নয়াদিল্লি, নিউজ ডেস্ক: আন্দোলন থামিয়েছিল বিশ্বাস করে। ভেবেছিল, আলোচনার টেবিলে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলি এ বার বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু এক মাস কেটে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতির অধিকাংশ পূরণ হয়নি—এমনই অভিযোগ তুলে ফের রাজপথে নামার সিদ্ধান্ত নিল ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)। আগামী ৫ সেপ্টেম্বর, শিক্ষক দিবসের দিন দিল্লিতে বড় মিছিল করবে তারা। ইন্ডিয়া গেট থেকে মিছিল যাবে দিল্লি পুলিশ সদর দফতরের দিকে।
এ বারের কর্মসূচিকে আগের আন্দোলনের তুলনায় আলাদা মাত্রা দিতে চাইছে CJP। সংগঠনের ঘোষণা, মিছিলের একেবারে সামনে থাকবেন NEET পরীক্ষা বাতিল এবং পরবর্তী পুনরায় পরীক্ষা ঘিরে তৈরি পরিস্থিতির পর আত্মহত্যা করা পরীক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যেরা। তাঁদের পাশে থাকবেন জুলাইয়ের আন্দোলনে পুলিশের ‘অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে’ ক্ষতিগ্রস্ত বিক্ষোভকারীরা। অর্থাৎ, পরীক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভের সঙ্গে এ বার সরাসরি জুড়ে দেওয়া হচ্ছে আন্দোলনকারীদের ‘ন্যায়বিচারের’ দাবিকেও।
সোমবার CJP-র জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকে ৫ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচির সিদ্ধান্ত হয়। ঠিক এক মাস আগে, ২৫ জুলাই, কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনার পর ৩৬ দিনের আন্দোলন প্রত্যাহার করেছিল সংগঠনটি। সেই সময় কেন্দ্রের তরফে একাধিক দাবি নিয়ে ইতিবাচক আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বলে CJP-র দাবি। কিন্তু সংগঠনের অভিযোগ, সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও সেই আশ্বাস বাস্তবায়নের গতি অত্যন্ত ধীর।
CJP-র আন্দোলনের সূত্রপাত ২০ জুন। দেশের পরীক্ষাব্যবস্থায় অনিয়ম এবং NEET প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে রেখে দিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থান শুরু করেছিল সংগঠনটি। প্রথমে দিল্লিকেন্দ্রিক হলেও ধীরে ধীরে আন্দোলনের প্রভাব দেশের অন্যান্য প্রান্তেও ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের অন্যতম বড় দাবি ছিল পরীক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। একই সঙ্গে NEET-কে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত পড়ুয়া ও তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর দাবিও ওঠে।
পরিস্থিতি চরমে পৌঁছয় ২০ জুলাই। সংসদ অভিযানের ডাক দেয় CJP। সংগঠনের অভিযোগ, সেই কর্মসূচিতে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ বাধে। পুলিশের পদক্ষেপে বহু বিক্ষোভকারী আহত হন বলে দাবি সংগঠনের। সেই ঘটনার পর আন্দোলনের সুর আরও তীব্র হয়ে ওঠে৷
এর পর কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনা হয়। ২৫ জুলাই আন্দোলন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয় CJP। সংগঠনের দাবি, সেই আলোচনায় সরকার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পদক্ষেপ করার আশ্বাস দিয়েছিল।
তার মধ্যে অন্যতম ছিল NEET-প্রত্যাশীদের আত্মহত্যার ঘটনায় মৃতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা। পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া FIR প্রত্যাহার এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ না করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল বলে CJP জানিয়েছে।
এ ছাড়াও দেশের পরীক্ষাব্যবস্থার বৃহত্তর সংস্কার নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে পরবর্তী পর্যায়ে আলোচনা চালানোর বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়েছিল বলে দাবি সংগঠনের। সেই সময় CJP-র প্রতিনিধিদের মধ্যে সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিংহের সঙ্গে যৌথ সাংবাদিক বৈঠক করে আন্দোলন প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, সরকার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিশ্রুতিগুলি কার্যকর করবে, এই বিশ্বাসেই তাঁরা আন্দোলন স্থগিত করছেন।
কিন্তু আন্দোলন থামার পর থেকেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরব হতে শুরু করে CJP। সংগঠনের অভিযোগ, বিশেষ করে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া FIR প্রত্যাহারের বিষয়টি কার্যত ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। CJP-র আরও অভিযোগ, পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে যে বৃহত্তর আলোচনার কথা হয়েছিল, সেই প্রক্রিয়াও প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। কেন্দ্রের তরফে লিখিত আশ্বাস দেওয়ার কথা থাকলেও এখনও তা মেলেনি বলে দাবি সংগঠনের।
সোমবারের বিবৃতিতে CJP-র অভিযোগ, “সরকার সময় নষ্ট করছে, কারিগরি জটিলতার আড়ালে থাকছে এবং স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে এড়িয়ে যাচ্ছে।”
এই টানাপড়েনের মধ্যেই বিষয়টি পৌঁছেছে সুপ্রিম কোর্টে। ১৮ অগস্ট আদালতে CJP অভিযোগ করে, ছাত্র ও আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া FIR প্রত্যাহারের প্রক্রিয়ায় কেন্দ্র প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছে না। সেই সময় সংগঠনের তরফে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল, ২৫ জুলাইয়ের চুক্তি বা প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে দ্রুত এবং দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে ফের দেশজুড়ে আন্দোলনের পথে হাঁটতে পারে তারা। এ বার সেই হুঁশিয়ারিই বাস্তবে রূপ পেল।
CJP-র বক্তব্য, সরকার আন্দোলনকারীদের বিশ্বাসকে গুরুত্ব না দিয়ে ভুল করছে। তাঁদের কড়া বার্তা, “আমাদের ধৈর্যকে দুর্বলতা বলে ভুল করা যাবে না। আমাদের সদিচ্ছাকে তরুণদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার সুযোগ করা যাবে না।”
সংগঠনের আরও বক্তব্য, একটি সরকার কোনও প্রজন্মের বিশ্বাস নিয়ে তাঁদের ঘরে ফিরিয়ে দিতে পারে না, তার পর নিজেদের দেওয়া কথা থেকে সরে যেতে পারে না। ৫ সেপ্টেম্বরের মিছিলকে শান্তিপূর্ণ রাখার কথা জানিয়েছে CJP। দেশের ছাত্র, যুব সংগঠন এবং তরুণদেরও এই কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মিছিলের প্রতীকী ছবিটিও ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করে দিয়েছে সংগঠন, সামনে থাকবেন সন্তান হারানো পরিবার, তাঁদের পাশে থাকবেন পুলিশের পদক্ষেপে ক্ষতিগ্রস্ত আন্দোলনকারীরা, আর পিছনে থাকবে তরুণ প্রজন্ম। শিক্ষক দিবসে সেই মিছিলের স্লোগানও তাই একটাই, প্রতিশ্রুতি যদি দেওয়া হয়ে থাকে, তা পালন করতে হবে।