বিশেষ প্রতিবেদন: গাছ লাগানো হয়েছিল মরুভূমির বিস্তার ঠেকাতে। লক্ষ্য ছিল ধীরে ধীরে সবুজের পরিমাণ বাড়ানো। সেই উদ্যোগে গত কয়েক দশকে চিনে রোপণ করা হয়েছে প্রায় ৬৬০০ কোটি গাছ। এ বার সেই বিশাল বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির ফলাফল খতিয়ে দেখে বিজ্ঞানীরা এমন একটি তথ্য পেয়েছেন, যা পরিবেশবিজ্ঞানীদেরও নতুন করে ভাবাচ্ছে। দেখা গিয়েছে, চিনের রোপণ করা অরণ্যে পাতার পরিমাণ প্রাকৃতিক অরণ্যের তুলনায় প্রায় ৬৫.৮ শতাংশ দ্রুত বাড়ছে।
তবে সংখ্যাটি শুনে যতটা চমক লাগে, গবেষণার পুরো ছবিটি তার চেয়েও আকর্ষণীয়। কারণ এই বাড়তি বৃদ্ধির অধিকাংশটাই এসেছে রোপণ করা অরণ্যের বয়স কম হওয়ার কারণে। সাধারণত কমবয়সি গাছ দ্রুত বাড়ে, নতুন পাতা তৈরি করে এবং অল্প সময়ের মধ্যে ঘন সবুজ ছাউনি তৈরি করতে পারে। ফলে প্রাকৃতিক ভাবে গড়ে ওঠা অপেক্ষাকৃত পুরনো অরণ্যের সঙ্গে তুলনা করলে রোপণ করা বন অনেক দ্রুত ‘সবুজ’ হয়ে উঠছে।
১৯৭৮ থেকে ৬৬০০ কোটি গাছ
চিনের এই বিশাল বৃক্ষরোপণ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য ছিল দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মরুভূমির বিস্তার ঠেকানো। বিশেষ করে গোবি ও তাকলামাকান মরুভূমির আগ্রাসন রুখতে বহু বছর ধরে চলেছে বৃক্ষরোপণ। সেই বৃহৎ কর্মসূচির অংশ হিসাবেই প্রায় ৬৬০০ কোটি গাছ লাগানো হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও প্রায় ৩৪০০ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য রয়েছে। অর্থাৎ শুধু গাছের সংখ্যা বাড়ানো নয়, কয়েক দশক ধরে তৈরি করা হচ্ছে বিশাল আকারের রোপণ-অরণ্য। সেই বন কতটা কার্যকর ভাবে বাড়ছে এবং কার্বন শোষণে কতটা ভূমিকা রাখছে, তা বোঝার জন্যই নতুন গবেষণাটি করা হয়েছে।
উপগ্রহের চোখে ধরা পড়ল সবুজের গতি
গবেষকেরা সরাসরি প্রতিটি গাছ গুনে এই হিসাব করেননি। ব্যবহার করা হয়েছে উপগ্রহের তথ্য। বিশেষ ভাবে দেখা হয়েছে Leaf Area Index বা LAI অর্থাৎ নির্দিষ্ট জমিতে গাছের পাতার ঘনত্ব কতটা। অরণ্যের পাতার পরিমাণ যত বেশি, সাধারণ ভাবে সালোকসংশ্লেষ এবং বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণের ক্ষমতাও তত বেশি হতে পারে। চিনের রোপণ করা এবং প্রাকৃতিক অরণ্যকে একই ধরনের পরিবেশগত পরিস্থিতিতে তুলনা করে গবেষকেরা দেখেছেন, রোপণ করা অরণ্যের পাতার বিস্তার জাতীয় স্তরে প্রায় ৬৫.৮ শতাংশ দ্রুত বেড়েছে।
কিন্তু এখানেই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একই বয়সের গাছ এবং একই ধরনের পরিবেশে বেড়ে ওঠা অরণ্যকে পাশাপাশি রেখে হিসাব করলেও রোপণ করা বন সামান্য এগিয়ে ছিল। সেই ব্যবধান ছিল মাত্র ৪.৬ শতাংশ। অর্থাৎ ৬৬ শতাংশের বিশাল ব্যবধানের বড় অংশই আসলে বয়সের পার্থক্যের ফল।
তরুণ গাছের জোর, ৪০ পেরোলেই কমে সুবিধা
রোপণ করা অরণ্যের গড় বয়স প্রায় ৩৪ বছর। প্রাকৃতিক অরণ্যের গড় বয়স প্রায় ৫৭ বছর। স্বাভাবিক ভাবেই কমবয়সি গাছ দ্রুত বাড়ে। গবেষণাতেও দেখা গিয়েছে, ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সের রোপণ করা গাছগুলির পাতার বিস্তারের হার সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ৪০ বছর বয়স পার হওয়ার পর সেই বাড়তি সুবিধা দ্রুত কমতে শুরু করে। অর্থাৎ রোপণ করা গাছ শুরুতে দৌড়ে অনেকটা এগিয়ে গেলেও দীর্ঘমেয়াদে ছবিটা বদলে যেতে পারে। প্রাকৃতিক অরণ্য হয়তো ধীরে বাড়ে, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে তুলনামূলক স্থির ভাবে নিজের বৃদ্ধি বজায় রাখতে পারে।
