নয়াদিল্লি: শীতের শুরুতেই দূষণের বিরুদ্ধে বড়সড় লড়াইয়ে নামল দিল্লি সরকার। রাজধানীর বাতাসকে দূষণমুক্ত করতে ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে একগুচ্ছ কঠোর বিধিনিষেধ। দিল্লিতে ঢুকতে পারবে না বিএস-৬ মানের নীচে থাকা অন্য রাজ্যে নথিভুক্ত গাড়ি। সরকারি ও বেসরকারি অফিসে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ কর্মীকে সশরীরে হাজির রেখে বাকিদের বাড়ি থেকে কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ করা হয়েছে ধুলো তৈরি হয় এমন নির্মাণ ও ভাঙার কাজ। বাড়ানো হচ্ছে পার্কিং ফি। চালু হচ্ছে ‘বৈধ পিইউসি না থাকলে জ্বালানি নয়’ নীতি। সব মিলিয়ে শীতের দূষণ মোকাবিলায় দিল্লি-এনসিআরের জনজীবনে বড়সড় পরিবর্তন আনতে চলেছে প্রশাসন।
পুরনো গাড়ি নিয়ে দিল্লিতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা
নতুন নির্দেশ অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত দিল্লির বাইরে নথিভুক্ত বিএস-৬ মানের নীচে থাকা পেট্রল ও ডিজেলচালিত গাড়ি রাজধানীতে প্রবেশ করতে পারবে না। অর্থাৎ, বিএস-৪ বা তার চেয়ে পুরনো নির্গমন মানের গাড়ি নিয়ে দিল্লিতে ঢোকা যাবে না। এই বিধিনিষেধের প্রভাব পড়বে নয়ডা, গুরগাঁও, গাজিয়াবাদ, ফরিদাবাদ-সহ সংলগ্ন শহরগুলি থেকে প্রতিদিন দিল্লিতে যাতায়াত করা বহু মানুষের উপর। প্রশাসনের অনুমান, প্রায় ১০ লক্ষ পুরনো গাড়ি এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে।
তবে বৈদ্যুতিক গাড়ি, সিএনজি চালিত যান এবং বিএস-৬ মান পূরণকারী গাড়ি এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে। অ্যাম্বুল্যান্স, দমকলের গাড়ি এবং জরুরি পরিষেবার যানবাহনও ছাড় পাবে। নিয়ম ভাঙলে স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ ক্যামেরার সাহায্যে গাড়ি চিহ্নিত করে ই-চালান পাঠানো হবে।
অফিসে ৫০ শতাংশ কর্মী, বাকিদের বাড়ি থেকে কাজ
দূষণ কমাতে রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি অফিসযাত্রীর ভিড়ও নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে প্রশাসন। দিল্লি এবং সংলগ্ন পাঁচটি জেলায় সরকারি ও বেসরকারি অফিসে ৫০ শতাংশ কর্মীকে সশরীরে হাজির রেখে বাকিদের বাড়ি থেকে কাজের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জরুরি পরিষেবা এই নির্দেশের আওতার বাইরে থাকবে। বেসরকারি সংস্থাগুলিকে কর্মীদের কাজের সময় ভাগ করে দেওয়া, কারপুলিং এবং গণপরিবহণ ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
নির্মাণকাজে কড়াকড়ি, ধুলো নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নজর
শীতকালে দিল্লির দূষণের অন্যতম বড় কারণ নির্মাণকাজের ধুলো। সেই কারণে ধুলো তৈরি হয় এমন বহিরাঙ্গন নির্মাণ ও ভাঙার কাজে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তবে জরুরি জনপরিকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে ছাড় দেওয়া হবে। রেল, মেট্রো, বিমানবন্দর, হাসপাতাল, জল সরবরাহ, নিকাশি এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলি এই ছাড়ের আওতায় পড়তে পারে।
বৈধ পিইউসি না থাকলে মিলবে না জ্বালানি
দূষণ নিয়ন্ত্রণে চালু হচ্ছে ‘নো পিইউসি, নো ফুয়েল’ নীতি। অর্থাৎ, গাড়ির বৈধ দূষণ নিয়ন্ত্রণ শংসাপত্র বা পিইউসি না থাকলে দিল্লির পেট্রল পাম্পে জ্বালানি পাওয়া যাবে না। প্রায় ৫০০টি পেট্রল পাম্পে স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ ক্যামেরা বসানো হয়েছে। গাড়ির নম্বরপ্লেট স্ক্যান করে পিইউসি শংসাপত্রের বৈধতা যাচাই করা হবে।
দ্বিগুণ পার্কিং ফি, বদলাচ্ছে অফিসের সময়ও
ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমাতে নির্দিষ্ট পার্কিং এলাকায় ফি দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে দিল্লি মেট্রোর নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা এই নিয়মের বাইরে থাকবে। পাশাপাশি যানজট কমাতে সরকারি দফতরগুলির কাজের সময়ও আলাদা করা হয়েছে। দিল্লি পুরনিগমের অফিস চলবে সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। দিল্লি সরকারের দফতরগুলির সময় সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা।
প্রযুক্তির নজরদারি, নিয়ম ভাঙলে ই-চালান
নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর করতে প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছে প্রশাসন। দিল্লির বিভিন্ন প্রবেশপথে স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ ক্যামেরা বসানো হয়েছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকেও নজরদারি চালানো হবে। নিয়ম ভাঙলে সংশ্লিষ্ট গাড়ির বিরুদ্ধে ই-চালান পাঠানো হবে। দিল্লির মধ্যে দিয়ে যাতায়াতকারী পণ্যবাহী ট্রাকগুলিকেও নির্দিষ্ট পরিধি সড়ক ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের দাবি, প্রতি বছর শীতকালে বাতাসের গতি কমে যাওয়ায় দূষিত পদার্থ বাতাসের নিচের স্তরে আটকে থাকে। তার সঙ্গে গাড়ির ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলো এবং অন্যান্য দূষণকারী উপাদান মিশে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক করে তোলে। তাই দূষণের মাত্রা চরমে ওঠার অপেক্ষা না করে আগাম ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে। তবে এত কড়াকড়ির পর রাজধানীর বাতাস কতটা পরিষ্কার হয়, এখন সেটাই দেখার।




