নয়াদিল্লি: যন্তর মন্তরে প্রস্তাবিত বিক্ষোভ ঘিরে শনিবার সকালে দিল্লিতে ধরপাকড়ের অভিযোগ উঠল। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র প্রতিষ্ঠাতা তথা আহ্বায়ক অভিজিৎ দীপকে-কে দিল্লি বিমানবন্দরে আটক করেছে পুলিশ। তাঁর সঙ্গে বিমানে থাকা সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কারাও পুলিশের হেফাজতে গিয়েছেন বলে অভিযোগ। মুম্বই থেকে আসা তাঁদের বিমান শনিবার সকাল ১০টা ১৯ মিনিট নাগাদ দিল্লি বিমানবন্দরে নামে। বিমান অবতরণের পরেই পুলিশ সেখানে পৌঁছে যায়। এর পর বিমানের ভিতরে উঠে তিন জনকে আটক করা হয় বলে দাবি সিজেপি-র। সেই সময় অন্য যাত্রীদেরও দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
https://x.com/CJPDesk/status/2108793500716151271?s=20
যন্তর মন্তরে সিজেপি-র ডাকা কর্মসূচির আগে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে এই বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে আন্দোলনে নেমেছে সিজেপি। কিন্তু কর্মসূচির আগেই দলের প্রতিষ্ঠাতা-আহ্বায়ক-সহ একাধিক পরিচিত মুখকে আটক করার অভিযোগে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
দিল্লিতে পৌঁছনোর আগেই পুলিশি পদক্ষেপের মুখে পড়েছেন ইউটিউবার ধ্রুব রাঠী। যন্তর মন্তরের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগে গুরুগ্রামে তাঁর বাড়ি থেকে তাঁকে আটক করা হয় বলে অভিযোগ।
পুলিশ তাঁকে দিল্লিতে না যাওয়ার অনুরোধ করেছিল। কিন্তু সেই অনুরোধ উপেক্ষা করেই তিনি বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে পুলিশের তরফে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়াও সমাজমাধ্যমে পরিচিত একাধিক ব্যক্তিত্ব এবং সিজেপি-র আরও কয়েক জন নেতাকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি আন্দোলনকারীদের। সিজেপি নেতা সৌরভ দাসের অভিযোগ, দলের আইনি বিষয়গুলি দেখাশোনা করেন যে আইনজীবী, সেই রত্না সিংহকেও শনিবার সকালে আটক করেছে পুলিশ। আইনজীবীদের একটি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়ার সময় তাঁকে বাধা দেওয়া হয় বলে দাবি। আটক ব্যক্তিদের সংখ্যা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সিজেপি-র সূত্রের দাবি, শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত ৫০০-র বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। যদিও এই সংখ্যা এবং আটক ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা স্বাধীন ভাবে যাচাই করা যায়নি। কত জনকে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং কত জন এখনও পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন, সেই বিষয়েও স্পষ্ট তথ্য সামনে আসেনি। শনিবার যন্তর মন্তরে সিজেপি-র কর্মসূচির অনুমতি দেয়নি দিল্লি পুলিশ। পুলিশের যুক্তি, এই জমায়েতের ফলে আইনশৃঙ্খলার সমস্যা তৈরি হতে পারে এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটতে পারে। কিন্তু অনুমতি না মেলার পরেও কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন অভিজিৎ দীপকে।
আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা নাগরিকদের অধিকার। তাঁদের দাবি, এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের ফলে বহু মানুষের ভোটাধিকার বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্য দিকে, ভোটার তালিকায় স্বচ্ছতা আনা এবং ভুয়ো বা একাধিক জায়গায় থাকা নাম চিহ্নিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছে নির্বাচন কমিশন। বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় ব্যারিকেড বসানো, অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন এবং নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। নির্দিষ্ট এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা এবং বহু মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও নির্গমন নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিউ দিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনকে ঘিরে রেল পরিষেবাতেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে অফিসযাত্রী, দূরপাল্লার ট্রেনের যাত্রী এবং জরুরি প্রয়োজনে রাজধানীতে যাতায়াত করা মানুষের দুর্ভোগের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মেট্রো ও রেল পরিষেবা নিয়ে এই কড়াকড়ির বিষয়টি শুক্রবারই সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছয়। শীর্ষ আদালত জানায়, নিরাপত্তার প্রয়োজনে পরিবহণ নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, কিন্তু তার জন্য গোটা শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থামিয়ে দেওয়া যায় না। সাধারণ মানুষের অসুবিধা যতটা সম্ভব কমিয়ে পরিস্থিতি সামলানোর উপর জোর দেয় আদালত। সেই নির্দেশের পরেও ৪৫টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও নির্গমন পথ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আবেদন জমা পড়েছে।
আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠী এই আবেদন করেছেন। তাঁর অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্টের ৯ অক্টোবরের নির্দেশের পরেও দিল্লি মেট্রো রেল কর্পোরেশন (ডিএমআরসি) ৪৫টি স্টেশনের প্রবেশ ও নির্গমন পথ বন্ধ রাখার ঘোষণা করেছে।
এই অভিযোগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন, দিল্লি পুলিশের কমিশনার অনুরাগ কুমার এবং ডিএমআরসি-র চেয়ারপার্সন ডি তারা-র বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার পদক্ষেপ করার আর্জি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবহণের উপর থেকে ব্যাপক বিধিনিষেধ অবিলম্বে প্রত্যাহার করে স্বাভাবিক পরিষেবা ফিরিয়ে আনার দাবিও তুলেছেন আবেদনকারী। তবে আদালত অবমাননার অভিযোগ এখনও অভিযোগের স্তরেই রয়েছে। সংশ্লিষ্ট আধিকারিকেরা আদালতের নির্দেশ লঙ্ঘন করেছেন কি না, সে বিষয়ে শীর্ষ আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা রয়েছে।
এক দিকে বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তা বজায় রাখার যুক্তি, অন্য দিকে প্রতিবাদের অধিকার এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াতের প্রশ্ন—এই দুইয়ের সংঘাতেই উত্তপ্ত দিল্লি। বিমানবন্দরে সিজেপি প্রধানকে আটক করার অভিযোগ থেকে ধ্রুব রাঠী ও রত্না সিংহকে আটক করার ঘটনা, সব মিলিয়ে শনিবারের কর্মসূচির আগেই রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। এখন নজর, আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে পুলিশ কী পদক্ষেপ করে, বিক্ষোভকারীরা যন্তর মন্তরে পৌঁছতে পারেন কি না এবং পরিবহণে বিধিনিষেধ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী অবস্থান কী হয়।