শুধু গাছ লাগালেই হবে না
গবেষণার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। রোপণ করা অরণ্যে অনেক সময় দ্রুত বেড়ে ওঠা প্রজাতির গাছ বেছে নেওয়া হয়। যেমন ইউক্যালিপটাস বা পপলার। পাশাপাশি নিয়মিত পরিচর্যা, আগাছা বা প্রতিযোগী উদ্ভিদ সরিয়ে দেওয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে সার প্রয়োগের মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। ফলে গাছ আলো, জল ও মাটির পুষ্টির জন্য কম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে।
বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গেও এই গাছগুলির প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক রয়েছে বলে গবেষকেরা মনে করছেন। বিশেষ করে মিশ্র এবং চিরহরিৎ অরণ্যে রোপণ করা গাছের এই অতিরিক্ত বৃদ্ধির প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা গিয়েছে। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সেই সুবিধাও কমে আসে।
পাতার পরিমাণ মানেই পুরো অরণ্যের স্বাস্থ্য নয়
তবে বিজ্ঞানীরা একটি বিষয়ে সতর্ক করেছেন। গাছের পাতার পরিমাণ বেশি হলেই যে সেই অরণ্য সব দিক থেকে প্রাকৃতিক অরণ্যের চেয়ে বেশি কার্যকর—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। কারণ কার্বন শুধু পাতায় আটকে থাকে না। গাছের কাণ্ড, ডাল, বাকল, শিকড় এবং মাটিতেও বিপুল পরিমাণ কার্বন সঞ্চিত থাকে। ফলে শুধু Leaf Area Index দিয়ে একটি অরণ্যের সম্পূর্ণ কার্বন সঞ্চয় ক্ষমতা বিচার করা যায় না। অন্য গবেষণাতেও চিনের কিছু তরুণ অরণ্যে প্রাকৃতিক ভাবে বেড়ে ওঠা বনভূমির তুলনায় কার্বন সঞ্চয়ের ছবিতে ভিন্ন ফল পাওয়া গিয়েছে।
চিনের সবুজ বাড়ছে, কিন্তু প্রশ্নও থাকছে
চিনের এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির প্রভাব শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উপগ্রহ-ভিত্তিক একটি পুরনো গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, ২০০০ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে বিশ্বে পাতার মোট বৃদ্ধির প্রায় ২৫ শতাংশের জন্য চিন একাই দায়ী ছিল। দেশটির এই সবুজ বৃদ্ধিতে অরণ্য এবং কৃষিজমি—দুইয়েরই উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে।
তবে নতুন গবেষণার মূল শিক্ষা শুধুমাত্র ‘আরও গাছ লাগাতে হবে’ নয়। কোন গাছ লাগানো হচ্ছে, কোথায় লাগানো হচ্ছে, কত দিন ধরে তার পরিচর্যা করা হচ্ছে এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সেই অরণ্যের ভূমিকা কী ভাবে বদলাচ্ছে—সবটাই গুরুত্বপূর্ণ।
চিনের ৬৬০০ কোটি গাছ তাই শুধু একটি বিশাল সংখ্যার গল্প নয়। তা দেখিয়ে দিচ্ছে, পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ অল্প সময়ের মধ্যে পৃথিবীর সবুজ আচ্ছাদন এবং কার্বন শোষণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেই সাফল্য ধরে রাখতে হলে প্রাকৃতিক অরণ্য সংরক্ষণও সমান জরুরি। কারণ তাড়াতাড়ি সবুজ হওয়া আর দীর্ঘদিন সুস্থ অরণ্য হয়ে টিকে থাকা, দুই এক জিনিস নয়।
