কয়েক হাজার নামের তালিকা বেরোবে—আর বাকি লক্ষ তরুণ আবার পরের বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষায় বসবেন।
পটনার রাস্তায় তাই যে প্রশ্নটি সবচেয়ে জোরে শোনা যাচ্ছে, তা শুধু—‘পরীক্ষা কবে হবে?’ নয়। প্রশ্নটা আরও বড়, “সরকারি চাকরির কয়েক হাজার আসনের বাইরে বিহারের লক্ষ লক্ষ তরুণের জন্য কাজ কোথায়?”
এই প্রশ্নের উত্তর না মিললে ব্যারিকেড সরিয়ে দেওয়া গেলেও ক্ষোভ সরবে না। কারণ, সমস্যাটা পরীক্ষার হলে নয়, সমস্যাটা কর্মসংস্থানের বাজারেই।